লিখতে লিখতে কৃষ্ণজীবন আপন মনে হাসে, কখনও মাথা নাড়ে, কখনও দীর্ঘশ্বাস ফেলে। যে বিয়েবাড়ির কথা সে লিখছিল তা তার চোখের সামনে ভিডিওতে তোলা ছবির মতো ভেসে যেতে লাগল। বুমকিকে একটা নীল বেনারসীতে চমৎকার দেখাচ্ছিল। পোশাক মানুষকে ততটা সুন্দর করতে পারে না, যতটা পারে অভ্যন্তরীণ আনন্দের আভা যখন বিকীর্ণ হয় তার অবয়বে। এক মনোরম গেট টুগেদারের মতো সেই বিয়ে কি বস্তৃতই ছিল আরও পাঁচটা বিয়ের রিপ্লে? না, তা নয়। কৃষ্ণজীবন লিখবার জন্য লিখল। অনেক সময়ে আসল অভিজ্ঞতার ওপর একটা দার্শনিকতার প্রলেপ দিতে হয়।
সেই বিশাল বিয়েবাড়িতে অনেক আনোচকানোচ ছিল। যাকে ইংরেজিতে বলা হয় নুকস অ্যান্ড করনারাস। একটা পামবীথি ছিল আর তার ওপাশে ছিল একটা ফুলের ঝোপ।
সে আর অনু বসেছিল পাশাপাশি।
অনু বলছিল, আচ্ছা বিয়েবাড়ি আপনার কেমন লাগে?
ভাল নয় অনু। আজকাল একদম ভাল লাগে না।
কেন ভাল লাগে না?
ভিড় আজকাল আমার সহ্য হয় না। গ্যাদারিং দেখলেই রিপালসন হয়।
যেখানে গ্যাদারিং-এ আমি আছি সেখানেও ভাল লাগে না?
তুমি খুব দুষ্ট আছ।
বলুন না!
তার হোয়েন আই মিট মাইসেলফ-এ অকপট কৃষ্ণজীবন লিখল, এ মেয়েটা কি আমার প্রেমিকা? এর সঙ্গে আমার বয়সের তফাত পঁয়ত্ৰিশ বা ছত্ৰিশ বছর। আমার মেয়ের বয়সী এবং তারই বান্ধবী। মোহগ্ৰস্ত দুখানা চোখে যখন আমার চোখের দিকে চেয়ে ভাবে একটা মৃদু ও প্রশ্রয়ী হাঁ শুনতে চাইছিল মেয়েটি তখন আমার দুরকম কথা মনে হচ্ছিল। ইচ্ছে করলে আমি মেয়ে এমন রূঢ় কথা বলতে পারি যাতে ওর মোহ ভেঙে খান খান হয়ে যায়। আবার ইচ্ছে করলে ও যা শুনতে চাইছে। তাই বলতে পারি। আমি একজন পঞ্চাশোধৰ্ম মানুষ একজন তরুণীকে কী বলব? আমি যেন এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। এ মেয়েটির প্রতি কি আমি আসক্ত? আমি কি অন্ধ, বিচারবোধহীন, মোহগ্ৰস্ত কামের শিকার? এ কি গড়ানো বয়সে তরুণী-হৃদয়ের জন্য দুর্মর আকাঙ্ক্ষা? নাকি নর ও নারী এরা কোনও বয়স বা সম্পর্কের শর্তে আবদ্ধ নয়? কিন্তু আমি বহুদিন ধরে পশ্চিমী সমাজের ব্যভিচার ও যৌনবিকৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। আমার বরাবরই অপছন্দ বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক। তবু কেন এই মেয়েটির চোখের দিকে চেয়ে আমি কিছুতেই বলতে পারছি না, না!
বরং আমি বললাম—খুব পুষ্পিত ভাষায় না হলেও—বললাম, তোমার কথা আলাদা। তোমার টানেই তো আসা।
এ আমি কী বললাম? এই অপরিণতবুদ্ধি, সবে বয়ঃসন্ধি পেরোনো, আবেগ-তাড়িত, উদ্বেল-হৃদয় মেয়েটি আমার প্রেমে পড়ে গিয়ে থাকলেও একদিন যে এর চৈতন্য ফিরবে। ফিরবে বাস্তববোধ। এ যে কত বড় ভুল করেছিল তা যেদিন বুঝতে পারবে সেদিন কি ছুঁড়ে আমাকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেবে না?
কিন্তু পূর্বাপর চিন্তা করে মানুষ কটা কাজই বা করে? মেয়েটি উজ্জ্বল চোখে আমার দিকে চেয়ে, আমার একটা হাত চেপে ধরে বলে উঠল, সত্যি বলছেন? শুধু আমার জন্য?
আমার বড় মায়া আর করুণা হচ্ছিল। কীই বা ওর বয়স, কত সম্ভাবনা পড়ে আছে। ওর জীবনে। এই পঞ্চাশোধৰ্ব্ব একজন মানুষের মুখের সামান্য স্তোকবাক্য শুনে ওর ঠোঁটে ভাঙছে বঁধভাঙা আনন্দের হাসি, ন্যাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছে। আবেগে, গর্বে ভরে উঠছে বুক।
সে আমার হাত ধরে বসে রইল অনেকক্ষণ। বিয়ে বাড়ি, যে কেউ যখন তখন এসে পড়তে পারে। কিন্তু তার পরোয়া নেই। এইটেই তো বেহিসেবী হওয়ার বয়স। কিন্তু আমার বয়স তো বেপরোয়া বয়স নয়। আমার হৃদয়ে আজ মুকু হিসেব নিকেশ, অনেক দ্বিধা-দ্বন্ধু। তবু তার হাতে হাতটি সমর্পণ করে বসে থাকা ছাড়া আর আমার কিছুই করার ছিল না।
আমাদের এক বাঙালি কবি লিখেছিলেন, একটি কথায় দ্বিধাথরথর চুড়ে ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী।-বাস্তবিক আমরা সেই সন্ধেয় বোধ হয় আমরাবতীর খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম।
সে বলল, আমি আপনাকে এত ভালবাসি, কিন্তু আপনি আমাকে একটুও না।
প্রেমিক প্রেমিকারা প্ৰলাপ বকেই থাকে। তাদের কথার কোনও মাথামুণ্ডু হয় না। হলে তা আর প্রেমের সংলাপ থাকে কি? আমিও সেই সন্ধ্যায় প্রলাপের স্রোতে ভেসে গেলাম কিছু দূর। বললাম, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমিও… আমিও…
আমি–পঞ্চাশোর্ধ্ব–তিন ছেলেমেয়ের বাবা, দায়িত্বশীল একজন মানুষ কি করে ভেসে যাচ্ছি?
উজানে ফেরে না নদী। সেই সন্ধ্যায় আমি তবু ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। আমার কৈশোরকালে। আচ্ছা, এই যে আমাদের বয়স হয়, এই যে আমরা সেকেন্ড-মিনিট-ঘণ্টা-দিন-মাস-বছর পেরিয়ে আসি এটা আসলে কী? সময় বলে কিছু আছে? বয়স বলে কিছু। এ তো আমাদের মনগড়া একটা কল্পনা মাত্র। অ্যাবস্ট্রাক্ট। আসলে সত্যিই কি আমি মধ্যবয়স্ক? ওটা তো ধারণা মাত্র।
মানুষ সবসময়েই চেষ্টা করে, তার যত দুর্বলতা, যত বৃত্তি-প্রবৃত্তির তাড়না, যত লোভ-লালসা সব কিছুকেই একটা যুক্তিসিদ্ধ ভিতের ওপর দাঁড় করাতে। সে হয়তো জানে, মনে মনে জানে, কাজটা ঠিক হচ্ছে না। তবু নানা পাল্টা যুক্তি দিয়ে সে সেটাকে সমর্থন করার পথ খোজে। ভেবে দেখলাম, মানুষ নিজের দুর্বলতাকে ছাড়তে চায় না। সে নিজে দুর্বলতাগুলিকে বড় ভালবাসে। ভালবাসে বলেই তাদের গৃহপালিতের মতো পুষে রাখে।
সেই বিয়ের রাতটি এইসব কারণেই আমি ভুলব না। সেই রাতে বাড়ি ফিরে আমি ছাদে উঠে এসেছিলাম। শীতকাল। এত রাতে ছাদে কেউ নেই। আমি গভীর রাত অবধি ছাদে বসে থেকে এই মহানগরীর আলো ও অন্ধকার দেখতে দেখতে কত দূরে যে চলে গেলাম। মন—মনই তো সব মানুষের। সর্বোত্তম পুঁজিপাটা। মন দিয়েই মানুষ সব কিছু গড়ে নেয়। মনের মতো শক্তিশালী কিছুই হয় না। মধ্যবয়স্ক আমাকে সে-ই পরিয়ে দিতে পারে তারুণ্যের মুকুট। মনই রচনা করে প্ৰেম। মনই এই শহরের দেয়ালে দেয়ালে, আকাশে-বাতাসে ঐকে দেয় নানা বর্ণের ছবি। মনই ভালবাসে, ঘেন্না করে, রাগ-আক্রোশ-বিদ্বেষ-মোহ-সবই তো মন। সে এক দুষ্ট দামাল ছেলে, শাসন মানে না, আইন মানে না, সভ্যতা মানে না। এই দামালকে কি করে যে ঘরে ফেরাই!
