চয়ন বুঝেছে এবং হাড়ে হাড়ে বুঝেছে। ঘাড় নাড়ল।
অয়ন সেদিনকার মতো চলে গেলেও, আবার দুদিন পরে এল। হাতে একটা ফর্ম। ফর্মটা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, এটা পূরণ করে ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে দিস। ব্ল্যাঙ্কগুলো সবই আমি ফিল-আপ করে দিয়েছি। তুই শুধু অ্যাকাউন্ট নম্বর বসিয়ে সই করে জমা দিবি।
অয়ন চলে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ ফর্মটা হাতে নিয়ে বসে রইল চয়ন। সে জানে তার টাকাটা আর তার থাকবে না। অয়ন তাকে বোকা এবং অসহায় বলে ধরে নিয়েছে। কিন্তু তার মতলবটা খুব পরিষ্কার। অয়নের টাকাটা সে শেয়ারে খাঁটিয়ে কিছু ঘরে তুলতে চায়। তার পর টাকাটা শোধ না, দিলেও চয়ন কিছু বলতে বা করতে পারবে না। অয়ন এসব ধরেই নিয়েছে। আত্মরক্ষার কোনও উপায় চয়ন ভেবে পেল না। ফর্মটা সে আনমনে ছিঁড়ে ফেলে দিল।
কিন্তু অয়ন আবার হানা দিল দুদিন পর, কি রে, ফর্মটা জমা দিয়েছিস?
বুক দুর দূর করছিল চয়নের। বলল, ছাত্রের পরীক্ষা ছিল, বড্ড ব্যস্ত ছিলাম।
অয়ন একটু অবিশ্বাসের চোখে তার দিকে চেয়ে থেকে বলল, দুদিনেও সময় পেলি না? নাকি অন্য কিছু ভাবছিস?
কী ভাবব?
মানুষের মনে কত কী থাকে!
চয়ন ভয় পেয়ে চুপ করে গেল।
অয়ন রাগ করল না। বলল, ওরে শোন, টাকাটা যদি মারও যায় তা হলে সেটা মায়ের পেটের ভাইই তো মারবো! আত ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি ছাড়া তোর নেক্সট টু কিন তো কেউ নেই। ভাল করে ভেবে দেখ, তোর কিছু হলে টাকাটা ব্যাঙ্কেই পড়ে থাকবে সাসপেন্স অ্যাকাউন্টে, আমি তো জানতেই পারতাম না বাই চান্স খবরটা না পেলে। টাকার জন্য ভয়ের কিছু নেই। আখেরে তোর লাভই হবে। আমি নিজেও শেয়ারে টাকা খাটাচ্ছি। তাতে ঠকছি না।
চয়ন তবু চুপ করে রইল।
ফর্মটা জমা দিয়ে দিস কিন্তু। বলে অয়ন চলে গেল।
পরদিন রবিবোর সকালে এল বিউদি। মুখভর্তি হাসি। হাতে এক বাটি মুড়িঘন্ট। গরম। বলল, এটা আজ ভাতের সঙ্গে খেও। বুঝলে?
চয়ন অবাক হল। বলল, আবার ওসব কেন বিউদি?
এমনিই। খাবে তো?
খাবো। রেখে যাও। এক কাজ করো আমার বাটিতে ঢেলে দিয়ে যাও।
ওমা! তা কেন? তুমি খাও, পরে আমার ঝি এসে এঁটো বাটি নিয়ে যাবে।
বউদি ঢাকা দেওয়া বাটিটা তার ঘরের একাধারে রেখে হঠাৎ চাপা গলায় বলল, তোমার দাদা তোমার টাকাগুলো শেয়ারে খাটাতে চাইছে, না?
হ্যাঁ।
উদি চাপা গলাতেই বলল, আজ ও সকালেই বেরিয়ে গেছে। বলে গেছে তোমাকে যেন বাজি করিয়ে রাখি। তুমি কি রাজি?
চয়ন বিমর্ষ মুখে বলল, আমার কেমন ইচ্ছে হচ্ছে না বউদি।
বউদি বলল, দিও না চয়ন। টাকাটা ও জলে দেবে। মাথায় আজকাল কেবল শেয়ার ঘুরছে। মাথায় কে যে শেয়ারের পোকা ঢুকিয়েছে! তুমি অ্যাকাউন্ট অন্য ব্যাঙ্কে ট্রান্সফার করে নাও!
তা হলে দাদা খুব রেগে যাবে।
তা রাগবে। তোমাকে বলি, সাত দিন বাদে আমরা মাসখানেকের জন্য বেড়াতে যাচ্ছি। এই সাত দিন কোনওরকমে ঠেকিয়ে রাখো। পারবে না?
চেষ্টা করব।,
তোমার কষ্টের টাকা এভাবে নষ্ট হবে ভাবতেই আমার খারাপ লাগছে।
চয়ন তার বউদির দিকে একটু অবাক চোখে তাকাল।
আমি তোমার শক্রি নই। সংসারের নানারকম অশান্তিতে নিজেকে ঠিক রাখতে পারি না। তোমার দাদার সঙ্গে আজকাল রোজ ঝগড়া হচ্ছে। কেন যে ও এত টাকা টাকা করে বেড়াচ্ছে আজকাল কে জানে!
দাদাকে কী বলব বিউদি।
তা কি আমি জানি? তুমিই ভেবে দেখো।
আমার মাথায় কোনও বুদ্ধি আসছে না।
আমি একটা রিস্ক নিতে পারি।
কী রিঙ্ক?
আমি তোমার দাদাকে বলব যে, তুমি রাজি হয়েছ এবং সব ঠিক আছে। তাতে তোমার দাদা একটু নিশ্চিন্ত থাকবে। বেড়াতে যাওয়ার আগে বোধ হয় টাকাটা তুলবার চেষ্টা করবে না। কারণ এ সপ্তাহটা ওর নানা কাজ আছে। ব্যস্ত থাকবে। বুঝেছ?
হ্যাঁ।
আমি যে বারণ করেছি তা বোলো না কিন্তু।
না বউদি। দাদা। কিন্তু ঠিকই বলে। তোমরা ছাড়া আমার তো আপনজন কেউ নেই। দাদা বলছিল, হঠাৎ আমার কিছু যদি হয় তা হলে টাকাটা মারা যাবে।
মাগো। অমন কথা বলেছে ও? ছিঃ। মৃগীরোগ নিয়ে কত লোক কত কি করছে। মৃগী রুগী বলেই ওরকম ভাবতে হয় নাকি?
চয়ন চুপ করে থাকে।
বউদি বলে, ও খারাপ কথা বলেছে তোমাকে। মোটেই ওরকম বলা উচিত হয়নি।
বউদি চলে যাওয়ার পর আকাশপাতাল ভাবতে বসল। চয়ন। টাকাটা এক মাসের জন্য বাঁচালেও শেষ অবধি অয়নের থাবা থেকে টাকাটা বাঁচানো যাবে না, চয়ন জানে। তার তেমন প্রতিরোধ করার ক্ষমতা নেই। টাকাটা শেয়ারের বাজারে গাঁটগচ্চা যাওয়ার চেয়েও কি কোনও মহৎ উপায়ে ব্যয় হতে পারে না? টাকাটা জলে ধরে নিয়েই সে চিন্তা করল, টাকাটার একটা ভাল গতি হওয়া দরকার।
আজ সে অনেকটাই তৃপ্ত। টাকাটা যোগ্য হাতে গেছে। কৃষ্ণজীবন এই পৃথিবীটাকে ভালবাসেন। প্রাণপণে তিনি মানুষের সর্বনাশকে বাঁধ দিয়ে আটকানোর একটা চেষ্টা করছেন। পঞ্চাশ হাজার টাকা হয়তো কিছুই নয়, তবু এই পৃথিবীর জন্য তো কিছু একটা অবদান থাকল চয়নেরও।
আজ সকালে শীতের কবোষ্ণ রোদ নেই। হাওয়া দিচ্ছে, আকাশ মেঘলা। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে মাঝরাত থেকে। চয়নের মন ভাল নেই।
আজ সকাল থেকে ঘরে শুয়ে শুয়ে মরার কথাই ভাবছিল চয়ন। বেঁচে থাকার প্রলম্বিত যন্ত্রণা তাকে রোজই পীড়িত করে আজকাল। এই জীবন যাপন করে যাওয়ার অর্থ কি? কেন তাকে বেঁচে থাকতেই হবে?
ভাবতে ভাবতে মৃত্যুর এমন প্রেমে পড়ে গেল যে সে নিজের মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করতে পারল। নিশ্চিত তাঁর মৃত্যু ঘটবে আত্মহননের পথে। সবচেয়ে সহজ উপায় কোনও হাইরাইজ বাড়ির ছাদে উঠে চোখ বুজে লাফিয়ে পড়া। সেইভাবেই মরবে ষে। ঠিক করে ফেলল।–
