জ্ঞান ফিরল পরদিন দুপুরে। আশ্চর্য মানুষের জীবনীশক্তি। তার মতো দুর্বল, ক্ষীণজীবী মানুষও যে কি করে মাথায় ওই রডের বাড়ি খেয়ে বেঁচে রইল কে বলবে। পটু এবং পাড়ার ছেলেরা অবশ্য বলেছিল, সে পড়ে যাওয়ায় রাডটা মাথায় ঠিকমতো লাগেনি। শানের ওপর ঘষটা খেয়ে তারপর লেগেছিল বলে ইমপ্যাক্ট কমে গিয়েছিল। নইলে ঘিলু বেরিয়ে যাওয়ার কথা।
সে পল্টুকে বউদির কথা জিজ্ঞেস করেছিল।
পল্টন্টু বলল, বউদিকে মেরেছিল। টর্চ দিয়ে। মাথায় লেগে অজ্ঞান হয়ে যায়। তবে তেমন কিছু হয়নি। সামলে গেছে।
পুলিশ কেস?
পল্টু লাজুক একটু হেসে বলল, ওটা আর করিনি। শালা পুলিশের হাতে তুলে দিলে নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না। কোথায় কোন কলকাঠি নেড়ে খালাস পেয়ে যাবে। পাড়ার লোকই আয়নন্দাকে চিট করেছে।
মেরেছ তোমরা?
কিছু মনে কোরো না ভাই, ও চিজকে ফাঁসিতে ঝোলানো উচিত। তার বদলে দু-চার ঘা আর বেশি কি? পাড়ার সিনিয়ররা এসে না পড়লে সেদিন অয়নও ইমার্জেন্সি কেস হয়ে যেত। দুটো দাঁত ভেঙেছে, আর কনুই মুচড়ে গেছে। কিল চড় লাথি যা পড়েছিল তাতে দিন চার-পাঁচ শুয়ে থাকতে হবে। তুমি চাইলে পুলিশ কেস করতে পারো।
চয়ন গত দশ দিন যাবৎ ভেবেছে, এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর সঙ্গে যুঝবার ক্ষমতাই তার নেই। সে বড় নরম, বড় দুর্বল, বড় ভীতু! মাথার পর একটু ছাদের জন্য অয়নকে তার আর বিব্রত করা উচিত নয়। এবার তার চিলেকোঠা ছাড়ার সময় হয়েছে।
হাসপাতাল থেকে তার ছুটি হয়নি। মাথা স্ক্যান করার কথা বলেছে ডাক্তার। আরও কিছু মেরামতি কাজ বাকি।
কিন্তু হাসপাতালে আর থাকতে পারছিল না চয়ন। আজ সকালে কাউকে কিছু না বলে সে বেরিয়ে এল। কেউ আটকাল না। রুগীর ভিড়ে কে কাকে লক্ষ করে!
হাঁটতে তার কষ্ট হচ্ছে। শরীর কাঁপছে, ক্রাচে কষ্ট হচ্ছে। দাম পাচ্ছে না। কোথায় যাবে ভেবেও পাচ্ছে না। সে।
একটা হার্ডওয়্যারের দোকান থেকে সে একটা ফোন করল কৃষ্ণজীবনকে। বিরল সৌভাগ্যই বলতে হবে। কৃষ্ণজীবনের ফোন সচল আছে এবং উনি কলকাতায় আছেন। নিজেই ফোন ধরলেন।
স্যার, আমি চয়ন।
কি খবর চয়ন? অনেকদিন আসোনি শুনলাম। শরীর খারাপ নাকি?
হ্যাঁ স্যার। শরীর খারাপ।
কী হয়েছিল?
আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।
আজ শনিবার। আমার ছুটি। তুমি কি এখনই আসতে চাও?
চাই স্যার। কিন্তু আমার কাছে এখন গাড়িভাড়া নেই।
চলো এসো। ট্যাক্সি করে। মোহিনীকে আমি দশ মিনিট বাদে নিচে পাঠাবো। সে ভাড়া দিয়ে দেবে।
মোহিনী নিচেই দাঁড়িয়ে ছিল। ক্রাচ-সহ তাকে নামতে দেখেই একটা আর্তনাদ করে দৌড়ে এসে তাকে ধরল, কী হয়েছে। আপনার? ইস, এ যে সাজাতিক অবস্থা!
ম্লান একটু হাসল চয়ন। বলল, দিজ আর দি উন্ডস অফ লাভ। সেলফিস জায়েন্ট মনে আছে মোহিনী?
মোহিনীর চোখ ছলছল করছিল, আপনার কি অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল?
হ্যাঁ হ্যাঁ, সেরকমই। না, ধরতে হবে না। আমি পারব।
তাকে দেখে অবাক কৃষ্ণজীবন বলল, এ কী কাণ্ড চয়ন?
ক্লিষ্ট হেসে চয়ন বলল, স্যার, সব কথা বলতে আমার লজ্জা করবে।
তার মানে কি চয়ন? কেউ কি তোমাকে মারধর করেছে? সে কি তোমার দাদা?
চয়ন মাথা নেড়ে জানাল, হ্যাঁ।
কৃষ্ণজীবন কিছুক্ষণ গুম হয়ে রইলেন। তারপর বললেন, তুমি হাসপাতালে ছিলে?
হ্যাঁ। আজ পালিয়ে এসেছি।
আমাকে আগেই জানাতে পারতে। তা হলে ব্যবস্থা-হয়ে যেত। তুমি তো এখনও সুস্থ নও।
না। স্যার, আমি ভাল আছি। আপনি আমাকে একটা গ্রামে পাঠাতে চেয়েছিলেন। এখন আমি সেখানেই চলে যেতে চাই।
কৃষ্ণজীবন একটু হাসলেন, যাবে, তার জন্য তাড়া নেই। কিন্তু আগে পুরোপুরি সুস্থ হওয়া দরকার। তোমার তো মনে হচ্ছে গায়ে এখনও জ্বর। শরীর কাঁপছে। মুখ সাদা। বোসো। আমাদের বাড়ির কাছেই একটা নার্সিং হোম আছে। একটা ফোন করে দেখি।
লাগবে না স্যার।
লাগবে।
কৃষ্ণজীবন ফোন করলেন। এবং ঘণ্টা খানেক বাদে একটা নার্সিং হোমের পরিচ্ছন্ন ঘরে চয়ন আশ্রয় পেল। একজন ডাক্তার তার ক্ষত পরীক্ষা করে বললেন, আপনি এখনও হসপিট্যাল কেস। কে আপনাকে রিলিজ করল?
কেউ না। আমি পালিয়ে এসেছি।
ডাক্তার একটু হেসে বললেন, এখনও কিছুদিন শুয়ে থাকতে হবে।
তা রইল চয়ন। তিনতলার নির্জন নিরিবিলি ঘরে বেশ শান্তিতে রয়ে গেল সে। দিন কয়েক বাদে কৃষ্ণজীবন এসে বললেন, তুমি মনের দিক থেকে প্রস্তুত তো চয়ন। এখনও ভেবে দেখ, গ্রামে থাকতে পারবে কি না। শহুরে আরাম কিন্তু সেখানে নেই।
চয়ন অত্যন্ত উদ্বেল হয়ে বলল, আমাকে কি ওরা নেবে স্যার?
নেবে। সে জন্য চিন্তা নেই। চিন্তা হল তোমাকে নিয়ে। তুমি পারবে তো?
পারব।
কৃষ্ণজীবন একটু চুপ করে থেকে বললেন, তুমি হয়তো শুনে খুশি হবে না, আমি তোমার দাদার সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করেছি। আমাদের কথা হয়েছে।
অবাক চয়ন বলে, দাদার সঙ্গে?
হ্যাঁ। তুমি কি জানো যে পাড়ার লোকেরা তোমার দাদাকে খুব মার দিয়েছে?
জানি স্যার। আপনার সঙ্গে কোথায় দেখা হল?
আমি তোমাদের বাড়ি গিয়েছিলাম। ভয় পেও না, তারা আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি।
আপনি কেন এতটা করলেন? আমার দাদা আপনাকে অপমান করতে পারত।
তা পারত। কিন্তু সে এখন অনুতপ্ত। খুবই অনুতপ্ত। তার ছেলে।পুলে নেই, স্বামী-স্ত্রীর সংসার। শেয়ার মার্কেটের নেশায় কাণ্ডজ্ঞান লোপ পেয়েছিল। সে তোমাকে ও বাড়ি ফিরে যেতে বলেছে। কথা দিয়েছে আর কোনও গণ্ডগোল হবে না। তুমি এখন কয়েকদিন চুপ করে শুয়ে শুয়ে ভেবে দেখ, গ্রামে যাবে, না। এখানেই থাকবে। এখনই জবাব দিও না। হাতে সময় আছে। হয়তো এ শহরেই কোনওদিন তোমার একটা চাকরিও হয়ে যেতে পারে। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে হয়তো অসম্ভব নয়। এ শহরের একটা সাজঘাতিক নেশা আছে! চট করে কলকাতাকে জীবন থেকে মুছে ফেলা যায় না।
