বাড়িতে কে কে আছে?
চয়ন যেন একটু সচকিত হয়ে বলে, মা দাদা বউদি।
কে আর্নিং মেম্বার?
দাদা।
দাদা কোথায় চাকরি করে।
একটা ব্যাংকে।
বাবা নেই, না?
না। আমার দশ বছর বয়সে মারা যায়।
বাড়িটা কি নিজেদের?
আবার একটু দোনোমোনো করে চয়ন বলে, বাড়ি দাদার।
বুঝেছি।
পিছন থেকে চারুশীলা বলে, এই উদ্ভট, ঠাণ্ডা লাগছে, এয়ারকুলারটা বন্ধ করে দে।
দিচ্ছি। কিন্তু এগুলো লোকের শ্বাসের দূষিত বায়ু বেরোবে কি করে? জানালা খোলা যাবে না, বৃষ্টি হচ্ছে।
তোর দিকের জানালা একটু ফাঁক করে রাখ, তাতেই হবে।
সেলফিস আর কাকে বলে!
হেমাঙ্গ এয়ারকন্ডিশনার বন্ধ করে নিজের দিকের জানালার কাচ একটু নামিয়ে দিয়ে বলল, ব্যাচেলরদের সবাই এক্সয়েট করে।
তুই আবার ব্যাচেলার কিসের? এক ফেঁটা তো বয়স। বিয়ের যুগি আগে হ, তারপর ব্যাচেলর কপচাবি।
কাল তো তুই-ই একটা পাত্রীর খবর দিলি।
ওরকম দিদিরা করেই থাকে। বিয়ের কথায় বেসামাল হয়ে আবার গাড়ি কোথাও ভিড়িয়ে দিস না। এত ঝাঁকুনি লাগছে কেন?
কলকাতার রাস্তা তো আর আমার বানানো নয়।
দেখে চালা। যা বকবক করছি তখন থেকে। গাড়ি চালানোর সময় অত কথা কিসের?
বকবক তুইও কি কিছু কম করছিস?
করছি বেশ করছি। আমি তো আর গাড়ি চালাচ্ছি না।
বেশী মেজাজ দেখাবি তো গাড়ি থামিয়ে নেমে কোথাও চলে যাবো।
আচ্ছা বাবা, বকবক করতে করতেই চালা। রিয়া জানতে চাইছে কণাদ চৌধুরী কি বিলেত-ফেরত?
হ্যাঁ। জার্মানি আর আমেরিকাতেও ছিল। বলে হেমাঙ্গ চয়নের দিকে তাকিয়ে বলল, বাঁ হাতটা অমন চেপে ধরে আছেন কেন? সামথিং রং।
ক্লিষ্ট মুখে ভয়াতুর চয়ন বরে, সেই রেলগাড়ির শব্দটা হচ্ছে। বড্ড কুয়াশা। মাই গড্।
০১১. কাল রাতে বামাচরণে আর রামজীবনে
কাল রাতে বামাচরণে আর রামজীবনে তুমুল হয়ে গেছে। সে এমন ব্যাপার যে মনেই হয়নি এরা ভদ্রলোকের ছেলে। ও একে আর এ ওকে শুয়োরের বাচ্চা, খানকীর বাচ্চা থেকে শুরু করে এমন সব গালাগাল দিয়েছে যা সহোদয় ভাইরা পরস্পরকে দিতে পারে না। মুখে মুখে যতক্ষণ হচ্ছিল ততক্ষণ একরকম ছিল, তারপর দুজনেই একজন দা আর একজন টাঙ্গি নিয়ে উঠোনে নেমে পড়ল। বউ দুটো আর নয়নতারা প্ৰাণপণে চেঁচাচ্ছিল। নয়নতারা ভয়ে আর বউ দুটো রাগে। লোকজন যারা জুটেছিল তারাই শেষ অবধি খুনোখুনি হতে দেয়নি। উঠোনে যখন এ কাও চলছিল তখনও বারান্দায় জলচৌকিতে বিষ্ণুপদ ঝুম হয়ে বসা। নড়াচড়া নেই, ঝগড়া থামানোর উদ্যোগ নেই। বিষ্ণুপদর ভিতরটা কি মরে পাথর হয়ে গেছে? বিষ্ণুপদ নিজেই সেটা বুঝতে পারে না।
গাঁয়ের মাতব্বররা এসে বিষ্ণুপদকে বলল, এর একটা বিহিত তো করতে হবে বিষ্ণুখুড়ো! সম্পত্তি ভাগ করে দিচ্ছেন না কেন?
বিষ্ণুপদ নিস্তেজ গলায় বলল, ভাগ তো ওরাই করে নিয়েছে। আর ভাগের কী?
রাজু হালদার বলল, ভাগের কাগজপত্র নকশা না থাকলে ভাগের মূল্যটা কী বলুন। বামাচরণের জমির মধ্যেই তো রান্নাঘর তুলে ফেলল রমজীবন। তা হলে আইনটা কী হবে?
এত লোক সোরগোল করছিল যে, বিষ্ণুপদ মাথাটা ভাল কাজ করছিল না। তবে এ কথা ঠিক যে, আজ দুপুরে হঠাৎ ইরফান মিস্ত্রিকে দিয়ে পশ্চিম দিকে একটা ছোটো ঘর গাঁথিয়ে ফেলছিল রামজীবন। তখনই বামার বউ শ্যামলী বেরিয়ে এসে চেঁচিয়েছিল, এটা কী হচ্ছে? ও তো আমাদের ভাগের জমি, ওখানে ঘর তুলছেন কেন?
রামজীবন প্রথমটায় জবাব দেয়নি, শুধু ইরফানকে তাড়া দিচ্ছিল ঘরখানা ঝটিতি বানিয়ে ফেলতে।
শ্যামলী তখন থাকতে না পেরে সোজা গিয়ে ইরফানকে এক ধাক্কা মেরে বলেছিল, খবদার আর একটাও ইট গাঁথবেন না। তাহলে খারাপ হয়ে যাবে।
আর তখন রামজীবন চোখ রাঙিয়ে উঠেছিল, চোপ মাগী।
শ্যামলী তার দেওরের দিকে ফিরে বলেছিল, অতই যদি মুরোদ তবে উনি বাড়ি থাকতে ঘর তোলেননি কেন? যেই উনি বেরিয়ে গেলেন সঙ্গে সঙ্গে ঘর তুলে ফেলছেন! মহা শয়তান তো আপনি!
সেই থেকে ঝগড়া চলছে।
শ্যামলী একবার এসে বিষ্ণুপদকেও বলেছিল, আপনি ঠুটো জগন্নাথ হয়ে বসে আছেন যে বড়! আপনার চোখের সামনে এত বড় অন্যায়টা হয়ে যাচ্ছে দেখেও চুপ করে বসে আছেন! মুখে কি পুটিং ঠেসে দিয়ে গেছে কেউ? না কি গুণধর ছেলের পাকা ঘরে থাকবেন বলে সব অন্যায় মেনে নিচ্ছেন?
বিষ্ণুপদর মুখে কোনও জবাব এল না। মাথাটা বড় হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। তার চোখের সামনে বহু অন্যায় বহুবার হয়ে গেছে, বিষ্ণুপদর মুখে একটিও প্রতিবাদ কেউ শোনেনি। শ্যামলীর দিকে বিষ্ণুপদ শুধু চেয়ে ছিল।
নয়নতারা এসে পক্ষিণী যেমন শাবককে আড়াল করে তেমনি করেই বিষ্ণুপদকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে বলল, ওঁকে এর মধ্যে টানছো কেন বউমা? এ লোক তো সাতে-পাঁচে থাকেনি কখনও। ভীতু মানুষ। ও সব তোমাদের গণ্ডগোল, তোমরা বুঝে নাও।
আহা, ন্যাকা! কিছু বোঝে না! ভীতু! অমন ছেলের জন্ম তাহলে দিল কি করে?
নয়নতারা বিষ্ণুপদকে বলল, যাও তো, জলচৌকি হাতে করে নিয়ে গিয়ে জামতলায় বসে থাকো তো। বাড়িতে থাকার দরকার নেই।
ভাগ্যিস বৃষ্টিটা তখন ছিল না। বিষ্ণুপদ গুটি গুটি গিয়ে বাইরের জামতলায় বসে রইল। কিন্তু গায়ে গু মাখলেই কি যমে ছাড়ে? সন্ধেবেলাতক বসে থেকে যখন বিষ্ণুপদ ঘরে এল তখনও উঠোনে দাপাচ্ছে শ্যামলী, বিস্তার বউ-ঝি কাছাবাচ্চা, দু-চারটে উটকো লোকও জুটে গেছে মজা দেখতে। রামজীব বাড়িতে নেই। ইরফান কাজ বন্ধ রেখে চলে গেছে। তবে রান্নাঘরের দেয়াল চারটে প্রায় ছাদ অবধি গেঁথে ফেলেছে।
