অনেক রাতে আমার ছোট ছেলে দোলন উঠে এল ওপরে। সে মাঝরাতে কখনও কখনও টয়লেটে যায়। তখন সে আমার ঘরে গিয়ে একবার আমাকে দেখে একটু আদর করে আসে। সে এখন আর ছোটটি নেই। বয়ঃসন্ধি পেরোচ্ছে। দোলনের সঙ্গে আমার একটা অদ্ভুত সম্পর্ক আছে। অন্য সকলের কাছে সে বেশ পরিণত এক কিশোর। কিন্তু যখনই আমার কাছে আসে তখনই সে একেবারে শিশু হয়ে যায়। হয়তো মানুষের মধ্যে শিশু হওয়ার একটা জন্মগত প্রবণতা থাকে। আমারও আছে। দোলন আমার সঙ্গে গল্প করতে ভালবাসে। তার প্রিয় বিষয় মহাকাশ। আমরা মাঝে মাঝে টেলিস্কোপ দিয়ে গ্ৰহাবলোকন করি। কখনও তাকে নানা নক্ষত্র চিনিয়ে দিই। ওই অসীম শূন্যের প্রতি তার আকর্ষণ তীব্র। মাঝরাতে সে যখন ঘরে আমাকে খুঁজে না পেয়ে ছাদে উঠে এল তখন আমি ভূতগ্ৰন্তের মতো বসে আছি।
বাবা, তুমি কি করছ?
আমি হেসে বললাম, বসে আছি। আজ ঘরে মন টিকল না। তুমি ঘুমোওনি?
ঘুমিয়েছিলাম। টয়লেট থেকে ফেরার সময় দেখলাম, তুমি ঘরে নেই। ভাবলাম নিশ্চয়ই ছাদে এসেছে। তোমার ঠাণ্ডা লাগছে না বাবা?
লাগছে। তবে কলকাতায় আর তেমন শীত কই?
দোলনের সঙ্গে নেমে এলাম আমার ঘরে। দুজনে পাশাপাশি লেপের তলায় শুয়ে কিছুক্ষণ গল্প হল। তারপর দোলন ঘুমিয়ে পড়ল। আমার ঘুম এল না। আমি ওর আবছায়া মুখখানার দিকে চেয়ে ভাবছিলাম, আমি যদি ব্যভিচারী হয়ে যাই তাহলে দোলন আমাকে কী চোখে দেখবে। আমি যদি ওর মাকে ডিভোর্স করে মেয়ের বয়সী একটি তরুণীকে বিয়ে করে আনি তাহলে আমার এই রচিত সম্পর্কের সংসার মিসমার হয়ে যাবে না কি? ভেঙে পড়বে সব সম্পর্ক। মানুষ এইসব ভেবেই তো সংযত রাখে নিজেকে। এইসব মূল্যবোধ অনেক সময় মানুষকে রক্ষা করে। অনেক সময়েই করে না। এইসব ভাঙচুর, এইসব সম্পর্কের অবসানই সারা পৃথিবীতে পরিবার-প্রথার অবলোপ ঘটাচ্ছে। মানুষ হয়ে যাচ্ছে বিচ্ছিন্ন ও একা। নিতান্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মানুষও হয়ে পড়ছে। অনাত্মীয়। এ এক বিষম পরিস্থিতি।
গভীর রাতে সন্তানের মুখের দিকে আমি সম্মোহিতের মতো চেয়ে ছিলাম। আমার প্রাণাদিক প্রিয় এই পুত্রটি আমি আমার বলে জানি, তাই এত ভালবাসি। কিন্তু এমন যদি হত যে, আমি জানি না যে, পুত্রটি আসলে আমার নয়, হয়তো অন্য কারও ছেলে, নার্সিং হোমে রদবদল ঘটে গেছে। সে ক্ষেত্রেও একটি বিভ্ৰম কাজ করবে-পুত্রটি আমার-এই বোধ। তাহলে কি আমি আসলে নিজের বলে না ভাবতে পারলে কোনও কিছুকেই তেমনভাবে ভালবাসতে পারি না? অহং-ই কি মানুষের প্রীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে? আধুনিক মানুষ হয়তো এই অধিকারবোধ থেকে, দায় ও দায়িত্ব থেকে মুক্তি চাইছে। তাই তারা তুলে দিচ্ছে বিবাহ নামক বাহুল্য অনুষ্ঠানটিকে। বলোপ করছে পরিবারপ্ৰথা। তারা চাইছে মানুষের সন্তান-সন্তুতি আর পিতৃপরিচয় বহন না করুক। তার দরকার নেই! হয়তো এ সমস্তই পুরনো কুসংস্কারমাত্র।
যদি পৃথিবী ক্রমে ক্রমে সেই মুক্ত সম্পর্কের সমাজে পৌঁছয় তাহলে কেমন হবে সমাজের চেহারা? কেমন হবে নারী ও পুরুষের সম্পর্ক? কেমন হবে সন্তানের সঙ্গে পিতামাতার আত্মীয়তা? ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আমার খুব ভয় হল। আমি হঠাৎ দুহাত বাড়িয়ে আমার ছেলেকে আঁকড়ে ধরে বললাম, না না, এরকম হবে না। এরকম হতেই পারে না।
আবার ভেবে দেখেছি, আমি আঁকড়ে ধরতে চাইলেই বা কি? সন্তানসন্ততিরা তো সত্যিই আর বাবা-মায়ের সম্পত্তি হয়ে থাকে না। তারা বৃহত্তর কর্মযজ্ঞে চলে যায়, বাবা-মা পড়ে থাকে। আগে শুনতাম, জাপান হচ্ছে শিশুদের স্বৰ্গরাজ্য—সেখানে শিশুদের সমাদর সবচেয়ে বেশি, যৌবনের কদর আমেরিকায়, আর বৃদ্ধের কদর ভারতবর্ষে। ভারতবর্ষে একসময়ে তাই ছিল। প্রবীণরা কখনও অবহেলিত ছিলেন না। এখানে। পরিবারের কর্তা, সমাজের মাথা, পাঁচজনের পরামর্শদাতা। কিন্তু এখন কলকাতা এবং তার আশপাশে ক্রমেই বাড়ছে বৃদ্ধাশ্ৰম। অবহেলিত পিতামাতার জন্য এক একটা নির্বিকার আশ্রয়। সন্তানরা আর মা-বাবার জন্য সময় দিতে পারছে না, নিতে পারছে না। দায়িত্ব। আমিও তো পঞ্চাশ পেরিয়ে এলাম। বুড়ো বয়সের আর বাকি কী? আজি গভীর রাতে পুত্রের প্রিয় মুখশ্ৰী অবলোকন করতে করতে ভাবলাম, হায় মন, তুমি কত ভুলই না রচনা করলে, সৃষ্টি করলে কত কল্পমায়া! প্রগাঢ় বিষাদে ড়ুবে আমি রাত কাটিয়ে দিলাম। এইসব লিপিবদ্ধ করে।
বুকের মধ্যে আজকাল একটা কষ্ট হয় কৃষ্ণজীবনের। সেটা শারীরিক কষ্ট নয়। মানসিক। সবসময়ে একটা হাহাকার যেন ধ্বনিত হচ্ছে ভিতরে। আজকাল সে প্রায়ই চলে যায় বিষ্টুপুর। স্টেশনে নেমে হাঁটতে হাঁটতে দিগন্ত পেরোয়।
বিষ্টুপুরে মা আছে। মায়ের কাছে চুপচাপ বসে থাকতে কিছুক্ষণ তার ভালই লাগে। সে আর শিশু কৃষ্ণজীবন নয়। বয়স্ক এক দায়িত্ববান পুরুষ। তবু কেন মায়ের কাছে এই বসে থাকা তার প্রিয়?
হোয়েন আই মিট মাইসেলফ-এ সে লিখল, আমার এই দুঃখী ও দরিদ্র মা আমাকে কিছুই আর দিতে পারে না। তবু এই যে তার ছায়ায় এসে কিছুক্ষণ বসে থাকি সে শুধু একটা কারণেই। পৃথিবীতে বোধ হয় একদিন মা ডাকটিরও অবসান ঘটবে। লন্ডনের এক বৃদ্ধ সাহেবের সঙ্গে আমার আলাপ আছে। অশীতিপর সেই বৃদ্ধ আমাকে কেবলই বলে, ওল্ড লন্ডন কত ভাল ছিল। সেই লন্ডন আর নেই। লন্ডনের গল্প করতে করতে সে প্রায়ই বলে, তার মায়ের মতো এমন চমৎকার পাই সে জীবনে আর কখনও খায়নি। সাহেবরা ভাবাবেগপ্রবণ জাত নয়। তারা মা-বাবার স্মৃতি নিয়েও পড়ে থাকে না। কিন্তু কারও কারও হয়তো এখনও কিছু বোধ আছে। মা এক মহান ও আশ্চর্য মহিলা। একজন মহিলা যখন মা হয় তখনই সে সন্তানের কাছে এক মহার্ঘ ও সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মানুষ। আমি এক দারিদ্র্যপীড়িত সংসারে জন্মেছি বলেই জানি, মায়েরা সন্তানের জন্য কত অনন্ত ত্যাগ করতে পারে। আমার এই মা সর্বদাই তার ভাগের খাবার থেকে এক ভাত সরিয়ে রাখত আমার জন্য। আমার খিদে বেশি, অনেকটা পথ হেঁটে ইস্কুলে যাতায়াত করতে হয়, লাঙল করতে হয়। চাষবাস। মা আমার খিদে বুঝত। একমাত্র মায়েরাই যা বোঝে। মা জাতিই পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে কি?
