না হয় সুপই করে দেবো।
পারবে? বলে একটু হাসল কৃষ্ণজীবন। বলল, তার দরকার নেই। দুখানা রুটি আর একটু ডাল সেদ্ধ হলেই হবে।
মোটে? ওটুকু খেয়ে থাকলে তো শরীর পাত হয়ে যাবে।
তা কেন? কম খেলেই শরীর ভাল থাকে। বেশি খেলেই নানারকম ট্রাবল হয়। আর একটা কথা শোন, আমি আজকাল মাছ মাংস একদম খাই না। ওসব কোরো না বরং একটু স্যালাড কোরো। তা হলেই হবে।
আচ্ছা, তাই করব।
রাতে খাওয়ার সময়েই কথাটা তুলল বামাচরণ, দাদা, আমি একটা কথা ভাবছিলাম কদিন ধরে।
কী কথা?
আমার চাকরিটা তো কিছুই নয়। পিওনের আর কতই বা বেতন? তা ছাড়া মাঝে মাঝে শরীরটাও খাবাপ করছে আজকাল। যাতায়াতের ধকল সহ্য হয় না।
কৃষ্ণজীবন একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কথাটা মিথ্যে নয়। বামা অনেক রোগা হয়ে গেছে। চেহারাটা একসময়ে বেশ ভাল ছিল। সুপুরুষ বলতে যা বোঝায়। এখন দড়কচা মেরে গেছে। মাঝে মাঝে মাথা খারাপ হয়ে যায়, তখন শরীর জীৰ্ণ শীর্ণ হয়ে পড়ে।
শ্যামলী বলল, জানেন তো, রামজীবনের শুণ্ডারা ওকে বেদম মেরেছিল। তখন মাথায় চোট হয়েছিল খুব। আর সেই থেকেই মাথার গণ্ডগোল।
কৃষ্ণজীবনের ভিতরটা একটা ব্যথায় ভরে গেল। ঘটনাটা সে শুনেছে। বামা যেমনই হোক, মার খাওয়ার কথা শুনে বড় কষ্ট হতে থাকে কৃষ্ণজীবনের। পৃথিবীতে কত অনভিপ্রেত ঘটনাই যে রোজ কত ঘটে? কেন যে ঘটে। সভ্যতার ইতিহাস তত কম পুরনো নয়, তবু মানুষ সভ্যতার এলাকাতেই ঢুকতে পারল না এখনও। শুধু বস্তুপুঞ্জ দিয়ে কি কিছু প্রমাণ করা যায়?
শ্যামলী ধরা-ধরা গলায় বলল, এ বাড়িতে আমাদের পক্ষে তো কেউ নেই। আমরা হলাম একঘরে। ওকে মারার পর ভয় পেয়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম। শ্বশুরমশাই ভরসা দেওয়ায় ফিরে এসেছি। কিন্তু আপনার ভাইয়ের শরীরের অবস্থা ভাল নয়। অনেক ছুটি নিতে হয়েছে বলে আজকাল মাইনে কাটে। ওরও চাকরির আর ধকল পোষাচ্ছে না।
চোখ তুলে কৃষ্ণজীবন বলল, কী করতে চাও?
শ্যামলী চুপ করে রইল। বামাচরণ বলল, রেমো তো দোকান দিয়ে বসেছে। চলছেও ভাল। বিটুপুর এখন বেশ গঞ্জ জায়গা। লোকজনের যাতায়াত আছে। ব্যবসা করতে পারলে চলে।
শ্যামলী বলল, আপনার অনেক টাকা বাড়ির পিছনে খরচ হয়ে গেছে, রামজীবনকেও দোকান করতে টাকা দিয়েছেন। কোন মুখে যে আপনার কাছে হাত পাব তা ভেবে পাচ্ছি না। আপনার ভাইয়ের ইচ্ছে একটা স্টেশনারি দোকান দিয়ে বসে। কিন্তু অত টাকা আমরা কোথায় পাব বলুন। আমার গয়না বেচে দু-চার হাজার টাকা হতে পারে। কিন্তু তাতে তো হবে না!
কৃষ্ণজীবন বড় বিব্রত বোধ করতে লাগল।
বামাচরণ বলল, লাখ খানেক টাকা ঢালতে পারলে ভালই হবে। কিন্তু আপাতত যদি কমের মধ্যেই করি তা হলেও পঞ্চাশ হাজারের নিচে হবে না।
কৃষ্ণজীবনের মুখে রুটির টুকরো বিস্বাদ ঠেকছিল। তার কারণ, সে জানে, শেষ অবধি সে এদের সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না। লোভী, হয়ত অভাবে পড়েই হয়েছে, হয়ত টাকাটা শোধ দেওয়ার ইচ্ছে নেই, তবু কি পারবে কৃষ্ণজীবন না দিয়ে? রামজীবন বারণ করেছে ঠিকই, কিন্তু সে কি করে ঠেকাবে এদের?
কৃষ্ণজীবন শান্ত গলায় বলল, তুই পারবি দোকান করতে?
কেন পারব না? রেমো পারলে আমিও পারব। দোকান করা তো সোজা কাজ। আমার বিশ্রামও হবে।
শ্যামলী বোধ হয় ভাবল, টাকার অঙ্কটা বেশিই বলা হয়ে গেছে। হয়ত তত টাকা কৃষ্ণজীবন দিতে চাইবে না। সে বলল, আমরা ধারই চাইছি। দু-দশ হাজার কম হলেও কষ্টেসৃষ্টে দোকান খুলতে পারব।
কৃষ্ণজীবন খাওয়া শেষ করে বলল, ভেবে দেখবখন। তবে একটা কথা বলে রাখি, রামজীবন কিন্তু মাত্র চল্লিশ হাজার টাকায় দোকানটা খুলেছে। তারও দশ হাজার টাকা দিয়েছে ও নিজেই।
বামাচরণ বলল, চল্লিশ হাজারেও হয়। দু-পাঁচ হাজার টাকা আমরাও জোগাড় করতে পারব। চাকরি ছেড়ে দিলে প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাটাও পাওয়া যাবে।
ভাল করে ভেবে দেখ। ভেবে বলিস। আমি মাসখানেকের জন্য বিদেশে যাচ্ছি। ফিরে এসে একবার আসব।
বামাচরণ আর শ্যামলীকে নিয়ে মাথা ঘামাতে আর ইচ্ছে হল না কৃষ্ণজীবনের। মানুষের আগুণ আর দোষঘাটের কথা ভাবলেই তার মন খারাপ হতে থাকে। এসব ভাবনাকে তাড়ানো দরকার।
শীত পড়তে শুরু করেছে। তবে তেমন তীব্র কিছু নয়। খেয়ে এসে মায়ের সঙ্গে একটু কথা বলে গায়ে একটা চাঁদর। জড়িয়ে ছাদে উঠে এল সে। এখন কোনও মহান চিন্তা ছাড়া এইসব জাগতিক চিন্তাভাবনা থেকে মনকে মুক্ত করা যাবে না। কিছু অৰ্থক্ষতি কপালে আছে। যাক, কিছু টাকা যাক। তবু মনটা যেন নীচুতলায় না থিতিয়ে থাকে।
আকাশ এখানে বড় পরিষ্কার। নক্ষত্রমণ্ডলী হীরের ঝাঁপির মতো ঢাকনা খুলে দিয়েছে। আকাশ তার প্রিয় বিষয়। ওই অন্ধকার ও নিস্তব্ধ জগতে আর কোথাও কি আছে পৃথিবীর মতো একটি সজীব গ্রহ? থাকলেই বা তা জানা যাবে কি করে? মানুষের বৈজ্ঞানিক প্রয়াস সীমাবদ্ধ রয়েছে সামান্য পরিধিতে। পৃথিবীর নিকটতম নক্ষত্রটিও চার আলোকবর্ষ দূরে। কোনওদিনই মানুষ আলোর গতি সঞ্চার করতে পারবে কি কোনও মহাকাশযানে? যদিবা পারে তা হলে আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী সেই মহাকাশযান যেইমাত্র আলোর গতি পাবে অমনি সে নিজেই পর্যবসিত হবে এনার্জিতে। সে আর বস্তু থাকবে না। যদি দুৰ্মরতর কল্পনায় ধরে নেওয়া যায়, মানুষ তাও পারল, তা হলেই বা লাভ কি? সবচেয়ে কাছের নক্ষত্রটির পরিমণ্ডলে পৌঁছতেই লেগে যাবে চার বছর। মানুষ পারবে না যেতে ওই গতিতে। কারণ মানুষের শরীর ওই অবিশ্বাস্য গতিবেগ সহ্য করার উপর্যুক্ত নয়। তা হলে কোটি কোটি অর্ব-খর্ব আলোকবর্ষ দূরে দূরে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি নক্ষত্রপুঞ্জের কাছে কোনওদিনই পৌঁছবে না মানুষ। কখনও নয়। কিছুতেই নয়। কল্পবিজ্ঞানে কত কী হয়। কিন্তু মানুষের বিজ্ঞান এখনও সেই অসম্ভব কল্পনার ধারেকাছে পৌঁছয়নি। তার বিজ্ঞান ততদূর পৌঁছতে না পৌঁছতেই শেষ হয়ে আসবে পৃথিবীর আয়ুষ্কাল। আর সেই অন্ধকার গ্রহে চাপা পড়ে যাবে মানুষের কাব্য-দৰ্শন-বিজ্ঞান, কোপর্নিকাস-আর্কিমিডিসপ্লেটো-শেকসপীয়ার-সক্রেটিস-রবীন্দ্রনাথ-আইনস্টাইন, সবাই এবং সব কিছু। তবে কি বৃথাই মানুষের এই বেঁচে থাকা? বৃথা এই প্রকৃতির এত আয়োজন? বৃথা প্রাণী বৃথা এই অন্বেষণ? ব্যর্থ ও মূল্যহীন মানুষের যতেক সঞ্চয়? বাণিজ্য ও নির্মাণ? প্রেম ও পরিবার? আত্মীয়তা-গৃহ-কর্মকাণ্ড।
