বাঁকা মিঞা এল আরও রাতের দিকে। একমুখ হাসি।
এলেন তাহলে? খবর সব শুনেছি।
কী শুনলে?
বিডন স্ট্রিটে গেয়েছিলাম গেল। হগুপ্তায়। মা ঠাকরোন সব বললেন।
হেমাঙ্গ লাজুক হাসল। মায়ের ওই দোষ। সব কিছু সবাইকে বলে দেয়।
বাঁকা মিঞা বলল, তা আমিও ঠোকরোনকে বললাম যে, পাত্রী খুব সরেস হয়েছে। আমরা দেখেছি কি না। একটু রোগার দিকে হলেও ভারি মিঠে চেহারাখানা। স্বভাবও ভাল। ঠাকরোন খুব খুশি।
বাসন্তী রুটি সেঁকেতে সেঁকতে গোল গাল চোখ করে শুনছিল। হঠাৎ বলল, সে-ই তো গো দাদাবাবু, না? উঃ, সে বড্ড ভাল। ইস আমার যে কী আনন্দটাই হচ্ছে!
হেমাঙ্গ মৃদু হেসে বলল, আনন্দের চোটে রুটি পুড়িয়ে ফেলিস না।
অনেক রাত অবধি এই শীতে পারঘাটে বসে রইল হেমাঙ্গ। এখানে খুব শীত আর হাওয়া। হেমাঙ্গ গ্রাহ্য করল না। এই শীত। মনের যন্ত্রণা নিয়ে বসে রইল চুপ করে। সামনের অন্ধকার উতরোল নদী। দামাল হাওয়া। একটু কুয়াশার মসলিনে ঢাকা আকাশ। এই বিপুল বিস্তারের সামনে একা, নির্জন, ছোট হয়ে বসে থেকে হেমাঙ্গ অনেক ভোবল। আকাশ-পাতাল। ভাবনার কোনও মাথামুণ্ডু নেই। পাগলামিতে ঠাসা। তার একটা জীবন শেষ হবে। শুরু হবে কি অন্যতর জীবন? কেমন হবে সেটা? একজনের সঙ্গে জোড় বাধা এমন কি ঘটনা একটা? তবু তার মন ভাল নেই।
উত্তাল বাতাস এসে তার সব এলোমেলো করে দিতে চায় যেন, এই বিপুল বিস্তার আর ওই অন্ধকার থেকে আসে প্ররোচনা; পালাও। কেন বাধা পড়বে সংসারে?
পালিয়েই এসেছে হেমাঙ্গ। ঝুমকিকে কিছুই জানায়নি। কাল শনিবার। ঝুমকি তার বাড়িতে এসে তাকে না-পেয়ে অবাক হবে খুব। বিরক্ত হবে? উদ্বিগ্নও কি? হোক। একটু হোক। হেমাঙ্গ কেন এত দায়ভার নেবে? সে কি মুক্ত মানুষ নয় একজন?
অনেক রাতে ঘরে ফিরে ঘুমালো হেমাঙ্গ। বেলায় উঠল। উঠেই মনে হল, ঝুমকি তার বাড়িতে এসে গেছে কি এতক্ষণে? কেমন হয়েছে তার মুখখানা হতাশায়?
বাসন্তী চা করে দিল, কীগো দাদাবাবু, আমন শুকনো মুখে কী ভাবিছ?
একটা মাথা নেড়ে হেমাঙ্গ বলল, কিছু না।
শরীর খারাপ নয় তো!
হেমাঙ্গ একটু হাসল। বলল, আচ্ছা বাসন্তী, আমি কি একটু পাগল?
বুহি হি করে হেসে ফেলে বলে, তোমার মাথায় পোকা আছে।
তাই?
হ্যাঁ। পোকা না থাকলে কেউ নিশিপুরে এসে পড়ে থাকে? বাকাঁচাচা বলে, তুমি নাকি মস্ত মানুষ। মেলা লেখাপড়া জানো, মেলা টাকা।
দুপুরের দিকে ঝুমকি যখন বাড়ি ফিরে এল তখন তার শুকনো মুখ দেখে অপর্ণা বলল, কী হয়েছে রে? ঝগড়া করেছিস নাকি হেমাঙ্গর সঙ্গে?
ঝুমকি অবাক হয়ে বলল, ঝগড়া করবার জন্য তাকে পাওয়া গেলে তো! কাল অফিস থেকে বেলা বারোটায় বেরিয়ে গেছে, আজও ফেরেনি। কাউকে কিছু বলেও যায়নি। ফটিকদা বলছে, ঠিক নিশিপুরে গেছে।
বড্ড পাগল। কী যে করি ওকে নিয়ে! ওর ঘাড় থেকে নিশিপুরের ভূত নামানো দরকার।
ঝুমকি মাথা নেড়ে বলল, না মা। ওটা ঠিক হবে না। যদি নিশিপুরে গিয়ে থাকে তো ভালই হয়েছে। হয়তো নিজের সঙ্গে একটা বোঝাঁপড়া করতে গেছে। ওর ওটা দরকার ছিল।
অপর্ণা সামান্য উদ্বেগের গলায় বলল, হ্যাঁ রে, শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যাবে না তো। রশ্মির বেলায় যেমন করেছিল?
ঝুমকি মাথা নেড়ে বলল, জানি না মা। তবে এ ব্যাপারে ওকে কিছু বোলো না তোমরা।
অপর্ণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ঝুমকির কোনও দীর্ঘশ্বাস নেই। একটু উদ্বেগ আছে মাত্র। হেমাঙ্গ যদি নিশিপুরে গিয়ে থাকে তাহলে চিন্তার কিছু নেই। আর কিছু না হলেই হল। তার শুধু ধৈৰ্য ধরে থাকা।
দুপুরের খাওয়ার পর সে চারুশীলার কাছে গেল।
মাসি, কেমন আছ?
চারুশীলা খুশি হয়ে বলল, আয় আয়। কতদিন আসিসনি। আজকাল খুব গর্চায় যাচ্ছিাস, শুনছি।
লজ্জা পেয়ে ঝুমকি বলল, যাই মাঝে মাঝে।
যাস। ও যা পাগল, ঠিকমতো না বাধলে পরে ওকে নিয়ে মুশকিলে পড়বি। হ্যাঁ রে, কেমন বাসিস ওকে? খুব?
তা জানি না।
খুব জানিস।
শোনো, ও আবার কাউকে কিছু না বলে কোথায় চলে গেছে।
সর্বনাশ।
না না, অত ঘাবড়ে যেও না। কদিন খুব নিশিপুরের কথা বলছিল। বোধ হয়। সেখানেই গেছে। কাউকে পাঠাতে পারো নিশিপুরে? বড্ড চিন্তা হচ্ছে।
একটু ভাবল চারুশীলা। তারপর বলল, কাউকে পাঠালে আবার তার ফিরে আসার অপেক্ষায় বসে থাকতে হবে। তার চেয়ে একটা কাজ করি চল। আমরাই চলে যাই।
যদি রাগ করে?
পাগল! ওখানে গিয়ে হাঁ করে তোর কথাই তো ভাবছে। গেলে খুশি হবে দেখিস।
না চারুমাসি। থাক, ওকে একটু একাই থাকতে দাও বরং।
চয়নকে পাঠাতে পারি। কিন্তু সে তো কালকের আগে হবে না।
বুকের উদ্বেগ নিয়ে ভেবে ঝুমকি বলল, তাও থাক মাসি। পাঠাতে হবে না। আর একটা দিন যাক।
একটা দিন যে কী করে গেল তা ঝুমকি বোঝাতে পারবে না। কাউকে। অনেক রাত অবধি তার বালিশ ভিজল চোখের জলে। বুকে অনেক ঢেউ উঠল অনিশ্চয়তার। মায়ায় ভেসে গেল বুক। এ কোন সৃষ্টিছাড়ার সঙ্গে জুটল সে?
শেষরাতে একটু ঘুমালো ঝুমকি। তাও বারবার ছিঁড়ে গেল তন্দ্ৰা। বুকের মধ্যে উদ্বেগের ড়ুগড়ুগি।
এল সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ। তখনও ঝুমকির ঘুম ভাল করে ভাঙেনি। কিন্তু একটা প্রত্যাশা আর উদ্বেগ ছিল বলেই টেলিফোন বাজতেই সে উঠে গিয়ে ধরল।
হেমাঙ্গর গলাটা কি সামান্য কাঁপছে? বলল, কাল সারা রাত ঘুমোইনি। জানেন? কাল সারাটা দিন নিশিপুরে সময়টা যেন কিছুতেই কাটছিল না। কাল ছিল আমার জীবনের মন্থরতম দিন, অর্থহীন, রংহীন… কী বলব আপনাকে, বেশি বললে কাব্য হয়ে যাবে।
