বেলা নটা নাগাদ যখন বিছানা ছেড়ে উঠল তখনই সিঁড়িতে লঘু পায়ের শব্দ। এবং তার পরেই তার দরজায় এসে যে দাঁড়াল তাকে এই মেঘলা দিনে প্রত্যাশাই করেনি। সে। অনিন্দিতা।
অনিন্দিতা ঝলমলে হাসি হেসে বলল, কেমন আছ চয়ন?
চয়নের মনটা হঠাৎ আনন্দে ভরে গেল। সত্যিকারের খুশির হাসি হেসে বলল, তুমি এই বৃষ্টি মাথায় করে কোথা থেকে এলে?
চৌকির এক পাশে বসে অনিন্দিতা আগে বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচাল। তারপর বলল, গতকাল পিসির বাড়িতে এসেছিলাম। আজ ফিরে যাওয়ার আগে তোমার সঙ্গে দেখা করে যাচ্ছি। অনেক দিন তোমাকে দেখিনি।
তোমাকেও কতদিন দেখিনি অনিন্দিতা! তুমি চলে যাওয়ার পর থেকেই আমি একদম বন্ধুহীন।
সত্যি? আমি না থাকায় তোমার খারাপ লাগে?
খুব খারাপ লাগে।
তোমার কি শরীর খারাপ?
মুখটা একটু বিকৃত করে চয়ন বলল, শরীরই তো আমাকে খেয়ে ফেলছে। সারাক্ষণ শরীরের কথা ভাবতে ভাবতে আমি কি পাগল হয়ে যাবো অনিন্দিতা?
কেন, তোমার নতুন করে আবার কী হল?
আজকাল ফ্রিকোয়েন্ট অ্যাটাক হয় এপিলেপসির! কেন হয় তা বুঝতে পারি না। আজ একটু আগেই ভাবছিলাম, বেঁচে থাকা মানে যন্ত্রণাই যদি হয় তা হলে যন্ত্রণাকে বাঁচিয়ে রেখে লাভ কি? আমি সুইসাইডের কথা ভাবছিলাম।
ছিঃ চয়ন! তোমাকে আমি খুব বকব আজ। কেন ওসব ভেবেছ তুমি? তোমার বেঁচে থাকাটা বুঝি শুধু তোমারই প্রয়োজন?
আর কার?
ভাল করে ভেবে দেখ তো, তোমাকে কেউ সত্যিকারের ভালবাসে কি না।
চয়ন অনাবিল হেসে বলল, তুমি বাসো।
তা হলে? বলে সেই ঝলমলে হাসিটা হাসল অনিন্দিতা।
কে জানে কেন আজ অনিন্দিতাকে বড় ভাল দেখাচ্ছে। স্বাস্থ্যু হয়তো ভাল হয়েছে কিছুটা। একটা চটক এসেছে মুখশ্ৰীতে।
অনিন্দিতা বলল, ওখানে গিয়ে কিন্তু আমরা বেশ ভাল আছি। একটা বাগান করেছি। আমি ফুলের চর্চা করি, মা করে তরকারিরদুর চাষ। পলিউশন নেই। গ্রাম-গ্ৰাম ভাব। বেশ লাগে। সবচেয়ে ভাল লাগে কী জানো?
কী?
সকালে পাখির ডাক। কত পাখি যে আসে!
তোমার শরীর একটু সেরেছে।
সেরেছে মানে? মাঝখানে তো মুটিয়ে যেতে শুরু করেছিলাম। আমাদের নার্সিং হোমে একজন যোগ টিচার আসেন। তার কাছে রেগুলারব্যায়াম আর আসন শিখছি।
মানুষ বেঁচে থাকতে ভালবাসে বলে বেঁচে থাকার জন্য কত কিছু করে। ব্যায়াম, আসন, ডায়েটিং। চয়নও কি বেঁচে থাকতে ভালবাসে না? খুব বাসে। কিন্তু তার জীবন তো অন্যের মতো নয়।
কী ভাবছ চয়ন?
কত কি! আমি তো সারা দিন ভাবি।
আমার সব অপরাধ কি ক্ষমা করেছ চয়ন?
অপরাধ! বলে চয়ন অবাক হয়ে চেয়ে থাকে, কিসের অপরাধ?
ভুলে গেছ বুঝি? বাঁচলাম। আমি তো ভাবি চয়ন আমার সব খারাপ স্মৃতি মনে রেখেছে, আমার ভালটুকু ভুলে গেছে।
আমার স্মরণশক্তি খুব ভাল। তোমার কিছুই তুলিনি। ভাবতে গেলেই সব ফোটোগ্রাফের মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। রোগা-ভোগা লোকদের বোধ হয় শরীরের কারণেই স্মৃতিশক্তি প্রখর হয়।
স্মৃতিশক্তি এমনিতেই অনেকের ভাল হয়। তুমি কবে আমাদের বাড়ি বেড়াতে যাবে চয়ন?
কবে যাবো? যাবো একদিন।
নাঃ ওসব এড়ানো কথা। চলো না একদিন, তোমার খারাপ লাগবে না, এখানে তো একা মুখ বুজে পড়ে থাকো। ওখানে গেলে একটু কথা-টথা তো বলতে পারবে। আজ যাবে?
আজ? নাঃআজ মেঘলা করেছে।
তাতে কি? মেঘলা দিনে কি লোকে ঘরে বসে আছে? আমিও তো যাবো বাড়ি। চলো না চয়ন।
চয়ন ভাবছিল। সিদ্ধান্ত নিতে তার দেরি হয়।
অত ভেবো না, ভাবলে আর হবে না। চলো তো, উঠে পড়ো।
তা হলে একটু বোসো। আমি এখনও মুখে চোখে জল ও দিইনি।
ঠিক আছে, বসছি। তুমি যাবে ভাবতেই এত আনন্দ হচ্ছে আমার। মা-বাবা ভীষণ খুশি হবে।
উত্তর চব্বিশ পরগনায় গঞ্জ মতো জায়গায় অনিন্দিতাদের বাড়ি। পাকা বটে, কিন্তু চেহারার দৈন্য তাতে ঘোচেনি। কিন্তু দৈন্য ঘুচিয়েছে সতেজ গাছপালা, দুৰ্বোঘাস আর আলো-হাওয়া। বাড়িটাকে কী যত্ন করে পরিষ্কার রাখে ওরা।
চয়নকে দেখে সত্যিকারেরই খুশি হলেন অনিন্দিতার মা আর বাবা। মা বারবার বলতে লাগলেন, তোমাকে ছেলের মতোই দুটি বাবা, ছেড়ে এসে মনটা খারাপ লাগত। চোখে জল এসেছে কতবার।
সত্যি
সত্যি নয়? ওদের জিজ্ঞেস করো। ভাবতাম চয়নটা কী খায় কী পরে কে জানে! শরীর খারাপ হলে তো কেউ খোঁজও নেবে না।
চয়নের মন থেকে মৃত্যুচিন্তা উবে গেল। পৃথিবীর এই একটা কোণে এখনও তার জন্য তিনটি উত্তপ্ত হৃদয় উন্মুখ হয়ে থাকে। তার আর বেশি দরকার কি? এটুকুর জন্যই কি বেঁচে থাকা যায় না। হয়তো যায়। ভেবে দেখবে চয়ন।
১১৭. নিমাইয়ের পাঠানো টাকা
নিমাইয়ের পাঠানো টাকা দুমাস ধরে নিচ্ছে না। বীণাপাণি। ছেলেটা টাকা নিয়ে আসে, বীণা দ্বিতীয় মাসে বলেই দিল, টাকা আর নেবো না। ওকে গিয়ে বোলো আর যেন না পাঠায়।
নিমাইয়ের সঙ্গে একটা মিটমাট তো করতেই চেয়েছিল বীণাপাণি। নির্লজের মতো চাকরি চেয়েছিল ওর কাছে। বিষ্টুপুর থেকে বাবার শ্রাদ্ধের পর ফেরার পথে একটা রাত বনগাঁয়ে থাকতে অনুরোধ করেছিল। তা নিমাই পাত্তা দিল না; টাকা হয়ে লেজ ফুলেছে। সকলেরই হয়, নিমাই কি আলাদা রকমের হবে? অত যার গুমোর তার টাকা হাত পেতে নেবে, এমন বেহায়া এখনও হয়নি। বীণা ।
একার একটা পেট চলে যায়। কিন্তু বেশিদিন কি যাবে? পয়সাকড়ি তলানিতে এসে ঠেকেছে। এক পয়সাও আয় নেই। বীণা তো আর মানুষের বাড়িতে ঝি-গিরি করতে পারবে না। কুসুম একটা চাকরির প্রস্তাব এনেছিল। বেবি-সিটিং। সারা দিন বাচ্চা সামলাতে হবে, তিন শো টাকা। কিন্তু কেন যেন ইচ্ছে হল না। তার নিজের বাচ্চা নেই, বাচ্চা মানুষ করার। অভিজ্ঞতাও হয়নি। কুসুমকে বলল, ও আমি পারব না। বেবি-সিটিং করতে হলে নিজের বাচ্চা মানুষ করার অভ্যাস থাকলে २श।
