প্রবন্ধে সে এক জায়গার সভ্যতার অভ্যন্তরে স্ববিরোধের উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছে, টিভিতে দেখতে পাচ্ছি। ঝাকে ঝাঁকে গুলি, মর্টার, রকেট, বোমার আক্রমণে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে শহর, মরছে মানুষ! আবার তার ভিতরেই রেডক্রস এসে তুলে নিয়ে যাচ্ছে হতাহতদের, মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে মানুষ দুটো কাজই করছে কি করে? মারা এবং বাঁচানোর চেষ্টা? এখনও পৃথিবীতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত যুদ্ধান্ত্র তৈরি হচ্ছে, চলছে মারণাস্ত্র তৈরির গম্ভীর গবেষণা। এখনও অন্ত্রের বাজার রমরম করছে দক্ষিণী দেশগুলিতে। সভ্যতা তা হলে কত দূর এগোেল? কোনদিকে এগোল?
আজকাল বড় অস্থির, লাগে তার। ছুটে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। সে কি মানুষকে বোঝাতে পারছে না তার কথা?
১১৬. শীতের শুরুতেই দাদা-বউদি বেড়াতে গেল
শীতের শুরুতেই দাদা-বউদি বেড়াতে গেল দক্ষিণ ভারতে। বাসা পাহারা দিয়ে রাখতে পারত চয়নই। কিন্তু চয়নকে ওদের বিশ্বাস নেই তেমন। বাড়িতে বহাল করে রেখে গেল বিউদির এক বিধবা দিদিকে। একতলায় নতুন ভাড়াটে গ্রন্থ অল্পবয়সী চাকুরে এক দম্পতি। ভদ্রলোক বড় কোম্পানির সেলসে চাকরি করেন, ঐ রাইটার্স। এদের সন্তান হয়নি এখনও।
উপরিতলায় চিলেকোঠায় চয়ন একা। রাধে, খায়, শুয়ে থাকে, কখনও আকাশের দিকে চেয়ে থাকে, কখনও দিগন্তহীন দিগন্তের দিকে। চারদিকে সংসারী মানুষজন। সে ভাল আছে, না মন্দ আছে তা বুঝতেই পারে না। তবে সে যে আছে ভীষণভাবে আছে তা নিত্য টের পায় শরীরের নানা আদি-ব্যাধি আর বেদনার ভিতর দিয়ে। টের পৃষ্ঠায় মূৰ্ছার পর জ্ঞান ফিরে এলে অসম্ভব দুর্বলতার ভিতর দিয়ে। কেন এই থাকা? কেন মুছে যাওয়া নয়? কেন মিলিয়ে যাওয়া নয়?
চয়ন বুঝতে পারে এ জীবনটাকে আর টেনে নিয়ে যাওয়ার মানেই হয় না। সে কি জীয়ন্ত? তার তো মনে হয়। সে নিজের শবদেহ বহন করে চলেছে মাত্র। মৃত এ শরীরটা দিয়ে কী হবে তার?
তবু ভুলে থাকা যেত। তুলিয়ে রেখেওছে নিজেকে সে বহুকাল। কিন্তু আজকাল বড় বন্ধুহীন, বড় একা হয়ে যাচ্ছে। এক জায়গায় যেন ঠেকে গেছে সে। নর্দমার জালিতে যেমন আটকে থাকে কলার খোসা ঠিক তেমনি।
বিপদটা কে ঘটাল কে জানে! সম্ভবত অনিন্দিতার বাবা। লোকটা বোকা এবং সরল। চুয়নের টাকার কথা কোনও সময়ে ওই লোকটাই গল্প করে গেছে। অয়নের কাছে।
অয়ন একদিন সন্ধের পর হানা দিল ছাদে। অপ্রত্যাশিত।
কি রে তোর খবর-টাবর কি?
চয়ন খুবই অবাক হল। তাকে কুশল প্রশ্ন করার মানুষই নয়। অয়ন। তুলনায় বরং বিউদি কিছুটা ভাল ব্যবহার করে, কিন্তু অয়ন নয়। সে বলল, ভালই আছি।
শরীর ভাল আছে তো? সেই যে অজ্ঞান হয়ে যেতিস?
ওটা তো সারার রোগ নয়। .
অয়ন যেন চিন্তিত হয়ে বলল, তা হলে তো তোর জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট করে রাখা উচিত।
জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট শুনে কিছুই বুঝতে পারল না চয়ন। হঠাৎ জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট কথাটা আসছে কেন? সে বলল, তার মানে কি?
এসব অসুখ থাকলে সাধারণত জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট করে রাখাই সেফ।
চয়ন বলল, ও।
ব্যাঙ্কে তোর কত টাকা আছে?
এ প্রশ্নেও থতিমত খেতে হল চয়নকে। সে বলল, আছে সামান্যই।
যত সামান্যই হোক, তোর একটা কিছু হলে টাকাটা জলে যাবে। বুঝেছিস?
তা হলে কী করা উচিত?
বলছি তো জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট করে নে, আইদার অর সারভাইবার।
চয়ন একটু ভড়কে গেল, জবাব দিতে পারল না।
অয়ন বলল, সেভিংস অ্যাকাউন্ট নাকি?
হ্যাঁ।
মুখটা বিকৃত করে অয়ন বলল, সেভিংসে আর কীই বা সুন্দ দেয়! টাকাটা পড়ে পড়ে পচে যাচ্ছে। তুই এত বোকা কেন? চারদিকে কত নতুন নতুন স্কিম চালু হয়েছে।
আমি তো খবর রাখি না।
অয়ন বলল, সবচেয়ে ভাল অবশ্য স্টক এক্সচেঞ্জে টাকাটা খাটানো। শেয়ারের বাজারটা এখন খুব তেজি। একটু ক্যালকুলেশন করে লাগাতে পারলে ছক্কা লাভ।
কিন্তু চয়ন এ কথাতেও উদ্বুদ্ধ হল না। চুপ করে রইল। তার টাকার দরকার ঠিকই, কিন্তু টাকা-মনস্ক সে নয়। টাকার পিছনে ছুটতেও তার ভাল লাগে না।
অয়ন বলল, তোর তো আর নেক্সট টু কিনা কেউ নেই, আমরা ছাড়া। তুই তোর বউদ্দি বা আমাকে জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে নিয়ে নে। তাতে টাকাটা অন্তত বেহাত হবে না। বুঝেছিস?
না, চয়ন বোঝেনি। আবার বুঝেছেও। তার মাথাটা একটু ভোঁ ভোঁ করছিল। সে চুপ করে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারল না।
অয়ন একটু ওপরওয়ালার মতো আদেশের সুরে বলল, বেশি দেরি করাটাও ঠিক হবে না। দু-চারদিনের মধ্যেই যা
চয়ন অসহায়ের মতো বলে দিল। না বলে করেই বা কি? শত হলেও সে তো অয়নের বাড়িতেই থাকে। শত হলেও অয়ন তার আপনি দাদা।
অয়ন বলল, অত ভাবছিস কেন? টাকাটা ওভাবে ফেলে রেখে ভুল করছিস। টাকা-পয়সা সবসময়ে খাটাতে হয়। আজকাল বোকারাই ওভাবে টাকা ব্যাঙ্কে ফেলে রাখে।
চয়ন কী বলবে ভেবে না পেয়ে হঠাৎ বলে ফেলল, আমি একটা ব্যবসা করব বলে ভাবছিলাম।
ব্যবসা! কিসের ব্যবসা?
এখনও ঠিক করিনি।
কত টাকা আছে তোর?
খুব বেশি নয়।
লাখ টাকা তো আর নেই?
না, না, হাজার পঞ্চাশেক হবে।
ও টাকায় কিসের ব্যবসা হবে? ওসব বুদ্ধি করতে যাস না। টাকা মারি হয়ে যাবে। আমি ব্যাঙ্কের লোক, সব জানি। ব্যবসা করার অনেক হ্যাপা আছে। বরং শেয়ারে খাটালে লাভ, সেটাও ব্যবসা।
চয়ন মাথা নেড়ে বলল, ভেবে দেখব।
এতে ভাবাভাবির কী আছে? টাকাটা আপাতত জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট করে রোখ। আমি শেয়ারে খাঁটিয়ে তোর অ্যাকাউন্টেই আবার জমা করে দেবো। বুঝেছিস?
