একটু হলেই তো মারা পড়তেন।
হ্যাঁ। বেঁচে আছি দেখে সবাই অবাক।
ইস!
একটা অদ্ভুত ঘটনা কি জানেন?
কী?
ওই সাঙ্ঘাতিক অ্যাকসিডেন্টেও নাকি আমি একটা বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বাঁচিয়ে দিয়েছি।
সত্যি?
আমি তো জানি না। যারা প্রত্যক্ষদর্শী তারা বলছে।
আমি সব শুনতে চাই।
অনেক সময় নিয়ে আসবেন। কাউকে বলবেন না কিন্তু।
১১৫. বিষ্ণুপদর শ্রাদ্ধাদি মিটে যাওয়ার এক মাস পর
বিষ্ণুপদর শ্রাদ্ধাদি মিটে যাওয়ার এক মাস পর বলডিং হেডের শেষাংশ লেখা সাঙ্গ হল। কপি সংশোধনের জরুরি কাজটা দিনরাত খেটে করতে হচ্ছিল কৃষ্ণজীবনকে। প্রকাশক আমেরিকা থেকে তাগিদ দিচ্ছে টেলিফোনে। প্রোগ্রাম এবং শিডিউল নিয়ে তাদের কারবার। টার্গেট ডেট তারা পেরোতে দেবে না। ভূতের মতো খাটছিল কৃষ্ণজীবন।
ঠিক এই জরুরি কাজের মাঝখানে রামজীবন একদিন এসে হাজির।
দাদা, একবার বিষ্টুপুর না গেলেই নয়।
কেন রে, কী হল?
ছোড়দা বড় হুজুত করছে। বাড়ির দোতলাটা নাকি বাবা ওকেই দিয়ে গেছে। এখন পারলে মাকে তাড়িয়ে দোতলার দখল নেয়। গাঁয়ের কিছু লোকও ওর পিছনে আছে।
কৃষ্ণজীবনের মুখ রাগে রাঙা হয়ে উঠল। বলল, দোতলায় ওর তো কোনও দাবি থাকতে পারে না।
সে কথা বুঝছে কে! দিনরাত এমন অশান্তি, গালাগাল, চেঁচামেচি যে, মা বলেছে, ওরে, আমাকে ওদিককার। দালানটায় নিয়ে যা। ও-ই এখানে থাকুক।
তা তো হতে পারে না। মা যতদিন বেঁচে আছে দোতলা ভোগ করবে মা।
তুই একবার চল। তোকে একটু ভয় পায়। মাঝে মাঝে আবার এও বলছে, আমাকে দুলাখ টাকা দিয়ে দে, আমি দাবি-দাওয়া ছেড়ে দিয়ে চলে যাচ্ছি।
মজা মন্দ নয়।
সরস্বতীও তার বরকে নিয়ে মাখানে এসেছিল। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলল, তার ভাগ সে ছাড়বে না। বাড়ির একটা অংশ তারও চাই। সেও বলে গেছে, লাখখানেক টাকা পেলে দাবি ছেড়ে দিতে পারে। ওর বরটা খুব বিষয়ী লোক। পঞ্চায়েতে জিতেছে নিজের গাঁয়ে।
কৃষ্ণজীবন কিছুক্ষণ গুম হয়ে থাকে।
রিয়া আলোচনাটা শোনেনি। চা দিতে এসে বলল, কী ব্যাপার রামজীবন, বিষয়সম্পত্তি নিয়ে গণ্ডগোল লেগেছে নাকি?
তটস্থ হয়ে রামজীবন বলল, আর বোল না বউদি, বাবা যেতে না যেতেই কুরুক্ষেত্র।
ওইজন্যই তো ওকে বলেছিলাম বড় বাড়ি করতে যেও না। অত বড় বাড়ি দেখেই সকলের দাবি-দাওয়া উঠছে।
রামজীবন গম্ভীর হয়ে বলে, বিষয় হল বিষ। দোতলাটা একটেরে রেখে দেবো ভেবেছিলাম, তা আর হল না। দাদা যদি বুঝিয়ে-সুঝিয়ে পারে।
ওকে আর এ সবের মধ্যে টানা কেন? জরুরি কাজ নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। তোমরা একটা মীমাংসা করে নাও।
রামজীবন বলল, আমার পরামর্শ হল, দাদা নিজেই দোতলাটা দাবি করে রাখুক। তা হলে বামাচরণের আর কিছু বলার থাকবে না।
কৃষ্ণজীবন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আমার একটা ইচ্ছেও ছিল যে, কয়েক বছর পর বিটুপুরেই গিয়ে থাকব। তা আর সম্ভব নয় দেখছি।
কেন সম্ভব নয় দাদা? খুবই সম্ভব। তুই শুধু নিজের ভাগটা বুঝিয়ে দিয়ে আয়। বামাচরণ যদি বুঝতে পারে যে, দোতলাটা তুই নিজের জন্য করেছিস তা হলে আর রা কাড়বে না।
মাকে শান্তিতে রাখতে হলে এরকমই কিছু একটা করতে হবে। কৃষ্ণজীবন বলল, তুই যা, আমি রোববারে যাব। আমি আপাতত বামাকে একটা চিঠি লিখে দিচ্ছি, ওকে গিয়ে দিস।
রামজীবন চিঠি নিয়ে চলে গেল।
সেই চিঠিতেই কাজ হল। রবিবার কৃষ্ণজীবন বিষ্টুপুরে পৌঁছে দেখে, বামাচরণ রামজীবনের তোলা পাকা ঘরখানায় আশ্রয় নিয়েছে। চিঠি পাওয়ার পর আর গোলমাল করেনি। কৃষ্ণজীবনকে এসে একটা প্রণাম করে বলল, তুই যদি থাকিস তা হলে তো কথাই নেই।
বামার বউও এসে পায়ের ধুলো নিয়ে হাসি-হাসি মুখ করে বলল, আপনিই এখন আমাদের গার্জিয়ান। আপনি যা বলবেন তা-ই হবে।
সমস্যাটা যে এত সহজে মিটে যাবে তা ভাবেনি কৃষ্ণজীবন। সে খুশিই হতে যাচ্ছিল। কিন্তু রামজীবন তাকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে বলল, আমাকে যে দোকান করার টাকা দিয়েছিস এখন সেটা নিয়েই ওরা খুব ভাবছে।
ভাবছে?
ভাবছে মানে আলোচনা করছে। বউদি ছোড়দাকে বোঝাচ্ছে, এক ভাইকে দোকান করার টাকা দিলে আর এক ভাইকেও দেওয়া উচিত। ওরা তোর কাছে টাকা চাইবে।
কিন্তু বামা তো চাকরি করে।
তা করলেই বা দোকান বউদি দেখবে। সে কথাও হয়েছে।
কৃষ্ণজীবন একটু দমে গেল।
রামজীবন বলল, আমি বলেছি দাদা দোকান করার টাকা আমাকে ধার হিসেবে দিয়েছে, দোকান থেকে যা লাভ হবে তা থেকে সুদ সমেত ফেরত দেবো। কথাটা বিশ্বাস করেনি। বলছে, আমরাও না হয় ধার হিসেবেই চাই। কাই একবার হাতে পেলে আর শোধ দেবে না কিন্তু। তুই একটু শক্ত থাকিস।
কৃষ্ণজীবন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দৃঢ় মানসিকতা বলতে যা বোঝায় তার তা নেই। সংসারের বিকট চেহারাটা তার কোনও দিনই ভাল লাগে না। সে সহ্যই করতে পারে না লোভ, লালসা, মিথ্যাচার, সঙ্কীৰ্ণতা।
বামাচরণের হাঁড়ি আলাদা। সেখান থেকে আজ কৃষ্ণজীবনের জন্য নানা ভাল ভাল পদ রান্না করে দিয়ে গেল শ্যামলী। বলল, ও বেলা আমার ওখানেই যদি দুটি ডালভাত খান তা হলে ভীষণ খুশি হই। আপনার সেবা করার সুযোগ তত পাইনি কখনও।
আপত্তি করার কোনও কারণ খুঁজে পাচ্ছিল না কৃষ্ণজীবন। ভিতরে ভিতরে যদিও তার একটা অনিচ্ছে হচ্ছিল। শুধু বলল, রাতে আমাকে কাজ করতে হয় বলে বেশির ভাগ সময়েই আমি নামমাত্ৰ খাই। হয়তো একটু স্যুপ, না হয়তো একটু ডাল। আজকাল রাতের খাওয়াটা কমিয়ে দিয়েছি খুব।
