অ্যাকডিডেন্টের প্রায় পনেরো দিন বাদে হাতে পায়ে প্লাস্টার, মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে হুইল চেয়ারে বসে সে প্লেনে উঠল। এবং ফিরে এল কলকাতায়। নিজের ডেরায়।
ফটিক যে আর্তনাদটা করল সেটা মাইলখানেক দূর থেকেও লোকে শুনতে পেল বোধ হয়। এ কী দাদাবাবু! আপনি যে খুন হয়ে এসেছেন! অ্যাঁ। এ কী কাণ্ড?
ওরকম কোরো না ফটিকদা। আমি ভাল আছি।
নিজের ঘরে দোতলায় এসে একটা আরামের শ্বাস ছাড়ল হেমাঙ্গ। স্থানেরও মায়া কেন তা সে বুঝতে পারে না। এই যে ঘরদের, বারান্দা, চেয়ার টেবিল, চেন আসবাব এদের কি সত্তা আছে? নইলে এত টানে কেন? কেন এই চেনা বাড়িতে ফিরে এসে তার এত স্বস্তি? কী আছে এখানে?
যারা সঙ্গে এসেছিল তারা বিদায় নেওয়ার পর হেমাঙ্গ অনেকক্ষণ ক্যাসেটে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনল। মোর ডানা নাই, আছি। এক ঠাঁই সে কথা যে যাই পাসরি। পায়ের কাছে আগাগোড়া ছলোছলো চোখে ফটিক বসে আছে।
অত মন খারাপ করছ কেন? মরেই তো যেতে পারতুম। কিন্তু মরিনি তো!
কালকেই কালীঘাটে পুজো দিয়ে আসব।
এই ভালবাসাটাকেও ব্যাখ্যা করতে পারে না হেমাঙ্গ। রক্তের সম্পর্ক নয়, মনিব-ভূত্যের সম্পর্ক, তবু তার কিছু হলে ফটিক কাঁদে কেন? এইসব সামান্য সামান্য জিনিসের জন্যই বোধ হয় আজও মানুষের বাঁচতে ভাল লাগে। বড় বড় জিনিসের জন্য যারা বাঁচে বাচুক, কিন্তু এই সামান্য তুচ্ছগুলির জন্যই হেমাঙ্গর বুক তেষ্টায় কাঠ হয়ে আছে।
না, আজ কাউকে কোনও খবর দিল না হেমাঙ্গ। ফটিক আজ যত্ন করে রান্না করল। হেমাঙ্গ অঘোরে ঘুমোলা রাতে। শরীরের সব অস্বস্তি সত্ত্বেও মনটা ভারি ভাল।
এ বাড়িতে হুইল চেয়ার নেই। বেডপ্যান দেওয়ার লোক নেই। কিন্তু একটা দুটো ফোন করলেই সব ব্যবস্থা হয়ে যেতে পারে। সকালে উঠে হেমাঙ্গ ভাবল, দেখা যাক কতটা পারা যায়। ৪৭০
বাঁ হাতটা কনুই থেকে নিচের দিকটা ভেঙেছিল। বাঁ পা ভেঙেছে হাঁটু রাবর। দুটোর কোনওটাই ভজ করার উপায় নেই। ডান পায়ে ভর দিয়ে সে দাঁড়াল এবং বাঁ পা মেঝেয় রেখে অল্প একটু ভার রাখল সে। কেমন একটা অবশ বিহ্বল হয়ে রয়েছে পাটা। কোনও সাড়া নেই যেন। ভয় হল, হয়তো বেশি ভর দিলে আবার ম্যাক করে প্লাস্টারের মোড়ক সহই ভেঙে পড়বে। বোধ হয় এখনই এতটা অ্যাডভেঞ্চার না করা ভাল।
ফটিক অবস্থা দেখে বলল, দাদাবাবু, বিডন স্ট্রিটে একটা খবর দিন।
পাগল! মা এ অবস্থা দেখলে হার্ট ফেল করবে। আমি যে কলকাতায় ফিরেছি সেটাই মাকে জানানোর দরকার নেই।
তাহলে চারুদিদিকে?
দূর! চারুদি চতুর্দিকে রাষ্ট্র করে বেড়াবে। ও পেটে কথা রাখতে পারে না।
ফটিক একটু ইতস্তত করে লাজুক মুখে বলল, তাহলে অন্তত দিদিমণিকে তো জানানো দরকার।
দিদিমণি! সে কে?
ওই যে। গত কয়েকদিন যাবৎ কেবল বেঁাজ নিচ্ছেন ফোনে।
ও। বলে হেমাঙ্গ ভিতরে ভিতরে একটা উথলে ওঠা কিছু টের পেল। বলল, কী বলছিল?
খোঁজ নিচ্ছেন রোজ, আপনি ফিরলেন কি না জানতে।
তাকে খবর দিয়ে কী হবে?
একজন কাউকে জানানো দরকার।
থাক ফটিকদা, জানানোর দরকার নেই। কয়েকটা দিন যাক না।
কিন্তু হেমাঙ্গ বুঝতে পারছিল, তার টয়লেটে যাওয়া বা গা মোছানো, মাথা ঘোয়ানোর জন্য একজন নার্স গোছের কাউকে দরকার। আবার বাইরের কেউ এলে তার স্বস্তিরও অভাব ঘটবে। কী করবে তা বুঝতে পারছিল না সে।
খানিকটা বেলায় সে টয়লেটে গেল বেশ কষ্ট করে। বাঁ পায়ে ভর না দিয়ে। একজোড়া ক্ৰাচ হলে কি সুবিধে হবে?
সারা দিন নিজের অবস্থাটা পর্যালোচনা করে দেখল সে। তারপর ক্রাচের সিদ্ধান্ত নিল। সিদ্ধান্ত নিল, নার্স রাখবে না। যতটা পারে নিজেই করবে। পারবে ঠিক।
কতকাল আর নিশিপুর যাবে না সে! এখনও কত কাল। নিশিপুর যেন দূরের এক রূপকথার জগৎ হয়ে গেছে এখন। সে যেন অলীক, মিথ্যে এক সাজানো জায়গা।
রাত আটটা নাগাদ টেলিফোনটা এল, ফটিকই ধরল। বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ এসেছেন। কী কাণ্ড! পাহাড় থেকে বাস সুদ্ধ পড়ে গিয়েছিলেন খাদে। শরীরের একটা হাড়ও আর আস্ত নেই।… আঁ, হ্যাঁ দিচ্ছি। ধরুন।
ভ্ৰূকুটি করে হেমাঙ্গ বলল, কাকে ওসব বৃত্তান্ত দিলে?
একগাল হেসে ফটিক বলল, দিদিমণি। বড় ভাল মেয়ে। ধরুন ফোনটা।
কৰ্ডলেস টেলিফোনটা হাতে ধরিয়ে দিল ফটিক। হেমাঙ্গর শ্বাসকষ্ট হতে লাগল। বুকটার মধ্যে তোলপাড়।
ওপাশ থেকে কান্নাভরা একটা গলা বলল, কী হয়েছে? কথা বলছেন না কেন?
হেমাঙ্গ একটু হেসে বলল, আর বলবেন না। একটা বিচ্ছিরি অ্যাকসিডেন্ট।
পাহাড় থেকে পড়ে গিয়েছিল বাস।
হ্যাঁ।
উঃ। কী হয়েছিল বলবেন তো!
যা হয় আর কি। খবরের কাগজে যেমন বেরোয়, খাদে বাস, নিহত একত্ৰিশ, ঠিক ওরকম।
আপনার কী কী হয়েছে আমি জানতে চাই।
বাঁ হাত আর পা ভেঙেছে।
কি রকম ভাঙা?
প্লাস্টার করা হয়েছে। ভালই ভাঙা। মাথায় চোট হয়েছিল। পাঁজরেও। কোমরেও।
ও পাশের কণ্ঠস্বরে কান্নার কাপন আর চাপা রইল না, ইস! মা গো! আমি এখনই যাচ্ছি।
না না, এখন না। রাত আটটা বেজে গেছে।
তাতে কি? আমি মাকে নিয়ে যাব।
আচ্ছা, কাল সকালে এলেই তো হয়।
আমার ভীষণ খারাপ লাগছে যে!
তা জানি। কিন্তু রাতে আসার দরকার নেই। কাল সকালে এলে কিছুক্ষণ থাকলে খুশি হবো। থাকবেন কিছুক্ষণ?
মাকে নিয়ে যাবো? না একা?
একটু হাসল হেমাঙ্গ। তারপর বলল, একা।
হাঁটাচলা করছেন কি ভাবে?
কোনওরকমে। কাল থেকে ক্রাচ নিতে হবে।
ইস। কী কষ্ট।
আপনি কাঁদবেন না। কাঁদবার মতো কিছু হয়নি।
