হুঁ।
রাগ করবেন না। বেচারা হেমাঙ্গর ওপর রাগ করবেন না। কিন্তু। রাত তিনটের সময় পারঘাটে এসে বসে ছিলাম। তখন ভটভটি চালু হয়নি। একটা মেছো নৌকো ধরে ধামাখালি এসে ঝড়ের মতো গাড়ি ছেড়েছি। ঝড়ের মতো।
শুনে আমি মোটেই খুশি হচ্ছি না। একটা অ্যাকসিডেন্টের ধাক্কা এখনও সামলে ওঠেননি, এর ওপর যদি আর একটা হত?
তবু জিজ্ঞেস করলেন না কেন এমনভাবে চলে এলাম?
ঝুমকি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, জিজ্ঞেস করার কিছু নেই। জানি। কিন্তু খুশি হইনি। ধীরেসুস্থেই আসা যেত।
আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব? আমার কেন পুরনো হয়ে যাওয়াকে এত ভয়? কেবলই কেন মনে হয় আপনি একদিন পুরনো হয়ে যাবেন, আমিও যাবো। আমরা পুরনো হয়ে যাবো বলে এত ভয় পাই কেন?
ঝুমকি একটু হাসল, আমার নেকলেসটা আপনার কাছে রাখা আছে। খুলে দেখুন। কত পুরনো, তবু কী সুন্দর। যত পুরনো হবে তত দাম বাড়বে।
যেমন ভিডেন্টজ কার? ভিন্টেজ মন্দ?
ওসব উপমা আমার পছন্দ নয়।
আচ্ছা। কিন্তু আপনার কথাটা আমি বুঝেছি। আজ কি একবার দেখা হতে পারে?
পারে।
আমি যদি যাই কেউ কিছু মনে করবে না তো!
আমি করব। আপনাকে আজ আর গাড়ি চালাতে হবে না। একদিনের পক্ষে যথেষ্ট পাগলামি হয়েছে।
তাহলে?
আমিই যাবো।
মেয়েরা ভীষণ দেরি করে।
আমার দেরি হবে না।
ঝুমকি ফোন ছেড়ে দিল। অবিশ্বাসের চোখে কিছুক্ষণ ফোনটার দিকে চেয়ে থেকে খুব ধীরে ধীরে ফোন রাখল হেমাঙ্গ। সে দৌড়োয়নি, পরিশ্রমের কাজও করেনি কিছু, তবু কেন যেন তার হাঁফ ধরে যাচ্ছে আজ। তার মানে হচ্ছে, ঝুমকিকে তার একটা খুব জরুরি কথা বলার আছে। কিন্তু কথাটা সে কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না।
ফটিক কফি নিয়ে এল। তার দিকে ভূত-দেখা চোখে চেয়ে রইল হেমাঙ্গ। গরম কফিতে অসাবধানে বড় চুমুক দিয়ে জিব পোড়াল এবং বিষম খেল। তার মনে হচ্ছে যে একটা অর্থহীনতার স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। ড়ুবে যাচ্ছে। সে কিছুই বুঝতে পারছে না।
হাতঘড়িটার দিকে সন্দিহান চোখে চাইল সে। না, ঘড়িটা বন্ধ হয়ে যায়নি। তবে খুব ধীরে চলছে কি? বড্ড বেশি ধীরে?
সামনের বারান্দায় শীতের রোদ খেলা করছে। দুটো বেতের চেয়ার পাতা পাশাপাশি। এই বারান্দায় আজ থেকে চুল্লিশ বা পঞ্চাশ বছর পর এরকম এক সুকালে এক সাদা দাড়ি-চুলের বুড়োর পাশে একজন পুঙ্ককেশী বৃদ্ধা বসে থাকবে কি? হাঁটুর কাছে দাঁড়ানো নাতি বা নাতনী? সবচেয়ে বড় কথা তখনও কি পরস্পরের জন্য কম্পিত হবে হৃদয়? দুজনেই থাকবে? নাকি মাঝপথে খসে যাবে। একজন? কিংবা দুজনেই?
কে জানে! জীবন এত অনিশ্চিত বলেই না। এত ভাল। এই জীবনযাপন!
১১৯. ক্রাচে ভর দিয়ে
ক্রাচে ভর দিয়ে হাসপাতাল থেকে যখন বেরিয়ে এল চয়ন, তখন সকাল। দিন দশেক এক নোংরা হাসপাতালের বন্দীদশা থেকে মুক্তি। সব ক্ষত সারেনি। মাথায় ব্যান্ডেজ আছে, বাঁ পায়ে প্লাস্টার। শরীরে এখনও অন্তহীন ব্যথা। বাইরে সকালটা একটু মেঘলা, বিষণ্ণ। শীতের বৃষ্টি পড়ছে অশ্রুর মতো টপটপ করে। স্যাঁতানো হাওয়া।
বাইরে বেরোনোর আগে একটু দাঁড়াল চয়ন। কোথায় যাবে? যাওয়ার জায়গা তার একটাই। দাদার বাড়ির চিলেকোঠা। কিন্তু সেখানে যেতে আজ তার বড় লজ্জা করছে। অনিচ্ছে হচ্ছে। চেনা ঘরটা আজ যেন তেপান্তরের মতো দূর।
একটু খুঁড়িয়ে চয়ন হাসপাতালের বাইরে এসে দাঁড়াল। শীত করছে। ভিজে যাচ্ছে। কিন্তু এই চেনা কলকাতা আজ বড় অচেনা ঠেকছে তার। কোথায় যাবে?
তার মান-অপমানের বোধ তেমন নেই। শুধু আছে পশুর মতো মৃত্যু ও যন্ত্রণার ভয়। আছে বেঁচে থাকার অদ্ভুত সাধ।
একবার অনিন্দিতার কথা মনে হয়েছিল তার। কিন্তু না, এভাবে সে-বাড়িতে হাজির হওয়া যায় না। সেটা হবে ওদের ওপর নিজেকে চাপিয়ে দেওয়া। তাকে ফেলবে না ও। কিন্তু এই অবস্থায় তাকে দেখে চারুশীলার প্রবল প্রতিক্রিয়া হবে। খুব লজ্জা করবে চয়নের।
সে কি শেষ অবধি সম্পূর্ণ নিরাশ্রয় হয়ে গেল? সে বুঝতে পারছে না। দুর্বলতায় তার সারা শরীর থারথার করে কাঁপছে। অনভ্যাসের ক্রাচ তার বগলে ভীষণ ব্যথা দিচ্ছে। তবু ভাগ্যিস পাড়ার পল্টু তার মৃত জ্যাঠামশাইয়ের দুখানা ক্রাচ দয়া করে। পরশু দিয়ে গিয়েছিল তাকে। বলেছিল, এ দুটো তোমার লাগবে। বা হাঁটু তো গুঁড়িয়ে গেছে।
কত কি ভেঙেছে চয়নের তার হিসেব কে রাখে?
আরও একটু হাঁটল চয়ন। হাঁটতে হাঁটতে ভাবল, সেই চিলেকোঠার ঘরে তার সর্বস্ব রয়েছে। না গিয়েই বা সে করে কি?
একদিন হঠাৎ মোহিনীর পড়ার ঘরে কৃষ্ণজীবন হাজির হয়ে বললেন, চয়ন, গ্রাম তোমার কেমন লাগে?
কৃষ্ণজীবনের গ্রাম সম্পর্কে অবসেশন আছে, চয়ন জানে। সে ভাবল বোধ হয়। উনি নতুন একটা কিছু ভেবেছেন, তাই নিয়ে আলোচনা করতে চান। সে বলল, ভালই লাগে।
কৃষ্ণজীবনের পরের প্রশ্নটা অনেক বাস্তবঘেষা। বললেন, শুধু ভাল লাগলেই হবে না। গাঁয়ে গিয়ে থাকতে পারবে? চয়ন অবাক হল। একটু ভেবে বলল, বোধ হয় পারব।
মনে হয়। কলকাতার প্রতি কোনও বিশেষ আকর্ষণ নেই তো!
না। তবে আমি জন্মাবধি কলকাতায়।
একটু ভেবে দেখবে নাকি?
আমাকে কি গ্রামে যেতে হবে?
কৃষ্ণজীবন একটু হাসলেন। তারপর বললেন, আমার বাবা একটা প্রাইমারি স্কুলে পড়াতেন। তখন বেতন খুব সামান্য ছিল। এখন তা নেই। সেই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিতে আমি আছি। সেখানে একজন অঙ্ক আর ইংরেজি পড়ানোর লোক চাই। চাকরিটা তোমার হতে পারে। করবে? চয়ন একটুও না ভেবে বলল, করব।
