ঠিক বোঝা যায় না সব কিছু। হাতের নাগালেই যেন কোথাও রয়েছে সেই অমোঘ সত্য। একটু আড়ালে। কিন্তু কিছুতেই তার অবগুণ্ঠন মোচন করা যায়নি আজও। আজও জানা গেল না মৃত্যু কি, জন্ম কেন? আজও জানা গেল না এই প্রাণবন্যার অর্থ কি! সেইজন্যই কি আকুল মনুষ্যক প্রশ্ন করেছিল, হে সূর্য, উন্মুক্ত করে তোমার সত্যের মুখ, আমাকে দেখতে দাও সেই সত্যকে।
অনেক রাত অবধি ঝুম হয়ে ছাদে দাঁড়িয়ে রইল কৃষ্ণজীবন। যখন ঘরে এল তখন ভোর হতে আর বাকি নেই। মন প্রশান্ত। মন ভাসমান। না, বামাচরণ বা শ্যামলী সেখানে পৌঁছবে না কোনওদিন।
আর বিছানায় গেল না কৃষ্ণজীবন। ভোররাতে মাকে জাগিয়ে বলল, আমি যাচ্ছি মা!
ও মা! কিছু খেয়ে যাবি না?
না মা। দেরি হয়ে যাবে। তুমি ঘুমোও। আমি আবার আসব।
আবার আসব কথাটা আজ তার পিছু নিল। আবার আসব! সত্যিই কি আবার আসা যায় একবার এ জীবন ছেড়ে চলে গিয়ে? কে জানে। কিন্তু কেবলই মনে হয়, অলক্ষে একটা আসা-যাওয়ার বৃত্তাকার চংক্ৰমণ চলেছে কোথাও প্রাণ থেকে প্রাণে, দেহে দেহান্তরে। আবার আসব—এ কথাটা মানুষের বড় প্রিয়।
কলকাতায় তার জন্য অপেক্ষা করছিল কয়েকটা ক্লাস, কিছু মিটিং, কনফারেন্স। অপেক্ষা করছিল কয়েকটা ছোটখাটো কিন্তু গুরুতর ঘটনাও। খাদে বাস পড়ে যাওয়ায় মরতে মরতে বেঁচে ফিরে এসেছে হেমাঙ্গ। আপাতত ঘরবন্দী। দ্বিতীয় খবর হল, সরকার বাহাদুর কৃষ্ণজীবনকে তিন বছরের জন্য জাতীয় অধ্যাপক নিযুক্ত করেছেন। তৃতীয় খবর হল, চয়ন তার কষ্টে অর্জন করা কিছু টাকা পথিবীর ভালর জন্য দান করতে চায়।
তৃতীয় খবরটাই তাকে চমকে দিল সবচেয়ে বেশি। এক সন্ধেবেলা তার মুখোমুখি দীন ভঙ্গিতে বসে এপিলেপটিক, টিউশনি-নির্ভর ছেলেটা যখন অস্ফুট গলায় তার ইচ্ছেটা প্রকাশ করল তখন বিশ্বাসই হল না তার। বলল, কী করতে চাও বললে?
দান করতে চাই। পৃথিবীর যাতে ভাল হয় এমন কাজে।
কত টাকা চয়ন?
প্রায় পঞ্চাশ হাজার।
এ টাকা তুমি জমিয়েছ?
হ্যাঁ। দশ বছর ধরে টিউশনি করছি। আমার বিশেষ খরচ তো নেই। টাকাটা জমে গেছে।
এই ভাবপ্রবণ, আবেগতাড়িত প্রস্তাবে কৃষ্ণজীবন একটু হাসল। বলল, পৃথিবীর কিসে ভাল হবে তা কি তুমি জান?
আপনার কাছে শুনেছি। খানিকটা পড়েওছি ডারলিং আর্থ বইতে।
কৃষ্ণজীবন মাথা নেড়ে বলে, আমার এক ছাত্রও আমেরিকা থেকে ডলার পাঠিয়েছিল যাতে আমি পৃথিবীর মঙ্গলের জন্য টাকাটা ব্যয় করি। আমি ভেবেই পাইনি কী করব! টাকাটা তাকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য হই।
কাতর গলায় চয়ন বলে, আমার টাকাটা আপনি নিন। এ টাকাটা আমাকে খুব জ্বালাচ্ছে।
কেন চয়ন জ্বালাচ্ছে কেন? এরকম অদ্ভুত কথা আমি জীবনে শুনিনি।
চয়ন লজ্জিত একটু হাসি হেসে বলল, টাকাটা আমি এমনিতেও রাখতে পারব না। আমার দাদা টাকাটা চাইছে।
কৃষ্ণজীবন অবাক হয়ে চেয়ে থাকে তার দিকে। তারপর বলে, কেন চাইছে?
বলছে কি সব শেয়ারটেয়ার কিনবে। আমাকে লোভ দেখাচ্ছে, তাতে নাকি অনেক টাকা লাভ হবে।
কষ্ট করে টাকা জমিয়েছ, সে টাকা তোমার দাদা নেবে কেন? এ তো অদ্ভুত কথা।
ও টাকা আমি রাখতে পারব না, দাদা নিয়ে নেবে।
তোমার চিকিৎসার খরচ আছে, দুর্দিনের জন্য কিছু সঞ্চয়ও রাখা দরকার। টাকাটা দান করলে তোমার চলবে কি করে? তা ছাড়া টাকাটা খুব কমও নয়, ইচ্ছে করলে এ টাকা দিয়ে একটা ছোটখাটো ব্যবসাও করতে পার।
চয়ন মাথা নেড়ে বলল, হেমাঙ্গীবাবু আমাকে তাই বলেছিলেন। ব্যবসা আমার দ্বারা হবে না। আর আমার নিজের চলে যাবে। আমি চাই টাকাটা একটা ভাল কাজে লাগুক। আমি চেক কেটেই এনেছি। আপনার নামে।
দাও। বলে কৃষ্ণজীবন হাত বাড়োল। চেকটা হাতে নিয়ে দেখে বলল, তা হলে তোমার অ্যাকাউন্টটায় আর কিছু রইল না?
না।
ঠিক আছে। বলে চয়নের লম্বাটে শীর্ণকায় মুখখানার দিকে চেয়ে কৃষ্ণজীবন যেন একটি পবিত্ৰ ভাবকে অনুভব করার চেষ্টা করল। গরিব যখন দান করে তখন বোধ হয় স্বৰ্গে ঘণ্টাধ্বনি হয়।
কৃষ্ণজীবন অবশ্য চয়নের আড়ালে চেকটা কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলে দিল। আজ আবেগবশে টাকাটা দান করলেও, কে জানে, কখনও আশু ভবিষ্যতে ও বিপদে পড়বে কি না, টাকাটা ওরই হোক, তবে ওর অজান্তে।
পৃথিবীর ভাল কিভাবে হবে তা কি চট করে নির্ধারণ করা সম্ভব? পৃথিবীর ভালর জন্য চাঁদার খাতা খোলার তো দরকার নেই। চাই শুধু আরও একটু চৈতন্য। নড়েচড়ে বসা। বুদ্ধি শানিয়ে নিয়ে নয়, হৃদয়বত্তা দিয়ে বুঝবার চেষ্টা করা, মানুষের যতেক কর্মকাণ্ড কোনদিকে নিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীকে।
সম্প্রতি লন্ডনের একটি বিখ্যাত ম্যাগাজিনে ডার্লিং আর্থ বইয়ের রিভিউতে এক সাহেব-পণ্ডিত কিছু প্ৰশংসাবাক্য উচ্চারণ করার পরই অভিযোগ করেছেন, এই বইয়ের লেখক নিজে বিজ্ঞানের মানুষ হয়েও মহাকাশ গবেষণার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। ইনি পৃথিবীকে পিছিয়ে নিতে চান। পঞ্চদশ শতকে। মানুষ এতখানি এগিয়ে আসার পর কি আবার পিছু হটতে পারে?
রিভিউটা পড়ে কৃষ্ণজীবন সামান্য উত্তেজিত হয়ে একটা জবাবী প্ৰবন্ধ খাড়া করার চেষ্টা করছে। নাম দিয়েছে: ব্যাক টু ফিউচার, অ্যাডভান্স টু পাস্ট। গোটা মনুষ্য সভ্যতার ইতিহাসে যে মানুষের সভ্যতার অগ্রগমন ঘটেছে প্ৰযুক্তির ঘাড়ে চেপে সেটাকেই আক্রমণ করেছে সে। সে বলতে চেয়েছে, এগোনো মানে কী? এগোনো মানেই কি আরও কলকারখানা? আরও যন্ত্র-নির্ভরতা? আরও আরাম-আয়েস? অগ্রগমন মানে কি সমকামিতা আর বিবাহ বর্জন? অগ্রগমন কি মানুষকে বাঁচতে শিখিয়েছে? অনুধাবন করতে শিখিয়েছে প্রকৃতির নিয়মানুসারে জীবনের ধাঁচ গড়ে নিতে? সভ্যতা কি কাণ্ডজ্ঞান লোপাট করতে চায়? সভ্যতা কি মানুষের ঠোঁটে তুলে ধরা এক পাত্ৰ হেমলক?
