পিন্টুর বয়স এখন সাত আট হবে। আজিও ওর প্রতি হেমাঙ্গর এক প্রগাঢ় মায়া। আর পিন্টুও বড্ড ভালবাসে হেমু মুক্ত। পিটুর কথায় বরাবর হেমাঙ্গ দুর্বল। ফোনে পিন্টুর গলা পাওয়া গেল, মামা, আমি কাল তোমার সঙ্গে যাবো কিন্তু।
যাবে। কিন্তু তোমার মা যে একটি বিছু তা কি তুমি জানো?
হ্যাঁ। তোমার সজোগ রোজ ঝগড়া করে।
আমি ভাল লোক হওয়া সত্ত্বেও করে। এসব দেখে রাখে। বড় হয়ে একদিন বিচার কোরো। কেমন?
পিন্টু বুঝল না, তবু বলল, আচ্ছা।
ফোনটা রেখে দিয়ে হেমাঙ্গ ভি সি আর বন্ধ করল। ছবিটা আর দেখতে ইচ্ছে করল না। আগামী কাল তার দুদুটো এনগেজমেন্ট আছে। খুব গুরুতর কিছু নয়। একটা পার্টি, আর তার আগে একজন অসুস্থ ক্লায়েন্টকে নার্সিং হোম-এ দেখতে যাওয়া। দুটোই কাটিয়ে দেওয়া যাবে।
মায়া জিনিসটা যে কী ভয়ংকর তা ঘুমোনোর আগে অনেকক্ষণ ভাবল হেমাঙ্গ। একথা নিশ্চিত যে সে বিয়ে করবে না। কিন্তু তার খুব ইচ্ছে হয়, পিন্টুর মতো নিষ্পাপ ও দেবদুর্লভ সৌন্দর্যের একটি ছেলে তার হোক। সে একবার চারুশীলাকে বলেছিল, পিন্টুকে দত্তক দিবি?
ইল্লি! দত্তক নিয়ে পাকাঁপাকি ব্যাচেলর থাকার ইচ্ছে? খুব তো স্বার্থপর দেখছি। বিয়ে করে নিজের ছেলের বাপ হ গে যা। পরের ছেলে নিয়ে টানাটানি কেন রে অলম্বুস?
অলম্বুস শব্দের মানে হেমাঙ্গ জানে না। জানার দরকারও নেই। হয়তো। ওটার কোনও মানে নেইও। চারুশীলার নিজস্ব ডিকশনারি আছে, তাতে এরকম বিস্তর শব্দ থাকে এবং যেগুলোর কোনও মানেই হয় না।
কিন্তু মায়া জিনিসটা ভাল নয়। একদম ভাল নয়। মায়াও একধরনের পরাধীনতা, এক ধরনের স্বাধীনতার অভাব, মুক্তির প্রতিবন্ধক। বাচ্চাদের সে খুব ভালবাসে। এই ভালবাসাটা কি একদিন তার কাল হবে?
পরদিন অফিসের পর হেমাঙ্গ যখন গাড়ি নিয়ে চারুশীলার বাড়িতে হাজির হল তখন আরও একটা মায়া তার জন্য অপেক্ষা করছিল। সে হল ওই প্ৰাইভেট টিউটরটি।
রোগা, গোবেচারা ছেলেটাকে দেখলেই বোঝা যায়, এর ভিতরে গভীর ও গোপন অসুখ রয়েছে। তবু যেন বাঁচার এক প্রাণপণ ইচ্ছে এর দুখানা আয়ত চক্ষুতে এসে বাসা বেঁধেছে। সেখানেই দুটি পিন্দিমের মতো জ্বলছে এর সবটুকু প্ৰাণশক্তি। অস্বস্তিতে, লজ্জায়, হীনম্মন্যতা ছেলেটা নুয়ে পড়েছে। কৃতজ্ঞতায় ছলছল বরছে চোখ। কেননা তাকে এরা নিজেদের পয়সায় চিকিৎসা করাতে নিয়ে যাচ্ছে। তাও আবার গাড়িতে করে। এই বিরল সৌভাগ্যে তার যেন ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না।
কয়েক মিনিট কথা বলেই ছেলেটাকে ভারী ভাল লাগতে লাগল, হেমাঙ্গর। গরিব, দীনভাবসম্পন্ন, নিরহংকারী লোকেরাই কি ঈশ্বরের চিহ্নিত মানুষ? কে জানে, হতেও পারে। এ ছেলেটার কাছে বসলে একটা ভাল অনুভূতি হয়। যেটা অধিকাংশ মানুষের সান্নিধ্যে হয় না।
সাজগোজ করতে চারুশীলা সময় নেয়। আজও নিল। তারপর যখন বন্ধু রিয়া আর ছেলে পিন্টুকে নিয়ে বেরিয়ে এল তখন ঘর একেবারে মাতোয়ারা হয়ে গেল নানা সুগন্ধে।
নাক কুচকে হেমাঙ্গ বলে, ইস। তোকে যে ডাক্তারখানায় ঢুকতেই দেবে না।
চারুশীলা ফোস করল, ইস! কেন দেবে না শুনি?
হোমিওপ্যাথি, ওষুধ দারুণ সেনসিটিভ। উগ্ৰ গন্ধে তাদের গুণ নষ্ট হয়ে যায়।
যাঃ, বাজে বকিস না।
রিয়া কিন্তু একটু অস্বস্তিতে পড়ে বলে, হ্যাঁ, আমিও কিন্তু ওরকম কথা শুনেছি। কী হবে এখন!
চারুশীলা ধমকের গলায় বলে, ওর কথায় নাচিস না তো। ওটা এক নম্বরের পাজি। লোককে ভড়কে দেওয়াই ওর হবি।
হেমাঙ্গ গম্ভীর থেকেই বলে, আজ তোর কপালে অপমান লেখাই আছে। কণাদ নিশ্চয়ই তোকে বের করে দেবে চেম্বার থেকে। বিদেশ থেকে গুচ্ছের সেন্ট আনিয়ে মাখছিস, তোর আক্কেল নেই? এত সেন্ট মাখলে অন্য সব গন্ধ পাবি কি করে? ফুলের গন্ধ, ফলের গন্ধ, খাবারের গন্ধ, শিশুর মুখের গন্ধ এসবই তো তোর অজানা থেকে যাবে!
চারুশীলা চোখ পাকিয়ে বলল, থামবি? আমাকে আর গন্ধ চেনাতে হবে না। যা একখানা শহরে বাস করি, ম্যাগো, ডাস্টবিনের গন্ধ, পচা ইঁদুরের গন্ধ, ডিজেলের গন্ধ গা গুলিয়ে দেয়। উনি এসেছেন গন্ধ নিয়ে বক্তৃতা দিতে।
গাড়িতে সামনের সীটে হেমাঙ্গর পাশে চয়ন বসল, জানালার ধারে পিন্টু। পিছনে কলরবমুখর চারুশীলা আর রিয়া।
গাড়ি চালাতে চালাতে হেমাঙ্গ নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, আপনার প্রবলেমটা কি? এপিলেপসি?
চয়ন মাথা নেড়ে বলে, না না। এপিলেপসি নয়।
তাহলে?
একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়। কুয়াশার মধ্যে একটা ট্রেন ঝিক ঝিক করতে করতে এগিয়ে আসে। তখন আমার বা হাতের বুড়ো আঙুলটা নড়তে থাকে। আর তারপর…
তারপর?
আমার আর কিছু মনে থাকে না।
ঝিরঝির করে বৃষ্টি নামল। ওয়াইপারটা চালু করে হেমাঙ্গ বলল, অজ্ঞান হয়ে যান?
হ্যাঁ। কিন্তু সেটা ফিটের অসুখ বলে আমার মনে হয় না। আমার বিশ্বাস, ওই ট্রেনের শব্দটা না হলে আমিও আর অজ্ঞান হবে না। কেন যে শব্দটা হয়! আপনি জানেন?
দুনিয়ার কতটুকুই বা আমরা জানি? বাড়ি থেকে আপনার কোনও চিকিৎসা হয়নি?
একটু দোনোমানো করে চয়ন বলে, হয়েছে। লাভ হয়নি।
অ্যালোপ্যাথি না হোমিওপ্যাথি?
দুরকমই। মাদুলি-টাদুলিও দেওয়া হয়েছিল।
কখনও ব্যায়াম বা আসন-টাসন করেছেন?
আমি পারি না। শরীরে দেয় না। আমি ভীষণ দুর্বল।
অনেক সময়ে আসন করলে সারে।
চয়ন বিনীতভাবে চুপ করে থাকে। বড় কাটা হয়ে বসে আছে। এয়ার কন্ডিশনার চলছে বলে কাচের গায়ে ভাপ জমে যাচ্ছে। বাইরে বৃষ্টির তোড় বাড়ছে।
