আমি পারব স্যার।
তুমি তাজমহল দেখনি, না?
না।
আমি প্রথমবার যখন তাজমহল দেখতে যাই তখন ওরকম একটা মাচ পাবলিসাইজড ইমারত দেখে তেমন কিছু ইমপ্রেশন হয়নি। কিন্তু আশ্চর্য কী জানো? যখন দেখে-টেখে চলে আসছি তখন একটা ম্যাগনেটিক পুল যেন পিছন থেকে টানছিল। বারবার ফিরে তাকাতে হচ্ছিল তাজমহলের দিকে। অ্যাট্রাকশনটা যে কিসের তা আজও বুঝতে পারিনি। কলকাতার আকর্ষণ তাজমহলের মতো নয়। কিন্তু এই শহরেরও একটা মিস্টিরিয়াস অ্যাট্রাকশন আছে। লজ্জার কথা কী জানো, আমি এত গ্রাম-ভক্ত হওয়া সত্ত্বেও কলকাতাকে কখনও অস্বীকার করতে পারি না। তাই বলছি, কলকাতাকে ডিভোর্স করার আগে ভাল করে ভেবে নাও।
বিচক্ষণ কৃষ্ণজীবন কতখানি সত্যি কথা বলেছিলেন তা তিন-চারদিন ধরে নানা কথা চিন্তা করার পর একটু একটু টের পেতে লাগল সে। হয়তো সত্যিই সে পারবে না। আজ পাড়াগায়ে গিয়ে থাকতে। হয়তো বিষণ্ণ লাগবে, একা লাগবে।
তাকে দেখতে এল চারুশীলা, ছেলেমেয়ে নিয়ে। দেখতে এল হেমাঙ্গ। দেখে গেল ঝুমকি আর অনু। রোজ দেখে যায় রিয়া আর ভুল ছেলেমেয়েরা। তারপর, দিন সাতেক বাদে তাকে আপাদমস্তক চমকে দিয়ে এক বিকেলে এসে হাজির হল দাদা আর বউদি।
অয়নের সামনের দুটো দাঁত উড়ে মুখটা ফোকলা আর বোকা বোকা দেখাচ্ছিল। কেমন একটা সংকুচিত ভাব। বউদি বিষণ্ণ, ছলছলে।
প্রথমটায় কথা আসছিল না কোনও পক্ষেরই। শেষ অবধি অয়ন কষ্ট করেই বলল, আমিও তো মার খেয়েছি, দেখছিস! শোধবোধ হয়ে গেছে।
চয়ন শান্তভাবে বলল, আমি গ্রামে চলে যাওয়ার কথা ভাবছি।
সে যাওয়ার হলে যাবি। কিন্তু কাজিয়াটা মিটিয়ে নে।
বউদি বলল, ছাদের চিলেকোঠোটা একটু বড় করে ছাদ ঢালাই হবে। বুঝলে? তোমার জন্যই।
কেন বউদি?
আমরা অনেক ভেবে দেখেছি, তোমার দাদার বা আমারও আপনজন বলতে কেউ নেই। আমি মা-বাপের একমাত্র সন্তান। আমাদের কে আছে বলো তো! ছেলেপুলেও হল না। বয়স হয়ে যাচ্ছে।
আমি যদি কলকাতায় থাকি তা হলে ওই চিলেকোঠাতেই থাকতে পারব।
বউদি একটু হাসল, পারবে না। চিলেকোঠা ভেঙে ফেলে ঘর করা শুরু হয়ে গেছে। আজ ঢালাইও হয়ে গেল।
কেন করতে গেলে? কত খরচ!
বউদি মাথা নেড়ে বলল, তোমার জন্যই তো নয়। চিলেকোঠাটা এমনিতেই নড়বড়ে ছিল। ভেঙে করতেই হত। শোনো চয়ন, গ্রামে গিয়ে মাস্টারি করতে চাও কেন? সেখানে কোন উন্নতিটা করবে। শুনি? টিউশনি করেই তো তোমার বেশ চলে যাচ্ছে।
তোমরা কি আমাকে চাও বাউদি? আমার যে বিশ্বাস হতে চায় না। ভাবি, তোমাদের ঘাড়ে পড়ে আছি বোঝা হয়ে।
বউদি একটু বিষণ্ণ হয়ে বসে থেকে বলল, সবকিছুই বুঝতে একটু সময় লাগে। বয়সও লাগে। আমার আজকাল মনে হয়, তোমাকে আমাদের আর একটু বোঝা উচিত ছিল। তুমি বড্ড নিরীহ বলেই বোধ হয় তোমার ওপর অত্যাচারটা বেশি হয়।
অয়ন মিনমিনে গলায় বলল, কবে ছাড়বে এরা?
জানি না।
ঠিক আছে। খবর নেবো। এসো নিয়ে যাবোখন।
দাদা, বউদি চলে যাওয়ার পরই যেন সে বুঝতে পারল, সত্যিই সে কলকাতা ছেড়ে কোথাও গিয়ে থাকতে পারবে না। নিজের হাতের তেলোর মতো চেনা তার এই শহর। প্রতিটি রাস্তাঘাট, এ শহরের সকাল বিকেল, গ্ৰীষ্ম-বর্ষা-শীত এ সবই তার আজন্ম চেনা। এ শহর ছেড়ে কোথায় যাবে সে?
না, গ্রামে গিয়ে সে পারত না। বিচক্ষণ ও জ্ঞানী কৃষ্ণজীবনের প্রতি য়। তার মন ভরে গেল।
ক্রাচে ভর দিয়ে যেদিন নার্সি হোম থেকে বেরিয়ে এল সে, সে অবাক চোখে দেখল, শীতের সকালে কলকাতা যেন তারই অপেক্ষায় সেজে বসে আছে। সাজ কিছুই নয়, একটু রোদ, লোকজন, একটু ঠাণ্ডা হওয়া। সেই পুরনো কলকাতাই। তবু যেন এক আবিষ্কারকের চোখে নতুন ভূখণ্ড দেখল চয়ন।
দাদা আর বউদি দুধারে, সে ধীরে ধীরে ট্যাক্সিতে গিয়ে উঠল।
১২০. একাকার হয়ে যাই
কলকাতা একটা অদ্ভুত শহর। এরা নিশ্চয়ই নিজস্বতা কিছু আছে। এই শহরে যারা একবার বসবাস শুরু করে তারা আর অন্য কোথাও যেতে আগ্ৰহ বোধ করে না। গেলেও তারা কলকাতায় ফিরে আসার কথাই বোধ হয় ভাবে। কিন্তু আমার মনে হয় লন্ডন, নিউ ইয়র্ক বা মস্কো ও কি তাই নয়? এইসব শহরের অধিবাসীরা কেউ আর কারও মতো নয়, প্রতিটি শহরেরই পরিবেশ ভিন্ন, ভিন্ন তাদের ভূগোল ও ইতিহাস, ভিন্ন তাদের জীবনযাত্রা। লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, মস্কো বা কলকাতা কেউ কারও মতো নয়। আবার এক অর্থে ওরা সবাই সেই মহানগরী—সেই নরক, যাকে হিন্দুশাস্ত্রে বলা হয় কুম্ভীপাক। যার মধ্যে হাজারো রকমের মানুষকে মিশিয়ে পাক খাওয়ানো হচ্ছে নানা জীবিকায়, নানা মতলবে, নানা আশা বা বঞ্চনায়!
আমি এইসব শহরের চুম্বকের মতো আকর্ষণের কথা ভেবেছি। কিসের এই আকর্ষণ? জীবিকা? বৃহত্তর সুযোগ? নানা সম্ভাবনা? হ্যাঁ, এ সবই সত্যি। কিন্তু এর অতিরিক্তও কিছু আছে। মহানগর মানেই একটি জঙ্গম, চলিষ্ণুতা। এখানে সারাক্ষণ একটা জীবনের প্রবাহ চলেছে, চলেছে নানা কর্মকাণ্ড। এই জঙ্গমতাই কি আকর্ষণ করে মানুষকে? কলকাতায় যে ঠেলাওলা দিনরাত খেটে দেশে টাকা পাঠায় সেও কি অনুভব করে এই আকর্ষণ?
এইভাবেই কৃষ্ণজীবন শুরু করল তার হোয়েন আই মিট মাইসেলফ। গ্রন্থটির বিষয় কলকাতা এবং কলকাতার সূত্র ধরে পৃথিবীর আরও নানা শহর।
এক জায়গায় কৃষ্ণজীবন লিখল, সেদিন শীতের এক সন্ধ্যায় আমি একটা বিয়েবাড়িতে গিয়েছিলাম। হিন্দু বিয়ে। হিন্দুরা বর্ণাশ্রম মানে। এই বিয়ের পাত্র-পাত্রীরাও একই বর্ণের। তাছাড়া তাদের মধ্যে পূর্বরাগও ঘটেছে। খুবই সুখী বিয়ে। কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়। সেই বিয়েবাড়ি আর পাঁচটা বিয়েবাড়ির মতোই হুবহু একরকম। ভাড়া করা বিয়েবাড়ি সাজানো হয়েছে ফুল আর আলোয়। বেনারসী ও গয়নার ঝিলিক চারদিকে। মৃদু হাসি, আড্ডা, ক্যাটারারের পরিবেশিত সুখাদ্য সবই যেন একরকম। শুধু অবাক কাণ্ড, পাত্র-পাত্রী ও নিমন্ত্রিত ইত্যাদিদের দেখে আমার যেন মনে হচ্ছিল, এটা এর আগে একশোবার দেখা একটা বিয়েরই রিপ্লে। এই পাত্র-পাত্রীরা যেন এর আগে আরও বহুবার বিয়ে করেছে, একই নিমন্ত্রিতরা এসেছে, একই ক্যাটারার একই খাবার দিয়েছে। সেই বিয়েবাড়িতে হঠাৎ আমার মনে হল, মানুষ কি সঙ্ঘবদ্ধভাবে নিজেরই পুনরাবৃত্তি করে মাত্র?
