অপর্ণা একটু ধমকের গলায় বলে, আচ্ছা, কী আছে বলে তো ওসব জায়গায়? পাহাড় পর্বত আর প্রকৃতি তো? রাজ্যের লোক সেখানে গিয়ে জুটছে প্রত্যেক সিজনে। এমন কিছু রিমোট বা নতুন জায়গাও নয়। আমরা তো ঘুরে এসেছি একবার।
তখন বুবকা ছোট ছিল। ওর মনে নেই।
বড় হলে আবার যাবে। যদি ওর ইচ্ছে হয়।
মণীশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কথাটা তুমি বোধ হয় ঠিকই বলেছ। নির্জন, দুৰ্গম, অচেনা বলে আর কোনও জায়গাই থাকছে না। সর্বত্র পিলপিল করে লোক যাচ্ছে। এমন কি এভারেস্টে এত লোক উঠছে যে তাদের ফেলে আসা আবর্জনা আর কৌটো-বাউটোয় নাকি এভারেস্টই এখন আস্তাকুঁড় বলে স্বয়ং এডমন্ড হিলারি দুঃখ করেছেন। তা হলে এবারটা বাদ দিতে বলছ?
নিশ্চয়ই।
কাছেপিঠে কোথাও?
হ্যাঁ, গাড়ি করে একদিন দুদিনের জন্য বেরোতে পারি। তাও কাছেপিঠে। দূরে কোথাও নয়।
মণীশ একটু হাসল। বলল, তথাস্তু। তুমি হলে সুপ্রিম কোর্ট, তোমার ওপর তো কথা চলে না। কিন্তু তোমাকে বলি, এবারে কিন্তু আমার হার্টের প্রবলেম ছিল না। ডাক্তার তো বলেইছে পেটে গ্যাস জমে ওপর দিকে প্রেশার দিয়েছিল বলে ওরকম হয়েছিল।
হয়তো তাই। হয়তো নিশিপুরে যাতায়াতের ধকলটা তোমার সহ্য হয়নি।
মণীশ মাথা নেড়ে বলে, না না, তা নয়। নিশিপুর এমন কিছু দুর্গম জায়গা তো নয়।
বিচ্ছিরি জায়গা। খাড়া খাড়া পাড় বেয়ে নামা ওঠা, তার ওপর ভটবটির ডিজেলের গন্ধ, ভাটির সময় কাদা। মাগো। কি করে যে ওরকম জায়গা হেমাঙ্গ বেছেছিল ও-ই জানে!
শুনলে বেচারা দুঃখ পাবে।
পাক। ওর ঘাড় থেকে নিশিপুরের ভূত নামানো দরকার।
মণীশ হাসল, সবাই কি তোমার চোখ দিয়ে দুনিয়াটা দেখে? যার কাছে যা সুন্দর লাগে তা লাগতে দেওয়াই তো ভাল। কেন বেচারার নিশিপুর তুমি কেড়ে নিতে চাও?
কেন চাই? সে তুমি বুঝবে না। বলে অপৰ্ণা একটু মুখ টিপে হাসল।
বুকার যেদিন আসার কথা সেদিনই একটু বেলার দিকে এল আপা। তার তেমনই শীর্ণ চেহারা। তেমনই অমনোযোগী পোশক। তেমনই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখশ্ৰী। এসেই বলল, অনীশ এখনও আসেনি? আমাকে যে চিঠি দিয়েছিল আজ, শনিবার আসবে। আমি যেন অবশ্যই আসি।
মণীশের আজ ছুটির দিন। ছুটি না থাকলেও সে আজ ছুটি নিত। আজ বুবকা আসবে, আজ একটা বিশেষ দিন। সে হেসে বলল, বুবকা এসে যাবে আপা। তুমি ঘরে এসে বোসা। কতকাল পরে এলে! তোমার নতুন সব অ্যাডভেঞ্চারের কথা বলবে না আমায়?
আপা হতাশার সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল, আমার দ্বারা ডাক্তারি পড়া হবে না কাকাবাবু। আমি খুব হতাশ।
দেশের ভাবী প্রধানমন্ত্রীর মুখে হতাশার কথা শুনতে আমি রাজি নই আপা। এসো, তোমার প্রবলেমটা শুনি।
ওঃ, আমার যে কত সমস্যা কাকাবাবু। যেখানে যাই সেখানেই সমস্যা চোখে পড়ে। সবাই আমাকে কী বলে জানেন? বলে, আপা ইনভাইটস্ প্রবলেম।
ঘরে এসে আপা ডাইনিং টেবিলের পাশের চেয়ারে বসল। তাকে দেখতে রান্নাঘর থেকে অপর্ণা, অন্য দুই ঘর থেকে অনু আর ঝুমকি বেরিয়ে এল। সকলের কাছেই আপা এক কৌতূহলের বস্তু। সে যে কখন কী করে বসে তার তো ঠিক নেই।
বাতাসটা একটু খুঁকে নিয়ে আসা বলল, উঃ, আজ তো দারুণ সব রান্না হচ্ছে কিমা! নিশ্চয়ই ফ্ৰায়েড রাইস বা বিরিয়ানি! আর মুর্গি বোধ হয়।
অপর্ণা হেসে ফেলে বলে, তা হচ্ছে। বহুদিন বাদে বুবকা আসছে তো। তুমি আজ খেয়ে যাবে কিন্তু।
আপা একগাল হেসে বলে, আমার পাকস্থলী কতটুকু জানেন? একটা পিংপং বলের মতো ছোট। আমি তো একটুখানি খাই। তার ওপর আমরা কট্টর তামিল ব্রাহ্মণ, মাছ মাংস খাই না।
ওঃ, তাই তো? আমার মনে ছিল না। কিন্তু কোনও অসুবিধে নেই। নিরামিষ পদও অনেক হচ্ছে।
ঝুমকি বলল, আমি দোসা ইডলি সব বানাতে পারি। খাবে?
মাথা নেড়ে আপা বলে, ইডলি দোসা লাগবে না। আমরা কলকাতায় থাকতে থাকতে খাদ্যাভ্যাস অনেক পাল্টে ফেলেছি। সাদামাটা বাঙালি খাবারও চলবে।
খাদ্যাভ্যাস কথাটা শুনে মণীশ হাসল, তুমি এখনও সাধু বাংলায় কথা বলে। ফুড হ্যাবিট না বলে খাদ্যাভ্যাস বললে। ভাল লাগল।
ইংরিজিটা আমি সহজে বলি না। একটা দুটো বলে ফেললে কী করি জানেন? কটা ইংরজি বলেছি তা হিসেব করে রাতে শোওয়ার সময় ততবার নিজের কান মলে দিই।
সবাই খুব হাসল।
আপা ম্লান মুখে বলল, একটু আগেই কিন্তু বলেছি ইংরিজি।
কী বলেছ?
বলেছি, আপা ইনভাইটস্ প্রবলেম। দুবার কানমলা পাওনা হয়েছে।
হাসতে হাসতে মণীশের মনটা অনেকটা হালকা হয়ে গেল। বলল, তুমি ইম্পসিবল। কিন্তু প্রবলেমটা কি?
সমস্যা কি একটা কাকাবাবু? আর যত সমস্যা সব আমার এই পোড়া চোখেই পড়বে। ডাক্তারি পড়ছি তো, ডাক্তারির প্রথম কথাই হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা, জীবাণুমুক্ত পরিবেশ, শান্তি, নিস্তব্ধতা—না হলে রুগী ভাল থাকবে কি করে বলুন। আমাদের হাসপাতালগুলো তো আপনি জানেন।
মণীশ যেন শিউরে উঠে বলে, নরক। যখন প্রেস ফটোগ্রাফার ছিলাম তখন কলকাতার হাসপাতাল নিয়ে একটা ফটো-ফিচার করেছিলাম। বীভৎস।
সত্যিই তাই কাকাবাবু। টয়লেট থেকে শুরু করে বিছানাপত্র, খাবারদাবার সব কিছু এত খারাপ যে আমার মাথাটাই খারাপ হওয়ার জোগাড়।
অনু বলল, এই আপাদি, তুমি কিন্তু এইমাত্র টয়লেট বলেছ।
আপা হাসল, জানি। এই দেখ কড় গুনছি কটা হল। বলে সত্যিই আঙুল দেখাল আপা। কড়ে আঙুলের তিন নম্বর কড়ের ওপর বুড়ো আঙুলটা দেখে সবাই ফের হেসে খুন।
