চারদিনের দিন গলায় স্বর এল তার।
রাওয়াত! তুমি কি করে জানলে যে আমার অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে?
রাওয়াত মাথা নেড়ে বলে, কি করে জানব? জানতাম না তো। তুমি আসবে বলে খবরও দাওনি। তবে অ্যাকসিডেন্ট হওয়ার খবর পেয়ে আমরা অনেকেই চলে এসেছিলাম স্পটে। এই পথে আমাদের চেনাজানা আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব সবসময়ে যাতায়াত করে। এসে রেসকিউতে হাতও লাগিয়েছিলাম। ঠিক পঁচিশ জনের পর তোমাকে তোলা হয়।
কতজন মারা গেছে?
একত্ৰিশ জন। আরও দু-চারটে যাবে।
আমার অবস্থা কেমন?
ইউ আর ওকে। দিল্লিতে নিতে পারলে মাথাটা স্ক্যান করা যেত।
আমি কোথায়?
হরিদ্বার। খুব রিস্ক নিয়ে এতদূর এনেছি। কিন্তু না আনলে মুশকিল ছিল।
আমি বাঁচব?
বেঁচে গেছ। থ্যাংক গড। তুমি যাচ্ছিলে কোথায়? আমার কাছে?
হ্যাঁ।
সরি হেমাঙ্গ। ভেরি সরি। আমার কপালটাই খারাপ। এই ঘটনার পর তুমি আর বোধ হয় কোনওদিনই আমার ওখানে যাবে না?
কে বলল? নিশ্চয়ই যাবো।
আচ্ছা। নাউ টেক রেস্ট।
আমার ইনজুরি কতটা?
কিছু ফ্র্যাকচার আছে। ব্যাস।
এনি ভাইটাল উড?
না না।
ভয়ে আর জানতে চাইল না হেমাঙ্গ। চোখ বুজে থেকে বলল, অ্যাকসিডেন্টের সময় একটা বাচ্চা আমার বুকে এসে পড়েছিল। বোধ হয় বাচেনি।
একটু বিস্মিত গলায় রাওয়াত বলল, একটি বাচ্চার কথা বলছ? দু-আড়াই বছর বয়স?
তা জানি না। ওই ভয়ংকর অবস্থায় কিছু ভাল করে দেখেছি নাকি?
অবাক কাণ্ড হল, তোমাকে যখন বের করা হয় তখন তোমাব দুহাতে একটা বাচ্চা ধরা ছিল। সে বেঁচে গেছে।
বেঁচে গেছে?
খুব আশ্চর্যভাবে। লোকে তো ধরে নিয়েছিল ওটা তোমারই বাচ্চা। আমি তাদের ভুল ভাঙাই। তবে বাচ্চার মা বাঁচেনি।
আমি কিভাবে বাঁচলাম রাওয়াত?
ভগবান বাঁচিয়ে দিয়েছেন ভাই। একটা পাথরের চাঙড়ে আছড়ে পড়ে বাসটা দুখন্ড হয়ে যায়। একটা খন্ড গড়িয়ে নিচে চলে গিয়েছিল। ওটায় যারা ছিল কেউ বাচেনি। তুমি পিছনের পোরশনে ছিলে বলে বেঁচে গেছ। এখন বলো, তোমার বাড়িতে কী খবর পাঠাবো! তারা হয়তো চিন্তা করছে।
একটু চিন্তা করে হেমাঙ্গ বলল, বাড়িতে অ্যাকসিডেন্টের খবর দেওয়া ঠিক হবে না। বরং আমার পার্টনারদের জানিয়ে দাও। আমার জিনিসপত্র কিছুই কি পাওয়া যায়নি?
এখানে লুটপাট বিশেষ হয় না। পাহাড়ি লোকেরা এখনও ততটা খারাপ হয়ে যায়নি। তোমার একটা সুটকেস ছিল কি? ইনিশিয়াল মিলে যাচ্ছে, চারকোল ব্ল্যাক রঙের?
হ্যাঁ। দরকারি কাগজপত্র আছে।
ঠিক আছে। আর কিছু?
আমার রিকভারি হতে কত সময় লাগতে পারে?
ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলে দেখব। ইট উইল টেক টাইম।
সেক্ষেত্রে আমাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়া যাবে কি?
মে বি আফটার সাম টাইম। তার আগে তোমাকে দিল্লিতে শিফট করা দরকার। ফর দি স্ক্যান।
ব্যথা আর ব্যথা! আর অবসন্নতা। আর হতাশা। আর নিঃসঙ্গতা। হেমাঙ্গ সারা দিন স্থবিরের মতো পড়ে থাকে। নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই। ডাক্তার বা নার্স কিছু বলতে চায় না। সে অনুমান করে, তার বাঁ হাত আর বাঁ পা ভেঙেছে। সম্ভবত গোটা দুই পাঁজরও। মাথার ব্যান্ডেজ থেকে অনুমান সেখানকার চোটও সামান্য নয়। অনেক রক্তপাত হয়ে থাকবে, নইলে শরীরের এই অবসন্ন হত না।
রাওয়াত, আমাকে কি রক্ত দেওয়া হয়েছে?
অফ কোর্স। ইউ ব্লেড লাইক হেল।
শঙ্কিত হেমাঙ্গ বলে, সেই রক্ত কি এইচ আই ভি ফ্রি? আজকাল ব্লাড থেকে কত এইডস্ হয় তুমি জানো?
রাওয়াত হাসল, চিন্তা কোরো না। তোমার রক্তের গ্রুপ ইজি, আমি তোমাকে রক্ত দিয়েছি। আর দুজন বন্ধুকে ধরে এনেছিলাম। তাদের কারও এইডস নেই।
হেমাঙ্গর তবু একটু অস্বস্তি রয়ে গেল। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে ক্ষণে ক্ষণে একজনের কথা মনে পড়ছে। ভাবতে ভাল লাগছে। যদি অ্যাকসিডেন্টে মরে যেত তাহলে কী করত ও? কাদত নাকি? মন খারাপ করত? তা হয়তো করত। কিন্তু স্বাভাবিক হয়ে যেতে এবং তাকে ভুলে যেতে কতই বা সময় নিত।
দিন সাতেক বাদে একটানা অ্যাম্বুলেন্সে দিল্লি নিয়ে আসা হল তাকে। দুজন পার্টনার কলকাতা থেকে উড়ে এসেছে তার জন্য। খুব ভাল একটা নার্সিং হোমে ভর্তি করা হল তাকে। স্ক্যানে তেমন কিছু ধরা পড়ল না।
বাচ্চা ছেলের মতো সে মাঝে মাঝেই বলতে লাগল, বাড়ি যাবো।
পার্টনার দাশগুপ্ত বলল, বাড়ি বলতে তো গর্চা। সেখানে কে দেখবে তোমাকে? যা অবস্থা করেছ, বেশ কিছুদিন নার্সিং দরকার।
না দাশগুপ্ত, এভাবে হবে না। তোমরা আমাকে কলকাতায় নিয়ে যাও।
তোমার মায়ের পক্ষে কিন্তু ব্যাপারটা শকিং হবে। আমরা এঁকে অ্যাকসিডেন্টের খবর দিইনি। শুধু বলেছি অফিসের জরুরি কাজে আটকে গেছে, ফিরতে দেরি হবে।
হেমাঙ্গ চোখ বুজে গভীর ক্লান্তির সঙ্গে বলল, শোনো দাশগুপ্ত, রিকভারির জন্য মানসিক স্বস্তিও দরকার। এখানে আমার ভীষণ একা লাগছে। আমাকে নিয়ে যাও।
কিন্তু এখনও যে তুমি বিছানা থেকে উঠতে পারছ না।
ট্রেচারেই নেবে।
দাশগুপ্ত একটু ভাবিত মবে বিদায় নিল।
রাওয়াত কর্ণপ্রয়াগে ফিরে গিয়েছিল। আবার এল। বলল, আরে ভাই, ব্যস্ত হচ্ছ কেন? সাত আটটা দিন থাকো। তারপর একটু ফিটনেস এসে গেলে যেও।
একটা সত্যি কথা বলবে রাওয়াত?
কী?
আমার কোনও ভাইটাল ইনজুরি হয়নি তো? হয়তো আমি টের পাচ্ছি না।
আরে না ভাই। হলে টের পেতে না?
আমার কোমরে একটা ব্যান্ডেজ রয়েছে। আগে বুঝতে পারিনি। আমার স্পইনাল কর্ড ভাঙেনি তো?
উঃ, তোমাকে নিয়ে পারা যায় না। ইউ আর অলরাইট ম্যান। আউট অফ ডেনজার।
