তাকে দেখেই আজ হঠাৎ খুব লজ্জা পেয়ে হেমাঙ্গ বলল, আমার মা আপনার জন্য একটা জিনিস পাঠিয়ে দিয়েছেন।
ঝুমকি অবাক হয়ে বলে, তাই নাকি?
এতে কিন্তু আমার কোনও ভূমিকা নেই। আপনি কিন্তু কিছু মনে করতে পারবেন না।
হেমাঙ্গ ড্রয়ার থেকে একটা চ্যাপটা গয়নার বাক্স বের করে ঝুমকির হাতে দিয়ে বলল, এইটে।
ঝুমকি বাক্সটা খুলে অবাক হয়ে গেল। একটা সাবেক ভারী নেকলেস। লকেটে হিরের সেটিং। অন্তত বারো-চোদ্দ ভরি ওজন।
কিছু মনে করলেন না তো!
ঝুমকি জবাব দিল না। নেকলেসটা গলায় পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটু দেখল নিজেকে। তারপর হঠাৎ হেমাঙ্গর দিকে ফিরে বলল, কেমন দেখাচ্ছে?
হেমাঙ্গ সলজ্জ চেখে চেয়ে দেখে চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল, এসব কি আধুনিক মেয়েরা পরে?
আমি জিজ্ঞেস করেছি কেমন দেখাচ্ছে।
ভালই তো!
ঝুমকি ফের আয়নায় নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল একটু। এমন স্বাভাবিক হাবভাব যেন নেকলেস পেয়ে সে একটুও অবাক হয়নি। হেমাঙ্গর দিকে ফিরে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, একটু পরে থাকি নেকলেসটা?
হ্যাঁ। কিন্তু ওসব জিনিস পরে রাস্তাঘাটে চলাফেরা না করাই ভাল। ছিনতাইবাজরা পিছু নেবে।
নিক না। আজ আমি এটা পরেই বাড়ি যাবো।
হেমাঙ্গ সাভয়ে বলল, সর্বনাশ!
যাবোই।
হেমাঙ্গ বলল, তাহলে আমি গাড়ি করে পৌঁছে দিয়ে আসব।
গাড়ি চালানো এখনও বারণ, খেয়াল আছে?
বারণ ছিল, এখন আর নেই। ডাক্তার কাল বলেছে এখন একটু-আধটু চালাতে পারি।
তার দরকার নেই। নেকলেসটা এখন এখানেই থাকবে।
হেমাঙ্গ নিজের নখ দেখছিল। খুব সলাজ ভাব। হঠাৎ মিনমিন করে বলল, আচ্ছা নর-নারীর সম্পর্কের মধ্যে গুরুজনদের এই যে ঢুকে পড়া এটা আপনার কেমন লাগে?
কে, আমার তো বেশ ভালই লাগে। এরকমই হওয়া উচিত।
আপনি কিন্তু বেশ সেকেলে আছেন।
সেকেলেদের কি অপছন্দ নাকি?
না না, তা বলছি না। বলছি, নরনারীর সম্পর্ককে তো আজকাল তাদের একান্তই নিজস্ব ব্যাপার বলে ভাবা হচ্ছে পৃথিবীতে। এর মধ্যে আত্মীয় বা গুরুজনদের কোনও ভূমিকা থাকার কথা নয়। সেটাকে ইন্টারফিয়ারেন্স বলে মনে করা হচ্ছে। তাই না?
আমার তা মনে হয় না। আপনার বুঝি মনে হয়?
হেমাঙ্গ খুব লজ্জিত হয়ে পড়ল। তারপর আরও মিনমিনে গলায় বলল, আসলে আমি একুশ শতকের জীবনযাত্রার প্যাটার্নটার কথা ভাবছি। কি কি থাকবে, আর কি কি থাকবে না। পৃথিবী তো আস্তে আস্তে লজ্জাহীন হয়ে যাচ্ছে। সুইডেনে এমন সব দৃশ্য দেখেছি যে আমার একসময়ে নরনারী সম্পর্ক নিয়েই একটা রিপালশন তৈরি হয়েছিল।
একটু কড়া গলায় ঝুমকি বলল, সুইডেনে আর কখনও যাবেন না।
হেমাঙ্গ একটু ভড়কে গিয়ে বলল, আমি মোটেই যেতে চাইছি না। কিন্তু বলছি রোমান্স জিনিসটা তো পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে লোপাট হয়ে যাচ্ছে। দেখুন না, এখন বাঙালি ছেলেমেয়েরাও কত ফিলি মেলামেলা করে। তাদের মধ্যে সেই রোমান্টিক ভীতু-ভীতু ভাবটা আর নেই। দে টক ফ্রিলি অ্যাবাউট এভরিথিং…। অল সর্টস অফ সেক্রেট থিংস।
ঝুমকি একটু হাসল। বলল, আমি কিন্তু সেকেলে।
এ কথায় কে জানে কেন, আর এক দফা লজ্জা পেল হেমাঙ্গ।
হেমাঙ্গ এর পরের তিন দিন ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়ল আর একটা সমস্যা। সমস্যাটা হল রোমান্টিক প্ৰেমটা বিয়ের পরই উবে যায়। আর রহস্য-রোমাঞ্চ থাকে না, প্রেমিক-প্রেমিকরা হয়ে যায় সাদামাটা স্বামী-স্ত্রী এবং তখন সহ রহস্যের সমাপ্তি। একটু ফাঁক, একটু দূরত্ব, একটু পিপাসা না থাকলে এই রহস্যময়তা টিকবে কি করে? এমন কোন উপায় আছে যাতে স্বামী এবং স্ত্রী হয়েও নারী-পুরুষ পরস্পরের কাছে প্রেমিক-প্রেমিকার মতো ভীষণ আকর্ষক থেকে যেতে পারে? এ বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্তে উপস্থিত হতে পারল না সে এবং ক্রমশ অস্থির হল।
সমস্যাটা অতঃপর টেলিফোনেই সে নিবেদন করল ঝুমকিকে। রাত দশটায়।
ঝুমকি বোধ হয় একটা হাই চাপাবার চেষ্টা করে বলল, আচ্ছা এ ব্যাপারটা ভেবে দেখব।
সুত্যি ভাববেন?
হুঁ।
এটা আপনার কাছেও কি প্রবলেম বলে মনে হয়?
এখন হচ্ছে।
মুগ্ধ আর একটা কথা।
কী?
আমি দুদিন ধরে গাড়ি চালিয়ে অফিসে যাচ্ছি।
সাবধান কিন্তু। অনেক দিন অভ্যোস নেই।
না, কোনও অসুবিধে হচ্ছে না। বলছিলাম, আগামী কাল অফিসের পর কি আপনাকে পিক-আপ করতে পারি?
পারেন।
তাহলে ছটায়? গোলপার্ক ন নম্বর টার্মিনাসে।
তা কেন? বাড়িতে এলেই তো হয়।
একটু লজ্জা করছে।
কিছু লজ্জার নেই। কাল কী রঙের শাড়ি পরতে হবে?
নীল। কিংবা আপনার যা ইচ্ছে।
না, নীলই পরব।
তাহলে ছটায়?
হ্যাঁ। কিন্তু বাড়িতে আসবেন। মা বোধ হয় কাল আপনার জন্য কোনও খাবার তৈরি করবে।
আরে! উনি কি জানেন যে আমি ফোন করছি?
হ্যাঁ। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।
ছিঃ ছিঃ। লজ্জা করছে। আমি কি খুব বেহায়া?
মোটেই নয়। শুধু একটু রোমান্টিক।
যন্ত্রণাটা। তবু হেমাঙ্গকে ছাড়ছে না। ফোন করার পর সে রাতে অনেকক্ষণ জেগে রইল। জীবনের এই একটা সময় কেটে যাবে। শেষ হবে বুকের দুরুদুরু। তারপর শুরু হবে পুরনো হওয়া। বহু বহু পুরনো, ব্যবহৃত, জীর্ণ হয়ে যাওয়া। এর কি কোনও মানে আছে?
শুক্রবার বিনা নোটিসে অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে হেমাঙ্গ চলে এল নিশিপুর। যেন হাজার বছর পর।
বাসন্তী খবর পেয়ে দৌড়ে এল, ওম্মা গো! দাদাবাবু যে!
আহ্লাদে সে আটখানা। ঘরদের সাফ করাই ছিল। তবু আবার ঝোঁটিয়ে, মুছে, বিছানা পাততে পাততে বকবক করতে লাগল মেলা। বলল, এবার এমন কামাই দিলে ভাবলাম বুঝি, দাদাবাবুর নিশিপুরের শখ মিটে গেছে। আর বুঝি এমুখো হবে না।
