ঝুমকি খুব সিরিয়াস মুখ করে বলল, কেন থাকবে না?
সামান্য উত্তেজিত হেমাঙ্গ বলে, কী করে থাকবে? ভারতবর্ষের এক কোণে বাস করে কি পৃথিবীর ট্রেন্ড বোঝা যায়?
ঝুমকি বলল, কেন যাবে না? আমরা বুঝি পৃথিবীর খবর রাখি মা?
তাহলে কী করে বলছেন যে, এসব থাকবে?
থাকবে, কারণ মানুষ বারবার তার জীবনে একটা রিনিউয়াল ঘটায়। অনেক প্রথা অভ্যাস ভেঙে ফেলে। কিন্তু আবার সেগুলোকেই আঁকড়ে ধরে।
হেমাঙ্গ যেন চিন্তিতভাবে ঝুমকির মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলে, আপনি কি প্রগতি পছন্দ করেন?
প্ৰগতি একটা ভোগ টার্ম। স্পেসিফিকালি বলুন, প্ৰগতি বলতে কোনটা!
চিন্তিত হেমাঙ্গ বলে, আমিও কি ছাই জানি! এই যা সব হচ্ছে আর কি।
অনেক কিছু নতুন হচ্ছে, আবার পুরনোও থেকে যাচ্ছে তো। শুধু আমেরিকাই তো নেই, পৃথিবীতে ভারতবর্ষও তো আছে।
হেমাঙ্গর ভাঙা শরীর জোড়া লেগেছে। বাঁ পায়ে সামান্য একটু খোঁড়ানো ছাড়া আর কোনও দৃশ্যমান ক্ৰটি নেই। বী হাত কিছু কমজোরি। ফিজিও থেরাপি চলছে। আশা করা হচ্ছে মাসখানেকের মধ্যেই সে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে যাবে। ঝুমকি গত দু মাস ধরে রোজ বিকেলের দিকে আসত, সঙ্গে মাকে নিয়ে। কখনও কখনও একাও। গত সাতদিন হেমাঙ্গ অফিস করছে বলে আসা কমিয়েছে। শনি আর রবিবার সকালের দিকে আসে। দুপুরে চলে যায়। এখনও তাদের মধ্যে আপনি সম্বোধন রয়ে গেছে। দৃশ্যত দুজনে পরস্পরের দিকে এক চুলও এগোয়নি।
ঝুমকি এক কাপ দুধে কফি গুলে এগিয়ে দিল হেমাঙ্গকে। হেমাঙ্গ কফিটায় একটা চুমুক দিয়ে বলল, ভারতবর্ষ কি পাল্টে যাচ্ছে না? ব্রিটিশ আর আমেরিকান কালচার বরাবর ভারতবর্ষকে দূর থেকে রিমোট কন্ট্রোল করে।
আপনি তো নিশিপুরে গিয়ে মাঝে মাঝে থাকেন। সেখানে কী দেখতে পান বলুন তো?
ওঃ, গ্রামের কথা আলাদা। সেখানে অন্যরকম।
গ্রামই তো ধরে রাখে।
সবেগে মাথা নাড়ে হেমাঙ্গ, গ্রাম দুর্বল। দেশের কালচারে তার প্রভাব খুব কম।
আচ্ছা, আজ আমরা এসব নিয়ে আলোচনা করছি কেন?
হেমাঙ্গ একটু হেসে বলল, আমারই দোষ। কাল রাতে কী হল জানেন। একটা ক্যাসেট চালিয়ে গভীর রাতে মাইকেল জ্যাকসনের রক শুনছিলাম। শোনা এবং দেখা। দেখতে দেখতে মনে হল, এ লোকটা মূর্তিমান অ্যান্টি-কালচার, অ্যান্টিএসথেটিকস, অ্যান্টি-মিউজিক। কী অশ্লীল সব জেসচার। এর জন্য দুনিয়া এত পাগল কেন? এ লোকটা সারা পৃথিবীর কালচারে পচন ধরিয়ে দিচ্ছে না কি? তার পর থেকেই মাথাটা এক লাইনে ভাবতে শুরু করে দিল।
মাইকেল জ্যাকসনেরও হয়তো কিছু গুণ আছে; আমরা তত বুঝি না বলে রস পাই না। কিছু না থাকলে লোকটা কি এত পপুলার হত?
অসহায়ভাবে হেমাঙ্গ ঠোঁট উল্টে বলে, কে জানে! আপনি ওর গান শুনেছেন এবং দেখেছেন কি?
হ্যাঁ। তবে আপনার মতো রেগে যাইনি।
ঝুমকি মুখ টিপে হাসল এবং হেমাঙ্গ অপ্রতিভ বোধ করতে লাগল।
এক একদিন তাদের এক এক বিষয় নিয়ে কথা হয়। যেমন পরের রবিবার বাঁ পায়ের স্বাভাবিকতা যখন অনেকটাই এসে গেছে তখন ঘরের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করতে করতে হেমাঙ্গ বলল, আচ্ছা ঝুমকি নিশিপুর কেমন লাগে আপনার?
ঝুমকি বড় বড় চোখ করে বলল, নিশিপুর! কেন, বেশ তো জায়গাটা।
না, না, ওরকম দায়সারাভাবে বলবেন না। আমি জানতে চাই নিশিপুর একটা রোমান্টিক জায়গা কি না।
ঝুমকি একটু ভেবে বলল, হু। রোমান্টিকই তো। কিন্তু মতলবটা কী? নিশিপুর যাওয়ার ইচ্ছে নাকি?
কতদিন যাইনি বলুন তো!
আগে হাড্রেড পারসেন্ট সেরে উঠুন। তারপর যাবেন।
না, আমার তাড়া নেই। আমার শুধু মনে হয়, নিশিপুরে নদীর ধারে আমার ঘরখানা হা-পিত্যেশ করে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
ঝুমকি একটু হাসল। বলল, নিশিপুর তো আর কেউ কেড়ে নিচ্ছে না।
কতুর চোখে ঝুমকির দিকে তাকিয়ে হেমাঙ্গ বলল, নিশিপুরের বাড়িটার জন্য আমার বড় মায়া। বুঝলেন!
জানি তো!
আমি ওখানে মাঝে মাঝে পালিয়ে যাই বলে সবাই আমাকে বকে। আমার মার তো ধারণা আমি সাধু হওয়ার তালে আছি। আমার পার্টনাররা বলে, আমাকে নাকি নিশি-তে পেয়েছে। চারুদি তো সবসময়ে যাচ্ছেতাই বলছে। অথচ দেখুন, নিশিপুর একটা মুক্তি, একটা ছুটি। আমার যে কী ভীষণ ভাল লাগে!
একটু বিবশ হয়ে গেল ঝুমকি। আবেগতাড়িত, ছেলেমানুষ এই লোকটিকে কি এইজন্যই তার এত ভাল লাগে? মানুষটির ভিতরে একটা গভীর ব্যাপার আছে, মুগ্ধতা আছে। টাকা, কেরিয়ার, সাফল্য একে এখনও ছিবড়ে করে ফেলেনি।
ঝুমকি সামান্য নরম করে বলল, কয়েকটা নতুন ধরনের ফুলের গাছ লাগাতে হবে। গেট-এর ওপর একটা লতা। আর একটা তুলসীমঞ্চ।
হেমাঙ্গ অবাক হয়ে বলে, কিছু বললেন?
ঝুমকি হেসে ফেলল, বলছিই তো! আপনি শুনলেন না?
নিশিপুরের বাড়ির কথা?
হ্যাঁ। সাজিয়ে নিলে আরও সুন্দর হবে। মাটিটা তো খুব ভাল, কেন যে ভাল ভাল গাছ লাগাননি!
হেমাঙ্গর চোখমুখ আলো হয়ে গেল। আবেগকম্পিত গলায় বলল, উঃ, একটা ভীষণ দুশ্চিন্তা হচ্ছিল।
কিসের দুশ্চিন্তা?
চারুদি বলছিল, আপনি নাকি নিশিপুর পছন্দ করেন না।
চারুমাসি নিজেই করে না, তাই বলেছে।
আবার এক শনিবার দুজনের দেখা হল হেমাঙ্গর বাড়িতেই। হেমাঙ্গ অনেকটাই সেরে উঠেছে। বাঁ পায়ের খোঁড়ানিটা একদম নেই। মন দিয়ে একসারসাইজ করে সে। গরম-ঠাণ্ডা কমপ্রেস নিচ্ছে। মালিশ করতে বিশেষজ্ঞ আসছে। শনিবার যখন ঝুমকি এল ম্যাসিওর লোকটি তখন বিদায় নিচ্ছে। ঝুমকিকে বলল, আর দিন পনেরো ম্যাসাজ করলেই হবে। অলমোস্ট নরম্যাল।
