এ কথাটার জবাব দিল না বীণাপাণি। জবাবের দরকারও নেই। মেয়েরা একা হলে খাওয়াদাওয়ার ঠিক থাকে না। নিজের জন্য কে আর কষ্ট করে, এরকম একখানা ভাব নিয়ে হয়তো একবেলা রান্নাই চড়াল না। খিদে পেলে চা খেয়ে খিদে মেরে দিল।
ঠাকুরের আসনের দিকে চেয়ে দেখছিল নিমাই। মেলা পট আর ছবি গাদাগাদি করে রাখা। সামনে ফুল, বাতাসা, জল, নিবে-যাওয়া ধূপকাঠির দানি।
পুজোআচ্চা করো বুঝি আজকাল?
ও আমার পুতুলখেলা।
নিমাই একটু হাসল। চারদিকে চেয়ে দেখে বলল, মেঝেটা এর মধ্যেই ফেটেফুটে গেছে দেখছি।
হ্যাঁ। গাঁথনি তো তেমন নয়। ইট পেতে সিমেন্টের পলেস্তারা দিয়েছিলাম। ও কি টেকে?
ঠাণ্ডা জল আছে?
এ কথায় বীণা একটু শিউরে উঠল যেন। চাপা গলায় বলল, এ মা! ছিঃ ছিঃ! তোমাকে জলই দিইনি।
বলেই আবার থমকাল, আমার হাতে খাবে তো জল?
কেন, দোষ হবে নাকি?
হবে না! আমি তো নষ্ট মেয়ে।
নিমাই কিছু বলল না। বুকটা ব্যথিয়ে আছে। বীণা একটানা স্টিলের পরিষ্কার গেলাসে মাটির কলসি থেকে জল গড়িয়ে দিল।
জলটা খেয়ে নিমাই বলল, ডান হাতের আংটিটা কোথায়?
নতমুখী বীণা একটু চুপ করে থেকে, খুব চাপা গলায় বলল, গত মাসে বেচিতে হয়েছে।
নিমাই থম ধরে রইল। বিয়ের সময় তারা অনেক কষ্ট করে ওই আংটিটাই নতুন বউকে দিতে পেরেছিল আশীৰ্বাদ হিসেবে। অল্প সোনার পলকা আংটি। বীণা যখন জল দিত, ভাত দিত। তখন বরাবর নজরে পড়েছে নিমাইয়ের।
চা করবো?
নিমাই একটু ভেবে বলল, করতে পারো। তবে শুধু এক কাপ। আমি খাবো। তুমি খাবে না।
বীণা একটু হাসল। বলল, তাই হবে। কিন্তু চা-পাতা ভাল নয়। তোমার ভাল লাগবে না। সস্তা চা তো।
আমার কি বাছাবাছি আছে? নেশাও নেই। তবু করো একটু।
বীণা চায়ের সঙ্গে দুখানা বিকুটিও দিতে পারল না। কোনওদিন বিস্কুট ছাড়া চা দেয়নি। আজ ভিতরে ভিতরেও বীণাপাণি ক্ষয়ে গেছে। অহংকারটুকু কি আছে এখনও? সেটাই ধরতে পারছে না। নিমাই। পোড়া কপালের কথা হল, তার নিজের চোখটাই আজ বড় ঝাঁপসা। বড় কষ্ট হচ্ছে বীণার জন্য। এ তার বউ ছিল বটে, কিন্তু আজ যেন মাঝখানে গহীন সমুদ্দুর।
চা করার সময়টুকু একটু ফাঁক পেল নিমাই। কী বলার আছে বীণাকে তার? কিছুদিনের সম্পর্কহীনতায় তারা কি পরস্পরের কাছে পর হয়ে গেছে। আড় ভাঙছেনা। লজ্জা-লজ্জা করছে। কথা আসছে না।
কমদামী চা-পাতা দিয়ে খুব যত্নে চা করে আনল বীণা।নিমাই বসে বসে চা খেল। খারাপ লাগল না। চা শেষ করে বলল, একটা কথা বলতে আসা।
বলো।
সজলবাবু একটা দল খুলতে চান। টাকার জন্য ঘোরাঘুরি করছেন। তোমার মত আছে বলে বলছেন। এমন কথাও বলছেন যে, আমাকে সেই যাত্ৰাদলের অর্ধেক হিস্যাদার করে দেবেন।
সভয়ে বীণাপাণি বললে, মা গো! এত মিথ্যে কথাও বলতে পারে মানুষ!
উনি যে সত্যি কথা বিশেষ বলেন না তা বুঝতে পারছি। সেইজন্যই তোমার কাছে যাচাই করে গেলাম।
আর কী বলেছে?
ওইসব পুরনো কথাই।
ও বোধ হয় আমার নামে তোমার কাছে দুর্নােমও করে, তাই না?
না তো! সজলবাবু তোমার খুব প্রশংসাই করেন।
ওর কোন কথাই বিশ্বাস কোরো না। কিছু করার জন্য এত মারিয়া হয়ে উঠেছে যে ওর বুদ্ধি লোপ পেয়েছে।
ও কি তোমার কাছে আসে?
না, আমি ওকে আর বিশ্বাস করি না। আসতে বারণ করে দিয়েছি।
মানুষটা খারাপ নন। তবে অভাবে স্বভাব নষ্ট।
ওকে টাকা পয়সা দিও না। নষ্ট করবে।
বড্ড নাছোড়বান্দা হয়ে লেগে আছেন পেছনে। কী যে করি। চক্ষুলজ্জা বলেও তো কথা আছে।
চক্ষুলজ্জা! বলে বীণাপাণি রাগের গলায় বলল, চক্ষুলজ্জায় পড়ে একটা জোচ্চোরকে টাকা দেবে! এসব কী কথা!
নিমাই খুব সংকোচের সঙ্গে বলল, আমি বড় দুর্বল মানুষ বীণা। লোক বিপদে পড়ে এলে আমার নিজের অতীতের কথা মনে হয়। ভাবি, কিছু সাহায্য করলে হয়তো এ লোকটা দাঁড়িয়ে যাবে।
বীণা তার দিকে একটু রুষ্ট চোখে চেয়ে বলল, দয়াদাক্ষিণ অনেক দেখাতে পারবে। কিন্তু তার জন্য সজল কেন?
নিমাই বীণার চোখে চোখ রাখল। অনেকক্ষণ। তারপর বলল, আমাকে পাহারা দেবে কে বীণা?
বীণা মাথা নত করল। ফের জানালার কাছে গিয়ে বাইরে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আজ তোমার রান্নার জোগাড় তো কিছু দেখছি না!
ক্ষীণ কণ্ঠে বীণা বলল, এখনও তো বেলা হয়নি। মোটে দশটা বাজে। আরও পরে রান্না চড়াই।
আজি কী রাঁধবে?
কেন, তুমি খাবে?
খেলে?
রাঁধব। যা চাও রাঁধব।
নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হঠাৎ বলল, দোকানপাটে ধারদেনা কত আছে?
বীণা একটু চুপ করে থেকে ক্ষীণ কষ্ঠে বলল, আছে কিছু। শ পাঁচেক হবে বোধ হয়। কেন?
এভাবে চলবে না।
না চললে উপায় হবে।
কী উপায়?
সে আছে।
মারার কথা ভাবিছ নাকি? ভাবলে? বলে জানালার কাছ থেকে ফিরে তাকাল বীণা ।
নিমাই বীণার দিকে চেয়ে থেকে বলল, চেহারাটা তো নষ্ট করেছই, রঙটাও কত কালো হয়ে গেছে। এসব যাওয়ার জন্যই। সব যাবে। নিমাই দুধারে মাথা নেড়ে বলল, তা হয় না।
ঘণ্টা দুই বাদে পাড়াপড়শিরা দেখল একটা সুটকেস আর গোটানো বিছানা পায়ের কাছে রেখে রিক্সায় পাশাপাশি বসে নিমাই আর বীণাপাণি বাস-রাস্তার দিকে যাচ্ছে। ঠিক যেমন গাঁ-গঞ্জের নতুন বিয়ের বর-বউ বিয়ের পর বরের বাড়ি আসে। নটী বীণাপাণির মুখে যে কে নতুন কনের মতো লজ্জা মাখিয়ে দিয়েছে কে জানে!
১১৮. একবিংশ শতকে কেমন হবে নর-নারীর সম্পর্ক
আপনি কি ভেবে দেখেছেন যে, এইসব প্ৰেম-টেম এবং বিয়ে-টিয়ে আর কতদিন সমাজপতিরা টিকিয়ে রাখতে পারবেন! একবিংশ শতকে কেমন হবে নর-নারীর সম্পর্ক? দাম্পত্য জীবন বলে কিছু থাকবে? থাকবে লাইফ-লং পার্টনারশিপ?
