অপৰ্ণা বলল, আহা ইংরজি বললে কী হয়? কত শব্দ তো ইংরজি ছাড়া নেই। ইনজেকশনকে কী বলবে?
ওটার বাংলা আছে কাকিমা। সূচিকাভরণ।
অপর্ণা হেসে ফেলে বলে, হাঁ, হ্যাঁ, মনে ছিল না। কিন্তু সূচিকাতরণ বললে কেউ কি বুঝবে?
আমি চালু করে দিয়েছি। তবে সূচিকাভরণ নয়। হিন্দিতে উঁইয়া বলে, বাংলা করেছি ছুঁচ। রুগীকে বলি, এবার আপনাকে উঁচ দেওয়া হবে। প্রথম প্রথম অবাক হত। এখন হচ্ছে না।
উঃ বাবা, তুমি অদ্ভুত মেয়ে। অথচ বাংলা তো মাতৃভাষা নয়।
ওটাই তো ভুল কাবিমা। কে বলল বাংলা আমার মাতৃভাষা নয়? ভারতের সব ভাষাই আমার মাতৃভাষা। আমি সব কটা ভাষা শিখবার চেষ্টা করছি।
মণীশ বলল, তুমি বোধ হয় পেরেও যাবে। তারপর তোমার প্রবলেমের কথা বলে।
তাই তো বলছি। হাসপাতালে কাজ করতে গিয়ে এসব দেখে মাথা খারাপ হয়ে গেল। আঁটা বালতি নিয়ে পায়খানা, কলঘর পরিষ্কার করে ফেললাম একদিন। রুগীদের বিছানার চাঁদর পাল্টে দেওয়ার ব্যবস্থা করলাম। তার পর হামলা চালালাম রান্নাঘনে, এসব কী খাবার দেওয়া হচ্ছে?
সঙ্গে অন্য ছেলেমেয়েরা ছিল? তাদের সাপোর্ট পেয়েছ?
প্রথমে নয়। সবাই ভয় পেত। নতুন এসেছে তো, ব্যাপারটা বুঝতে সময় নিচ্ছিল। পরে অবশ্য দু-চারজন করে সমর্থক পেয়ে যেতে লাগলাম। কিন্তু লেগে গেল ধাঙর মেথর ঝাড়ুদার ওয়ার্ডবয়দের সঙ্গে, তারপর সুপারের সঙ্গে, তারপর কায়েমী স্বার্থের লোকজন-অৰ্থাৎ ঠিকাদার, সাপ্লায়ারদের সঙ্গেও। অনু, আমি হিসেব রাখছি, আরও তিনটে হল। ওয়ার্ড বয়, সুপার আর সাপ্লায়ার।
অনু বলল, কিন্তু এগুলোর তো বাংলা হয় না আপাজি, এগুলো ক্ষমা করা যায়।
সাপ্লয়ারের বাংলা হতে পারে সরবরাহকারী। সুপারের হতে পারে তত্ত্বাবধায়ক। ওয়ার্ডবয়েরও বাংলা হয় বোধ হয় না মনে পড়ছে না এখন। একটা কী যেন করেছিলাম। যাকগে, এসব করতে গিয়ে লেখাপড়া মাথায় উঠল। কর্তৃপক্ষ তাড়ানোর হুমকি দিতে লাগল। নিম্নবর্ণীয় কর্মীরা একদিন কাজ করল না। তাদের দাবি, আপাকে সরাতে হবে।
তারপর?
খুব অশান্তি গেল কয়েকদিন। আমি খুব গলাবাজি করলাম। ঠেলা ধাক্কাও পেলাম। যারা পেশাদার রক্তদানকারী তারাও একদিন চড়াও হল। শুনছি, আমার নামে মন্ত্রীর কাছে নালিশ গেছে। আমি ভয় পাচ্ছি না। কিন্তু ভাবছি, এসব করে কিছু হবে না কাকাবাবু। সবাই মিলে, অর্থাৎ শহরের সব লোক মিলে যদি হাসপাতালগুলিতে হানা দেওয়া যায় মাঝে মাঝে তাহলে হয়তো হয়। সরকার তো কিছু করতে পারে না। কোনও ক্ষমতাই নেই।
কেন পারে না আপা?
সরকার তো দেশটার সব ডাইমেনশন দেখতে পায় না। তার দেখাটা হয় একবৰ্মা, একপেশে। তারপর সরকার চালায় রাজনীতি এবং দল। দল মানেই চোখে রঙিন চশমা, দলের গাইডলাইন মেনে বিচার বিবেচনা সিদ্ধান্ত করতে হয়। তাই নিরপেক্ষতা থাকে না। রাজনীতিকে চলতে হয় দুনীতিবাজদের কাঁধে ভর রেখে। কী করে কী হবে কাকাবাবু? সরকার তো কত নীতি বানায়, আইন বানায়, সেগুলো হয়তো খুব ভালও। কিন্তু মানুষ যে সেসব আইন বা নীতির খবরই রাখে না, হাসপাতালের রুগী কি জানে যে তার কতটা পাওনা আর কতটুকু তাকে দেওয়া হচ্ছে? তার বিছানার চাঁদর কেন পাল্টানো হয় না, তাকে কেন বেডপ্যান দেওয়া হয় না, কেন শৌচাগারগুলো অমন নোংরা, এসব নিয়ে প্রশ্নই নেই তাদের।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মণীশ বলে, সব জানি আপা! সব জানি। তুমি একটু সাবধান থেকো। অর্গানাইজড না হয়ে ভীমরুলের চাকে ঢিল মারা ঠিক নয়।
আপা নির্বিকার মুখে বলে, আমি কাউকে শক্ত বা প্রতিপক্ষ বলে ভাবি না কাকাবাবু। আমি এদের বোঝানোর চেষ্টা করি যে, ইচ্ছে করলেই হাসপাতাল অনেক পরিচ্ছন্ন রাখা যায়, রুগীদের অনেক আরাম দেওয়া সম্ভব। কিন্তু কেউ নিজেকে পাল্টাতে চায় না, যা হয়ে আসছে, যা চলে আসছে তার পরিবর্তন করতেও কেউ রাজি নয়। তারা বলে, এত রুগীর ভিড়, জায়গা নেই, ডাক্তার বা ওষুধের অভাব, মাইনে কম। সব সত্যি। তবু ওর মধ্যেই করা যায়। এদেশে কেউ তো যথাসাধ্য করে না। সবাই গা-ছাড়া ভাব। আমি তাদের উৎসাহ দিতে চেষ্টা করি মাত্র।
মণীশ মাথা নেড়ে বলে, তবু সাবধান থেকে আপা। টেক গার্ড।
আপা স্নিগ্ধ হেসে বলল, আমি একটা রোগা দুৰ্বল মেয়ে কাকাবাবু। আমাকে কজন মারবে? কবার মারবে? সবাই যে কেন আমাকে মারবে বলে হুমকি দেয় সেটাও বুঝি না। আমাদের হাসপাতালের একজন গুপ্তা ধরনের লোক আমাকে শাসাতে এসেছিল, আমি তাকে বললাম, আপনি আমার চেয়েও দুর্বল। কারা মারতে চায় জানেন? যাদের নিজেদের। সাফাই গাওয়ার মতো যুক্তি নেই, যারা ধরা পড়ার ভয়ে কাটা হয়ে আছে, যারা অসৎ এবং দুর্বল। লোকটা আমাকে চড় তুলেছিল। অন্যরা ধরে ফেলায় মারতে পারেনি।
ট্যাক্সি থামল বাইরে। হইহই করতে করতে ঘরে এসে ঢুকল বুকা। সঙ্গে সুটকেস-বিছানা আর দুজন বন্ধু। মুখে এক গাল হাসি।
মা! বাবা! মিট ভাস্কর অ্যান্ড পথিক। ওদের সময় নেই। আমাকে নামিয়ে ওরা একজন টালিগঞ্জ আর অন্যজন বেহালা যাবে। জাস্ট সে হ্যালো। ওঃ আপা! গ্রেট প্লেজার। হাই দিদি! হাই অনু!
বন্ধুরা খুব তাড়াহুড়ো করেই চলে গেল। তারপর বুবকা ছেলেমানুষের মতো জড়িয়ে ধরল মণীশকে।
কী হয়েছিল বাবা তোমার?
মণীশ বুকার মাথাটা কাঁধে চেপে ধরে বলল, কিছু নয়। আই অ্যাম ফাইটিং ফিট।
তুমি যদি এরকম আর করে তাহলে আমি পড়া ছেড়ে চলেই আসবো বলে দিচ্ছি।
