ভাবতে সময় নিলে না। পরে যদি কলকাতার জন্য মন কেমন করে?
আমার তা করবে না?
ঠিক বলছ? তা হলে কাল সকালে তোমার চেক-বইটা নিয়ে আমার কাছে চলে এসো। যে টাকাটা তুমি আমাকে পৃথিবীর ভালর জন্য দিয়েছিলে সেটা আমি তুলিনি। ভেবেছিলাম ভাবাবেগের বশে দিচ্ছ, পরে হয়তো টাকাটা তোমার দরকার হবে। এবার টাকাটা সত্যিই দরকার।
টাকাটা তো আপনাকে দিয়েই রেখেছি। আপনি যা খুশি করতে পারেন।
যা খুশি নয়। টাকাটা তোমার চাকরির জন্যই দরকার। কত বিচিত্র ধরনের ঘুষ যে আজকাল চালু হয়েছে তার লেখাজোখা নেই। তোমার চাকরির জন্য ত্ৰিশ হাজার টাকা ডিম্যান্ড করছেন ওরা। তাও আমার খাতিরে কিছু কম করে ধরেই। ভাবতে পারো ছাত্রছাত্রীদের চরিত্র গঠনের পবিত্র প্রতিষ্ঠানে তোমাকে ঢুকতে হচ্ছে ঘুষ দিয়ে? অদ্ভুত দেশ!
কিন্তু ও টাকা আমার চাকরির জন্য খরচ হলে তো আমার দান করাটা বৃথা হল।
কৃষ্ণজীবন মাথা নেড়ে বললেন, না, টাকাটা পৃথিবীর উপকারেই লাগল বলে ধরে নিচ্ছি। তোমার প্রতিষ্ঠা হলে উপকার হবে বলেই আমি মনে করি। ঘুষটা মানতে পারছিলাম না। কিন্তু উপায় যখন নেই তখন শুচিবাই ত্যাগ করাই ভাল।
পরদিন কৃষ্ণজীবন তাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে টাকাটা তুললেন। বললেন, আরও কুড়ি হাজার টাকা গ্রামের ব্যাংকে রেখে দিও। বিপদে আপদে কাজে লাগবে। আপাতত আমার কাছে থাক।
অয়ন ফিরে এসেই একদিন ছাদে চলে এল। হাবভাব বেশ কঠোর, কী রে? জয়েন্ট অ্যাকাউন্টের দরখাস্ত জমা দিয়েছিলি?
চয়ন দাদার রুদ্রমূর্তি দেখে ভয় খেয়ে গেল। বলল, টাকাটা অন্য কাজে লেগেছে।
অয়ন যেন ভূত দেখছে, এমন চোখে চেয়ে বলল, তার মানে?
আমি একটা মাস্টারির চাকরির জন্য দরখাস্ত করেছিলাম। ওরা টাকাটা চাইছে।
থম ধরে কিছুক্ষণ তার দিকে চেয়ে থেকে অয়ন বলল, মাস্টারির চাকরি না মামদোবাজি?
না না, আমি কৃষ্ণজীবনবাবুকে টাকাটা দিয়েছি।
কে কৃষ্ণজীবন?
আমি তার মেয়েকে পড়াই।
লোকটার ঠিকানা দে।
ঠিকানা! ঠিকানা দিয়ে কী হবে?
আমি খোঁজ নিয়ে দেখব তুই সত্যি কথা বলছিস কি না। যদি সত্যিও হয় তা হল লোকটার কাছ থেকে টাকা ফেরত নিতে হবে।
কেন?
দেখ, তোর চালাকি আমি বুঝতে পেরেছি। পাছে টাকাটা আমাকে দিতে হয় সেই ভয়ে তুই ওটা সরিয়েছিস।
চয়ন হঠাৎ সাহস করে বলল, কিন্তু টাকাটা তো আমার। আমি কি টাকাটা ইচ্ছেমতো খরচ করতে পারি না?
হঠাৎ অয়নের চোখ মুখের চেহারা পাল্টে গেল। খুনীর মতো ঠাণ্ডা গলায় বলল, তাই নাকি রে শুয়োরের বাচ্চা? দুধকলা দিয়ে এতকাল কালসাপ পুষেছি? টাকাটা তোর? আর তুই যে এতকাল বিনা ভাড়ায় এ বাড়িতে বসবাস করছিস! দে শুয়োরের বাচ্চা, বারো বছরের ভাড়া দে।
সে বউদির হাতে প্রতি মাসে আজকাল ঘরভাড়া বাবদ একশ টাকা করে দেয়, কিন্তু সে কথাটা বলতে তার সাহস হল না। সে চুপ করে রইল।
কিন্তু অয়ন চোঁচাতে লাগল, দে শালা, ভাড়া দে। বাপের জমিদারি পেয়েছিস? গায়ের জোরে থাকবি এখানে?
চয়ন একটাও কথা বলতে পারছিল না। এই গানগনে রাগে জল ঢালিবে কে? কোন কথায় কাজ হবে? বরং চুপ করে থাকাই ভাল। সে শুধু সম্মোহিতের মতো অয়নের দিকে চেয়েছিল।
আশপাশের ছাদে দু-চারজন লোক জড়ো হচ্ছিল মজা দেখতে। অয়ন লোকলজ্জার তোয়াক্কা না করেই চিৎকার করতে লাগল, যা আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা। আজই যাবি। দেখি কোন কৃষ্ণজীবন তোকে রাখে!
বউদি। এই সময়ে উঠে এসে অয়নকে একরকম টেনেই নিয়ে গেল নিচে। চয়ন অর্ধেক রান্না করেছিল। স্টোভ নিবিয়ে দিয়ে ঘর অন্ধকার করে শুয়ে রইল। রাতে আর কিছু খেল না।
পরদিন। অয়ন বেরিয়ে যাওয়ার পর বউদি। এল।
চয়ন, তুমি কাকে টাকা দিয়েছ বলো তো!
কি ভাল লোক?
ভীষণ ভাল বউদি। তিনি বিশ্ববিখ্যাত লোক।
তোমার দাদার ধারণা তুমি হয় ঠগবাজের পাল্লায় পড়েছ না হলে মিথ্যে কথা বলছি। কিন্তু আমি বলি, টাকাটা সরিয়ে ফেলে ভাল কাজই করেছ। তোমাকে তো বলেইছি, শেয়ার মার্কেটের নেশায় ও এখন পাগল।
বউদি, দাদাকে তুমি বুঝিয়ে বোলো, টাকাটা আমার সত্যিই দরকার ছিল। আজকাল মাস্টারির চাকরি পেতে নাকি টাকা দিতে হয়।
জানি তো। আমার পিসতুতো ভাই শিবনাথকেও টাকা দিতে হয়েছে। তোমার কি চাকরি হচ্ছে?
হওয়ার কথা।
চাকরি হলে খুব ভাল হবে চয়ন।
আরও দুদিন পর চয়ন ছাদ থেকে শুনতে পেল দাদা আর বউদিতে কথা কাটাকাটি হচ্ছে। বাউদি বলছিল, কেন ওর টাকা নেবে তুমি? বেচারা কত কষ্ট করে রোজগার করেছে, কেন সে টাকা তুমি শেয়ারে খাটাবে?
ও আমাকে অবিশ্বাস করে কোন সাহসে?
অবিশ্বাস আমিও করি। তুমি আমার বিয়ের হারটা বেচে শেয়ারে খাঁটিয়েছ। বলেছিলে দুটো হার দেবে। দিয়েছ? আমারটা গেছে যাক, ওরটা নেবে কেন?
ওরে ম্যাগী! খুব যে দরদী! বলি অন্য কিছু আছে নাকি?
শুনে চয়নের শরীর অবশ আর মাথা বিহ্বল হয়ে গেল। অয়ন কি সত্যিই পাগল হয়ে গেল?
দোতলায় ঝগড়াটা তুঙ্গে উঠল, আবার ঝাঁপ করে বন্ধ হয়ে গেল। এই বন্ধ হয়ে যাওয়াটাই অস্বাভাবিক। অয়ন বিউদির গলা টিপে ধরেনি তো!
আশঙ্কায় কাটা হয়ে যখন ব্যাপারটা দেখতে নিচে যাবে বলে উঠে দাঁড়িয়েছে চয়ন, ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে রড হাতে দৌড়ে ছাদে উঠে এল অয়ন। দিগ্বিদিগজ্ঞানশূন্য, রাগে অন্ধ, কাণ্ডজ্ঞানহীন।
জীবনে এত মার খায়নি চয়ন। অবিশ্বাস্য। এভাবে কেউ কাউকে মারতে পারে? এত জোরে? এত নিষ্ঠুরভাবে? পরম সৌভাগ্য তার যে, মারটা বেশিক্ষণ সহ্য করতে হয়নি তাকে, হাঁটুতে লাগতেই সে কাটা কলাগাছের মতো পড়ে গিয়ে ভূমিকার করছিল শুধু। যখন মাথায় লাগল। তখন পরম শান্তির মতো মূৰ্ছা এসে নোংরা নিষ্ঠুর পৃথিবীটাকে যবনিকায় ঢেকে দিল।
