আমার! না, আমার তেমন কিছু ব্যাপার নেই।
তুই রাজি নোস?
তাও জানি না।
লোকটাকে তোর ভাল লাগে?
ঝুমকি একটু ভেবে বলল, সেটা তো প্রেম নয়।
তাহলে কী রে দিদি?
ঝুমকি হেসে ফেলল, তুই সেই ছেলেমানুষটাই রয়ে গেছিস।
কেন রে?
এখনও তারি সহজ সরল আছিস তুই। নইলে এভাবে জিজ্ঞেসই করতে পারতি না।
বুবা হাসল, বিয়েটা করেই ফেল দিদি। এ লোটা ভাল। আই অ্যাপ্রুভ।
১১৪. রাওয়াত নামে এক বন্ধু
রাওয়াত নামে এক বন্ধু ছিল হেমাঙ্গর। কলকাতায় ইনকাম ট্যাক্সে চাকরি করত। দেশে ফিরে যাওয়ার মোহে সে একদিন চাকরি ছেড়ে দেশে গিয়ে নিজের বাড়িতে একটা স্কুল খুলে বসল। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। সরকারি সাহায্য দূরের কথা, অনুমোদন পর্যন্ত নেই। সেই থেকে খবরবার্তা বন্ধ ছিল হেমাঙ্গর সঙ্গে। কিছুদিন ধরে রাওয়াত তাকে চিঠি লিখছিল, একবার চলে এসো। হিমালয়ের কোলে আমার ছোট স্কুল দেখে যাও। দেখে যাও আনন্দ কী মহান হতে পারে।
দিল্লির অশোক হোটেলের পাঁচতলার ঘরের বারান্দায় রাত আটটার সময় চেয়ার টেনে বসে নানা কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ রাওয়াতের কথা মনে পড়ে গেল হেমাঙ্গর। দিল্লির কাজ শেষ হয়েছে। কলকাতায় ফিরবার তেমন তাড়া নেই। দুচারদিন দেরি হলেও ক্ষতি হবে না। কাল কৰ্ণপ্রয়াগ রওনা হলে কেমন হয়? বছর সাতেক আগে একবার কেদার-দ্ৰী গিয়েছিল সে। তারপর আর ও পথে যাওয়া হয়নি। কাল রাতটা হরিদ্বারে কাটানো যায়। বাজারের মধ্যে একটা রাবড়ির দোকান আছে। দারুণ করে জিনিসটা। রাবড়ি খাবে, হর কি পৌড়ির চাতালে বসে থাকবে সন্ধেবেলা, আরতি দেখবে। পরশু হরিদ্বার থেকেই রওনা দেবে কৰ্ণপ্রয়াগ। দুটো দিন রাওয়াতের ওখানে কাটিয়ে ফিরে আসবে। মন্দ কী?
ঘরে এসে কলকাতায় এস টি ডি করল সে। সিনিয়ার পার্টনারকে জানিয়ে দিল, ফিরতে দেরি হবে তিন দিন।
পরদিন রওনা হল হরিদ্বার। সেই রাবড়ি খাওয়া, হর কি পৌড়িতে বসে থাকা সবই হল, কিন্তু কেন যেন ভাল লাগল না আগের মতো। আগে যখন এসেছিল তখন দুজন বন্ধু ছিল সঙ্গে। খুব জমেছিল। একা একা জমল না একদম।
ভোর রাতে বাস ধরল সে। বিচ্ছিরি চেহারার বাস। চলতে ঘরঘর শব্দে মাথা ধরিয়ে দিল। তার ওপর গন্ধমাদন ভিড়। অনেকদিন কষ্ট করা অভ্যাস নেই তার। ভিড়টা সহ্য হচ্ছিল না। জানালার ধারে সিট পেয়েছিল বলে রক্ষা। বাস চলতে শুরু করার পর তার মনে হল, রাওয়াত আর তার স্কুল বা কর্ণপ্রয়াগ কেউ তাকে টানছে না। তার যাওয়াটা হচ্ছে জোর করে। নিজেকে সে এক অনিচ্ছুক যাত্রায় বাধ্য করছে যেতে।
শীতের মুখে এসব জায়গায় খুব ঠাণ্ডা পড়ে গেছে। যত বাস ওপরে উঠবে তত বেশি ঠাণ্ডা। সকালে কুয়াশাও পড়েছে খুব। একটা মাফলারে মাথা আর কান ঢেকে একটু ঢুলছিল বসে হেমাঙ্গ।
ঘটনাটা ঘটল দেবপ্ৰয়াগ পার হয়ে চড়াইয়ে ওঠার পর। হেমাঙ্গ তখনও টুলছিল। সহযাত্রীরা কেউ কথা বলার মতো স্ট্যান্ডার্ডের নয়। বেশির ভাগই পাহাড়ে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ, ব্যবসাদার, তীর্থযাত্রী। সুতরাং একা বসে ঢোলা ছাড়া উপায় কি?
বিকট টায়ার ফাটবার একটা আওয়াজে কেঁপে উঠল হেমাঙ্গ। কিছু বুঝে উঠবার আগেই বাসটা একটা অস্বাভাবিক বাঁক নিয়ে ধ করে ঘুরে গেল। তার পরই বাসসুদ্ধ লোকের প্রচণ্ড চিঙ্কার সমেত সোজা নেমে যেতে লাগল নিচে, নিরালম্ব।
নিরালম্বের এই বোধ জীবনে ছিল না হেমাঙ্গর। হাত-পা যেন ভারহীন, শরীর যেন হঠাৎ একখণ্ড পালক। বাসটা একটা পাথর বা কিছুতে প্রচণ্ড শব্দে ধাক্কা খেয়ে উল্টে গেল এবং উল্টো অবস্থাতেই গড়িয়ে যেতে লাগল নিচে। কপালে আর পায়ে দুটো সাতিক ব্যথা পেল হেমাঙ্গ, চোখ আর মাথা ব্ল্যাক আউট হয়ে যাওয়ার আগে শুধু তার মনে হল, ভগবান! ট্যাংকটায় আগুন লাগবে না তো! তাহলে তো সব শেষ।
তার পরই জ্ঞান হারাল সে।
জ্ঞান ফিরল দুদিন বাদে।
এত ক্লান্তি আর এত ব্যথা জীবনে কখনও আর বোধ করেনি সে। সর্বাঙ্গই যেন অচল। যেন আর কোনওদিনই বিছানা ছেড়ে উঠতে পারবে না। চারদিকে চেয়ে দেখে সে একটু অবাক হল। এ তো নোংরা, ভিড়াক্কার হাসপাতাল নয়। এ যে বেশ ঝকঝকে তকতকে একখানা সিঙ্গল বেডের ঘর। ড্রিপ চলছে। মাথায় ব্যান্ডেজ, হাতে পায়ে ব্যান্ডেজ, নাকে অক্সিজেনের ল!
জ্ঞানটা বেশিক্ষণ থাকল না। আবার ঘুমিয়ে পড়ল সে। বারকয়েক সারা দিনে জ্ঞান ফিরল তার। কিছু বুঝতে না পেরে ফের ঘুমিয়ে পড়তে লাগল।
তৃতীয় দিনের সকালে অসহ্য ব্যথার বোধ নিয়ে ঢোখ মেলল সে। কেউ তাকে মৃদু স্বরে নাম ধরে ডাকছিল। যে মুখটা দেখতে পেল সেটা প্রথমে আউট অফ ফোকাস। তার পর চোখ তীক্ষ্ণতর হলে সে বলল, রাওয়াত।
বলল, কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরোল না তার। শুধু ঠোঁট নড়ল।
রাওয়াত ঝুঁকে পড়ে বলল, আর ইউ ওকে?
না। আমি বোধ হয় মারা যাচ্ছি।
এ কথাটাও শুনতে পেল না রাওয়াত। শুধু বলল, থ্যাংক গড। ইউ সারভাইভ।
কোন স্মৃতি নেই সেই দুর্ঘটনার। একটা বিকট শব্দ, নিরালম্ব ভাব, তার পরই আছড়ে পড়া। কিন্তু নানা ব্যথা-বেদনার ভিতর দিয়েও বিদ্যুৎচমকের মতো অদ্ভুত একটা ঘটনা মনে পড়ল তার। বাসটা যখন উল্টে যাচ্ছিল, যখন ভিতরে যাত্রীরা পরস্পরের সঙ্গে তালগোল পাকাচ্ছিল আর দুমদাম বাক্সপ্যাঁটরা এসে পড়ছিল তাদের ওপর তখন একটা শিশু কোথা থেকে ছিটকে এসে তার বুকে ধাক্কা খেয়েছিল। ওই সাতিক অবস্থাতেও বাচ্চাটার জন্য হাত বাড়িয়েছিল হেমাঙ্গ। কিন্তু পারেনি। মাথাটা অন্ধকার হয়ে গেল নিজের অজান্তে। বচ্চাটা কি বেঁচে আছে? বোধ হয় না। এইসব ঘটনায় বাচ্চারাই তো আগে মরে।
