নিমাই খুব হাসল, বলে কি রে পাগল! আমি কি মেয়েমানুষের দিকে তাকাই? তবে বিয়ের প্রস্তাব যে আসেনি তা নয়। কিন্তু নাকে খত দিয়ে রেখেছি, ও পথে আর নয়।
যাক বাবা, বাঁচা গেল। ওদিকে বীণাদিদিও এইসব ভেবে ভেবে অস্থির। টাইফয়েডের সময়ে নাকি প্রায়ই স্বপ্ন দেখত যে, তুমি ফের বিয়ে বসেছি। একবার তো ঘুম থেকে উঠেই আমাকে তোমার কাছে তক্ষুনি পাঠায় আর কি। বলল, যা গিয়ে দেখে আয় তো সত্যিই বিয়ে করেছে কি না।
নিমাই হাসল না। করুণ মুখ করে বলল, ওরকম সন্দেহের কোনও কারণ নেই।
সে আমি বলেছি। নিমাইদাদা সেরকম লোক নয়। তবু তার সন্দেহ যায় না। শোনো, কালই যাও। নিজের হাতে টাকাটা দিয়ে দেখ নেয় কি না। তার ধারণা তুমি তাকে ঘেন্না করো।
ছি ছি। কেষ্টর জীব, তাকে ঘেন্না করব কি রে! আমার তো নেড়ি কুকুরটাকেও ঘেন্না হয় না।
সে কথাটাই বুঝিয়ে দিয়ে এসো। তা বলে নেড়ি কুকুরের কথাটা তুলো না। তোমার তো আক্কেল নেই।
যাবোখন। না না। খন বললে হবে না। কালই যাও। হাতে একটু সময় নিয়ে যেও! গিয়ে হুটোপাটি করে চলে এসে না! দুটো কথা বলার যেন সময় পায় বেচারি।
আমি গেলে টাকা নেবে?
নেবে। তার অবস্থা ভাল যাচ্ছে না। গিয়ে আবার বলে বোসো না যেন যে আমি কাঁচরাপাড়ায় এসেছি। তাহলে ভাববে আমিই তোমাকে পাঠিয়েছি। তুমি ভাবখানা করবে যেন নিজের গরজেই গেছ।
খুব হাসল নিমাই। বলল, অত শেখাচ্ছিস কেন? আমি তেমন আহাম্মক নই। এখন চপ খা।
দাঁড়াও। কথা এখনও শেষ হয়নি। বীণাদিকে নিয়ে ফের ঘর করবে তো!
নিমাই একটু ভাবিত হল। বলল,দেখ, ওসব তো চুকেবুকেই গেছে। ঘর করার মতো মন বীণার আর নেই। একবার বারমুখো হয়ে পড়লে মেয়েদের আর ঘরে মন বসতে চায় না।
তুমি তো সবজান্তা কি না, খুব মন বসবে। তাকে একটা সুযোগ দাও।
মাথা নেড়ে নিমাই বলে, আমারও মনটা মরে গেছে কি না। আর কেমন যেন সম্পৰ্কটায় বিশ্বাস হয় না।
কাতর গলায় কুসুম বলে, ওরকম বোলো না গো। বীণাদিকে তো রোজ দেখছি! কত যে কাঁদে, কত যে পোড়ে তা তুমি জানো না।
সে তার যাত্ৰাদলের জন্য কাঁদে রো। আমার জন্য নয়। আমি যখন তার কাছে থাকতাম তখনও কি আমাকে মানুষ বলে মনে করত? ছিলাম অন্নদাস। অতগুলো ডলার আর পাউন্ড নিয়ে চেপে বসেছিল, একবারটি বিশ্বাস করে আমাকে বলেনি পর্যন্ত।
এখন চিপ খাওয়াও তো।
চপ খেয়ে কুসুমের মুখে হাসি ফুটল। বলল, বড্ড ভাল তো। আদাকুচি, হিং আরও কী কী সব দিয়েছ। খুব স্বাদ হয়েছে। এইজন্যই না তোমার দোকান এত চলে। আহা, এরকম একখানা দোকান বনগাঁয়ে থাকলে বেশ হত!
কুসুমকে আরও কয়েকটা পদ খাওয়াল নিমাই। কুসুম আহ্লাদে আটখানা। গরিবের মেয়ে, মরা জিব। ভাল-মন্দ বিশেষ জোটে না। সুখাদ্য খেয়ে আজ যেন মুখখানা আলো হয়ে গেল।
মুখ ধুয়ে মশলা মুখে দিয়ে কুসুম বলল, নিমাইদাদা, তোমার টাকা হয়েছে, সে ভগবানের দয়া। কিন্তু তোমারটা খাবে কে বলো তো! এত তো করলে, জন না থাকলে কি হয়? আমি বলি কি, বীণাদিকে ঘরে নিয়ে এসো। সে তো তোমার চাকরিও করতে চেয়েছিল।
তুই বললেই তো হবে না। তারও মতামত আছে। সেও তো একটা আস্ত মানুষ।
আচ্ছা সে নয় হল। তোমার অমত নেই তো!
আগে ভাবতে দে।
কুসুম চলে যাওয়ার পর সত্যিই ভাবতে বসল। নিমাই। খুব ভাবল। ছোট্ট একটা মেয়েকে সেই যে বিয়ে করে আনল। সেই দিনের ঘটনা থেকে এ পর্যন্ত সব খুঁটিনাটি ভোবল নিমাই। বিয়ের সময়কার সেই কিশোরীর চোখে ছিল স্বপ্ন। বুকভরা অসহায় ভালবাসা। নিমাইকে পেয়ে যেন উথলে উঠত। তারপর অভাবে কষ্টে সেই ভালবাসা মরল। নিমাইকে বাঁচাতে যাত্ৰাদলে গেল আর তখনই খানিকটা হাতছাড়া হয়ে গেল বীণা। আবার কিছুটা ফিরে পাওয়া গেল অন্যরকম বীণাকে। তাদের দাম্পত্য জীবনে অনেক রকম সম্পর্কের রদবদল হয়েছে। এখন বড় দূরের হয়েছে সম্পর্ক। বীণাকে এখন ছেড়ে দিতেই পারে নিমাই। কিন্তু তাতে বীণার কতটা ভাল হবে?
পরদিন সকালেই বনগাঁ রওনা হল নিমাই।
বীণার চেহারা এতই খারাপ হয়ে গেছে যে, তাকে দেখে চেনাই যায় না। মুখ শুকিয়ে এইটুকু। শরীরটাও যেন রোগা হয়ে কুঁকড়ে গেছে। বীণা কোনওদিনই লম্বাচওড়া ছিল না। ছোট গড়নের বীণা রোগ হয়ে যাওয়ায় দেখাচ্ছে যেন বালিকার মতো। কিন্তু মুখে গভীর বিষণ্ণতা আর হতাশা তাকে বুড়িয়েও দিয়েছে অনেক।
দেখে বুকে একটা ধাক্কা খেলো নিমাই। সে জিজ্ঞেসই করল না, কেমন আছ? দরকার নেই; বীণা যে ভাল নেই তা তো দেখেই বুঝতে পারছে।
দরজাটা ছেড়ে দিয়ে বীণা বলল, ভিতরে আসবে কি? নাকি নষ্ট মেয়ের ঘরে ঢুকলেও তোমার জাত যাবে!
এই চিমটি-কাটা কথাটার জবাব দিল না নিমাই। জুতো ছেড়ে সে ঘরে ঢুকল। সেই আগের মতোই সব আছে। তবে দৈন্যদশাটা আজ চোখে পড়ল নিমাইয়ের। বোধ হয় সে নিজে আজকাল ভাল থাকে বলে এ ঘরটার দারিদ্র্য তার বেশি করে চোখে লাগছে।
বিছানার একাধারে সন্তৰ্পণে বসিল নিমাই। কিছু বলল না।
বীণা জানালার কাছে গিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে বলল, একটা খবর দিয়ে আসা উচিত ছিল। আচমকা দেখে আমি এত চমকে গেছি যে, বুকটা ধড়াস-ধড়াস করছে। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।
চমকে গেলে কেন?
তুমি কখনও আসবে বলে ভাবিনি তো!
মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল নিমাইয়ের। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, অম্বলটা কি খুব হচ্ছে নাকি আজকাল?
হ্যাঁ। আজকাল যেন জলও সহ্য হয় না।
খুব খালি পেটে থাকো বোধ হয়?
