কুসুম দুষ্ট হাসি হেসে বলল,তোমারই বা হল না কেন বলো তো?
আহা! তখন নাটক-নাটক করে দম ফেলার সময় নেই। বাচ্চা হলে পারতাম?
কিন্তু এখন তো বুঝছি, একটা কুঁচো-কঁচা থাকলে কত ভাল হত!
কথাটা বীণারও খুব মনে হয়। নিমাই মুখচোরা মানুষ, কিন্তু এক-আধবার সেও বলেছে, একটা বাচ্চা হলে হত।
উল্টে ধমক দিয়েছে বীণাপাণি, দুটো পেটেরই জোগাড় হয় না, আর একটাকে এনে কষ্টের মধ্যে ফেলি। আর কি!
আসল কথা তখন ফিগার-টিগারের কথা খুব মনে হত বীণার। যাত্রায় পরিশ্রম তো কম নয়। তার ওপর সিজনের সময় কোথায় কোথায় চলে যেতে হত। বাচ্চা থাকলে পারত ওসব?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, হয়নি বলে আমার দুঃখ নেই। অভাবের সংসারে তো কষ্টই পেত।
কুসুম চোখ বড় করে বলল, আর অভাবের দোহাই পারছি কেন গো বীণাদি? নিমাইদার কি পয়সার অভাব?
নিমাইদার পয়সা নিমাইদারই, আমার তো নয়।
তুমি নাও না কেন?
বীণা একটু চুপ করে থেকে বলে, আজ বুঝতে পারছি সে আমাকে ঘেন্না করে। আমার বাতাসটাও সে সইতে পারে না।
কী যে বলো না তুমি! নিমাইদা কি সেরকম মানুষ?
আমি ঠিকই বুঝি। আমি যা বুঝি তা কি তোরা বুঝতে পারবি? এ বুকটায় আজ বড় জ্বালা।
এবারও কি টাকা ফিরিয়ে দিলে?
দিলাম। ওর টাকা আর নেবো না। বাঁধন যখন কেটেই গেছে তখন কোন লজ্জায় টাকা নেবো বল?
এ বাঁধন কি কাটে?
ওসব তোদের সেকেলে ধারণা। অগ্নিসাক্ষী, নারায়ণসাক্ষী ওসবেরও কোনও মানে হয় না। মেয়েদের ভয় খাওয়ানোর জন্য ওসব চালাকি করা হয়। যাতে স্বামীর সঙ্গে বুঝতে না পারে। আজকাল কত ধর্মের বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে।
সব বিয়েই তো আর ভাঙছে না।
সব বিয়ে ভাঙবে কেন? সকলের কি সমান কপাল?
কুসুম একটু চুপ করে থেকে বলল, সকলের কথা ছেড়ে দাও। তোমারটা নিয়ে ভাবো।
ভাবাভাবির কিছু নেই। বিয়ে আমার সাইল না।
ওরকম করে বোলো না তো! আমার খারাপ লাগে। তোমার বিয়ে মোটেই ভাঙেনি। ছাড়াছাড়ি হওয়ার মানেই কি ভাঙা? স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কত মন কষাকষি হয়।
এ তো সে নয়। ও আমাকে মন থেকে উপড়ে ফেলেছে।
তাহলে কি ফি মাসে টাকা পাঠাত?
দয়াধর্ম নেই সে কথা তো বলিনি। কিন্তু বউ কি শুধু দয়ার পাত্রী? আর কিছু নয়? আমি তার দয়ার দান নেবো কেন? তার আগে কি একগাছা দড়ি এ গলার জন্য জুটবে না?
বড় মন খারাপ করে দাও তুমি। টাকাটা ফিরিয়েই বা দিচ্ছ কেন? ফিরিয়ে দিলে বুঝি নিমাইদার অপমান হয় না? একবার ফিরিয়ে দিয়েছ, তা সত্ত্বেও তো পরের মাসে পাঠিয়েছে!
বললাম তো, এ সব ওরা দয়া।
কুসুম আর কিছু বলল না। কিন্তু দিন তিনেক বাদে কাঁচরাপাড়ায় দিদির বাড়ি যেতে হয়েছিল তাকে, দিদির ছেলের অনুপ্রাশনের নেমন্তনে। পরদিন গিয়ে নিমাইকে তার দোকানো ধরল।
এই যে নিমাইদাদা, কেমন আছ?
ওরে বাবা, এ যে কুসুম! আয় আয় বোস এসে। গরম চাপ ভাজা খা দুটো।
খাওয়ার কথা পরে হবে। তোমার সঙ্গে ঝগড়া আছে।
ঝগড়া! না দিদি, সে পেরে উঠব না। জন্মে কারও সঙ্গে ঝগড়ায় এঁটে উঠিনি। তা বৃত্তান্তটা কী?
তোমার বউ তো শুকিয়ে মরতে বসেছে, তা জানো?
নিমাই একটু গম্ভীর হল। একটু বিষণ্ণ। বলল, তার কর্মফল আমি কি করে খণ্ডাই বলতো! যাত্রার চাকরিটা গেল। আমার টাকা নিচ্ছে না। এখন উপায় কী?
উপায় অনেক আছে।
কী উপায়?
তুমি অন্য লোকের হাতে টাকা পাঠাও কেন? নিজে যেতে পারো না?
কেন, বীণা কি তা নিয়ে কিছু বলেছে?
তা বলেনি, তবে সে অভিমানী মানুষ। মনে হয় ওভাবে টাকা নিতে তার মানে লাগে।
নিমাই একটু ভেবে বলল, কিন্তু আমার যাওয়াটা কি ঠিক হবে?
কেন হবে না? নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমি একজন পরপুরুষই তো হয়ে গেছি এখন। ভাবি, গেলে হয়তো আর কারও আতে লাগবে।
ওমা! কার কথা বলছ?
সজলবাবুর কথাই বলছি। এই তো কালও এসে গেলেন। কবিরাজি কাটলেট করে খাইয়ে দিলাম। বীণাকে বিয়ে করবেন বলে বড় উচাটন হয়ে পড়েছেন।
কুসুম একটু স্তব্ধ থেকে বলল, বীণাদিও কি তাই বলেছে তোমাকে?
না। সে উল্টো কথাই বলে। তবে হয়তো লজ্জায়।
নিমাইদা, সজল কিন্তু ঠিক কথা বলছে না।
বেঠিক বলছে?
কুসুম একটু দ্বিধাগ্ৰস্ত হয়ে বলল, সজলবাবু যায় আসে ঠিকই। কিন্তু সম্পর্ক ওরকম হলে আমি জানতে পারতাম।
নিমাই উদাস গলায় বলে, আমার তো বেশি কিছু জানারও নেই। বিয়ে করতে চাইলে করুক না। সজলবাবু বলছেন, বিয়ের পর দুজনে মিলে যাত্রার দল খুলবেন। কিছু টাকা চান। আমি বলেছি, যাত্ৰাদল খোলার মতো টাকা আমার নেই। তবে দশ-বিশ হাজার হয়তো পেরে যাবো। টাকা যাক, তবু বীণা তো মনের মতো কাজ নিয়ে থাকতে পারবে। তার কাছে আমার মেলা বাণ।
ছাই ঋণ! তোমাকে দুর্দিনে দেখেছে, সে তো বউ আর বর নিজেদের জন্য করেই। ওরকম ভাবো বলেই তো তোমরা কেউ কারও আপন হতে পারো না। একে অন্যের জন্য করবে বলেই তো বিয়ে, অত ভদ্রতা কিসের? তোমার সব ভাল, কিন্তু ওই বিগলিত ভাবটা ভাল নয়। কিন্তু। ঋণ-টিন কিছু নেই তোমার। আর শোনো, যার বউ পরে টেনে নিয়ে যায়। সে কিন্তু মোটেই উঁচুদরের লোক নয়। সজল এখানে আসে আর তুমি জোড়হাত করে তাকে কবিরাজি খাওয়াও, এ কেমন কথা! থাপ্পড় কষাতে পারো না।
ওরে বাপ রে! তোর যে দেখি আজ রণচণ্ডী মূর্তি।
আমার বড্ড রাগ হয় তোমাদের কাণ্ডকারখানা দেখে। যেমন দেবা তেমনি দেবী। আচ্ছা, একটা সত্যি কথা বলবে?
বল না!
তোমার কেউ নেই তো!
তার মানে?
বলি, কাউকে পছন্দ-টছন্দ করে বসোনি তো এর মধ্যে?
