মণীশ একটু হাসল। বুকার গা থেকে পুরুষ মানুষের মতো তাপ ও গন্ধ আসছে না? কোমল দাড়ি ও গোফে। সমাচ্ছন্ন ছিল মুখ। এখন দাড়ি কামাচ্ছে। গোঁফ রাখছে। বুবকা এখন যুবক। পরিপূর্ণ মানুষ।
অপর্ণার মুখ খুশিতে উপচে পড়ছে। দুটি বোনের মুখ উজ্জ্বল। বাড়ির অনুপস্থিত একজন লোক ফিরে এলে যেন নিজের অস্তিত্বেরই একটি হারানো অংশ ফিরে আসে।
সকলকেই একটু একটু উঁয়ে দেখল বুবকা। তারপর আপার দিকে চেয়ে বলল, আপা, আই স্যাম মিসিং অল ফ্রেন্ডস ভেরি মাচ। আমরা চারজন আই আই টিত, তুমি ডাক্তারিতে, সঞ্জয় আর সিংজী যাদবপুর ইলেকট্রিক্যালসে। কোথায়, কোথায় ছড়িয়ে পড়লাম আমরা। অল সেপারেটেড। একটা গেট টুগেদার অ্যারেঞ্জ করো না!
আপা মাথা নেড়ে বলল, আমার সঙ্গে প্রায় সকলেরই যোগাযোগ আছে। সহজে করা যাবে। ওখানে নতুন বন্ধু-বান্ধব। কেমন হল?
অনেক। তবে পড়ার চাপ আছে। বেশি আড্ডা হয় না। তবে তোমার কথা আমরা খুব বলি। তোমার নতুন অ্যাডভেঞ্চারের কথা বলো আপা।
আপা একটু হাসল, কাকাবাবু আর কাকিমার কাছে শুনে নিও। আমি এখন চলে যাবো অনীশ, অনেকদিন বাদে তুমি বাড়ি এসেছ, একজন বাইরের লোক বসে থাকলে তোমাদের ছন্দ কেটে যাবে।
অপর্ণা হাঁ হাঁ করে উঠল, বলে কী রে মেয়েটা। এই যে বললাম খেয়ে যাবো। তুমিও তো রাজি হলে।
মুখখানা ম্লান করে আপা বলে, আমাকে খাইয়ে আপনি খুশি হবেন না কাকিমা, আমি যে খেতেই পারি না।
সে জানি। তোমাকে খাইয়ে দেখেছিও, তবু একটু কিছু মুখে দাও। সাদা ভাত আর পটলের কারি আছে।
দিন তবে ছোট্ট করে। হাসপাতালে একটা পোড়া রুগী আছে। শতকরা পঁয়তাল্লিশ ভাগ পোড়া। সতেরো-আঠেরো বছর বয়সের ফুটফুটে মেয়ে। সে আমাকে খুব খোজে। তার জন্যই এখন যেতে হবে।
অপর্ণা ছলছলে চোখে বলে, আহা রে। বাঁচবে তো?
ঠোঁট উল্টে আপা বলে, কে বলতে পারে কাকিনা? গঁয়তাল্লিশ ভাগ পোড়া তো ভাল হওয়াই উচিত। কিন্তু সেরকম যত্ন যদি পায়। নইলে দ্বিতীয় সংক্রমণে মরে যাবে। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছি বাঁচানোর।
একটু অবাক হয়ে অনীশ বলল, আপা, আজকাল যে বঙ্কিমী ভাষায় কথা বলছ?
চেষ্টা করছি। তুমিও শুরু করে দাও। মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করলে দাঁড়ানোর জমি পাবে না। বাঙালিরা বড্ড তাড়াতাড়ি আন্তর্জাতিক হয়ে যায়। তাই তাদের শক্তি কম।
ও বাবা, তুমি তো আরও পেকেছ দেখছি। আগে তবু মাসিমা গোছের ছিলে, এখন তো দেখছি পুরো দিদিমা।
একটু হাসাহাসি, আরও কিছু পুনসুটির পর আপা তার চড়াই পাখির মতো খাবারটা শেষ করে উঠে পড়ল। বলে গেল, তোমার পুনর্মিলনের ব্যাপারটা সংগঠিত করছি। দেখা হবে।
নাঃ, তোমার সঙ্গে কথা বলতে হলে এখন থেকে বাংলা ডিকশনারিটা হাতে নিয়ে বসতে হবে দেখছি।
মণীশ বলে, ওকে ঠাট্টা করি না বুবকা, ও যে একটা মিশন নিয়ে চলে, সেটা তো কম কথা নয়। আজকাল পাবি ওরকম মেয়ে।
বুকা একটু গম্ভীর হয়ে বলে, তা ঠিক বাবা। আমরা একে ঠাট্টা করলেও ভীষণ রেসপেক্টও করি। আমি তো বলি, আপার মতো এমন মহৎ বন্ধু আমার আর নেই।
অনু আর ঝুমকি মিলে বুকার বাক্স-বিছানা খুলে ফেলছিল। ঝুমকি, চেঁচিয়ে উঠল, এঃ মা! জামাকাপড় কিরকম নোংরা করে এনেছে, দেখ মা!
অনু বলল, বিছানার চাঁদর আর বালিশের কভার দেখ মা, একদম স্লাম ড়ুয়েলারদের মতো।
তুই কী রে বুবকা?
বুবকা হেসে বলে, না না, রেগুলার কাচি। এবার বাড়িতে আসব বলে গত দশ বারো দিন সব জমিয়ে রাখছিলাম।
অপর্ণা বলল, আচ্ছা থাক না, কেচে দেওয়া যারে। ও কি কখনও কাঁচাকুচি কবেছে? এই তো সবে হাতেখড়ি। হ্যাঁ রে, তাদের হস্টেলে লন্ড্রি নেই।
ধোবি আছে। তবে আমি নিজেই কেচে নিই। ধোবি শুধু মাঝে মাঝে ইস্তিরি করে দেয়।
সারা দিন গল্পে গল্পে কেটে গেল। বিকেলে বুবা তার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গেল। একটু বেশি রাতের দিকে সবাই শুয়ে পড়লে বুবকা হানা দিল দিদির ঘরে।
অ্যাই দিদি, ঘুমোচ্ছিস?
ঝুমকি জেগেই ছিল। উঠে বসে মায়াভরা গলায় বলল, আয়। বোস এসে।
বুবকা ঝুমকির চেয়ারটায় বসল। বিছানায় ঝুমকি।
হ্যাঁ রে দিদি, তোর নাকি বিয়ে হয়ে যাবে?
যাঃ। কে বলল?
অনু বলছিল।
অনুটা খুব পেকেছে দেখছি।
ও তো বলছিল সব ঠিকঠাক। শুনে আমার এত মনটা খারাপ হয়ে গেল, বাড়ি এসে তোকে দেখতে পাবো না ভাবতেই পারি না। আচ্ছা, বিয়ের পর মেয়েদের পদবী-টদবী সব চেঞ্জ হয়ে যায় এটা কিরকম নিয়ম বল তো! তোর সব পরিচয় মুছে যাবে নাকি?
বাজে সব নিয়ম। কে যে করেছিল।
আচ্ছা দিদি, আর ইউ ইন লাভ? সত্যি করে বল তো! আমাকে ছুঁয়ে বল।
উঃ, তোকে নিয়ে আর পারি না। গাছে কাঁঠাল গোফে তেল। কোথায় কী?
অনু এমনভাবে বলল যে বিয়ে হুট করে হয়ে যাবে। হেমাঙ্গদাকে আমি দু-একবার দেখেছি অবশ্য। এ পাবসোনেল ম্যান।
ঝুমকি মুখটা একটু ঘুরিয়ে নিল। বলল, এখনও কিছু ঠিক নেই।
কেন ঠিক নেই?
সুমকি হঠাৎ মুখটা তুলে বুকার দিকে চেয়ে বলল, বোধ হয় আমার পক্ষে ও একটা ভুল লোক।
ভুল লোক? তার মানে?
একা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঝুমকি মাথা নেড়ে বলে, জানি না। ও মেয়েদের ভয় পায়। একা থাকতে ভালবাসে। নানা রকম খেয়াল নিয়ে চলে।
বাট হি ইজ এ নাইস ম্যান। ভদ্র, বিনয়ী, আন্তরিক।
সেটা তো সবাই বলে।
তোকে প্রোপোজ করেছে?
না। প্রোপোজ করতেই তো ভয়।
তাহলে অনু যে বলল, ভদ্রলোক তোর জন্য পাগল!
অতটা নয়। তবে কিছু সফটনেস্ আছে হয়তো।
তোর?
