নিমাই একটু অবাক হয়ে বলল, সবটা বানিয়ে?
বীণা একটু লজ্জা পেয়ে বলে, সে রকম ভাব নয়। ও হয়তো চেয়েছিল, আমি চাইনি।
সজলবাবু বেকার, আমি জানি। যদি বেকার না হতেন তা হলে কী করতে বীণা?
কী আবার করতাম। কিছুই করতাম না।
নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, মানুষটি জোচ্চোর নয়, ঠকবাজ নয়, মানুষটি ভালই। তোমার দুর্দিনে তোমার পাশেই থেকেছেন। শুনলাম তোমার জন্য মারধর খেয়ে হাসপাতালেও যেতে হয়েছিল। মানুষটিকে অমন তাচ্ছিল্য করছ কেন? ওটা ভাল নয়।
বীণা প্ৰতমত খেয়ে বলল, তাচ্ছিল্যও করছি না। তোমার ভুল ভেঙে দিচ্ছি। তুমি একটা কিছু ধরে নিয়েছ। সেটা যে সত্যি নয় তাই বলতে চাইছি।
চাকদহে বীণার নেমে যাওয়ার কথা। চাকদহ এসে গেল। বীণা হঠাৎ বলল, হ্যাঁ গো, আজ বনগাঁয়ে চলে না।
নিমাই অবাক হয়ে বলে, বনগাঁয়ে? কেন?
অনেকদিন বাদে চলে না আমার ঘটায়। দুজনে গল্প করব। সেই পুরনো দিনের মতো।
নিমাই হাসল। মাথা নেড়ে বলল, পাগল! আমার কত কাজ পড়ে আছে।
এক দিনে আর কীই বা ক্ষতি হবে? হলে হোক। একবারটি পুরনো দিনের মতো চলে না দুজনে একটু একসঙ্গে হই।
নিমাই মৃদু মৃদু হেসে বলল, এ রকম হয় না বীণা। এ রকম হতে নেই।
কেন নেই?
তোমার আর আমার পথ আলাদা হয়ে গেছে।
তুমি আমাকে একসময়ে কী ভীষণ ভালবাসতে! আজ তার কিছু অবশিষ্ট নেই!
সবটাই আছে। আমার মতো মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী তোমার কেউ নেই।
তা হলে?
তোমার ভাল চাই বলেই এই প্রস্তাবে রাজি হলাম না বীণা। সম্পর্ক কখনও এত তরল হওয়া ভাল নয়। এত অবিবেচকের মতো হওয়া উচিত নয়।
কেন ও কথা বলছ?
স্বামী আর স্ত্রী এ বড় কঠিন সম্পর্ক বীণা। অনেক পরীক্ষায় পাস করে তবে স্বামী-স্ত্রী। আমরা পাস করিনি যে!
কী যে বলল, বুঝতেই পারি না।
আবার দেখা হবে বীণা। তখন বুঝিয়ে বলব। তবে আমি যেমন বুঝি। তোমার হয়তো ভাল লাগবে না।
বীণা বনগাঁয়ের বাস ধরতে নেমে পড়ল। নেমে পড়েই হঠাৎ তার মনে হল, বিশ্বজোড়া খা-খা করছে একটা একাকিত্ব। কী সাঙ্ঘাতিক একা সে!
সন্ধের পর কুসুম এল।
বীণাদি, কেমন হল বাবার কাজ?
অন্যমনস্ক বীণা বলে, ভালই।
নিমাইদার সঙ্গে দেখা হল।
হ্যাঁ, একসঙ্গে চাকা পর্যন্ত এলাম।
সত্যি! ভাব হয়ে গেল বুঝি?
না রে।
বলো কি?
বীণা মাথা নাড়ল, তোর নিমাইদা আর সেই নিমাইদা নেই। পাত্তাই দিল না।
যাঃ।
বীণা চোখের জল চাপতে পারল না। একটু চুপ করে থেকে বলল, আজ সে শোধ নিচ্ছে।
নিমাইদা তেমন লোকই নয়।
সে খুব ভাল লোক কুসুম, আর আমি খুব খারাপ। এই তো! তোর দুনিয়াটা সহজ সাদা-কালোয় ভাগ করা। বেশ তাই-ই মানছি।
রাগ করলে নাকি? কী হয়েছে বলো না!
বীণা কিছু বলল না। চুপ করে রইল।
১১৩. মণীশের শরীর খারাপ হয়েছিল
মণীশের শরীর খারাপ হয়েছিল এ খবরটা বুবকাকে পাঠানো হয়েছিল খুব সতর্কতার সঙ্গে পুজোর ছুটির আগে। যাতে বুকার পড়াশোনার ক্ষতি না হয়। চিঠি পেয়েই বুবকা ট্রাংক কল করল এক সন্ধেবেলায়। সেই সরল বালকের মতো গলা এখনও।
বাবা কেমন আছে মা? আমাকে আগে কেন জানি।
ওরে, তেমন কিছু নয়। এখন ভাল আছে।
কেমন ভাল? হান্ড্রেড পারসেন্ট।
হ্যাঁ। অফিসে যাচ্ছে তত।
তোমাকে বলে দিচ্ছি মা, বাবার শরীর খারাপ হলেই আমাকে খবর দেবে। আমার পড়ার ক্ষতির কথা ভেবো না। ওসব আমি মেকআপ করে নেবো।
আমরা তো আছিই তোর বাবাকে ঘিরে। চিন্তা কিসের?
বাবার জন্য আমার ভীষণ টেনশন হয়। আচ্ছা মা, বাবা কি পিরমানেন্ট হার্ট পেশেন্ট হয়ে গেল?
না, তা কেন? সাবধানে থাকলে সেরে যাবে। ডাক্তার বলেছে ভয়ের কিছু নেই।
বাবা কি বাড়ি ফিরেছে?
না তো।
এত দেরি হয় কেন ফিরতে?
একটু বাদেই ফিরবে, রোজ যেমন ফেরে।
আমি আর তিন-চার দিনের মধ্যেই আসছি। কিপ হিম ফিট অ্যান্ড ফ্রেশ।
আচ্ছা রে আচ্ছা।
আধা ঘন্টা বাদে মণীশ ফিরল। স্মিতমুখে বুকার ফোন করার কথা শুনল। বলল, তোমার কী যে দুর্বদ্ধি অপু! কেন ওকে আমার অসুখের কথা জানাতে গেলে। ওর কত পড়ার চাপ বলো তো! আমার তো এমন কিছু হয়নি যে জানাতে হবে!
অপর্ণা অপ্রস্তুত হয়ে বলল, এমনিতে জানতাম না। কিন্তু পুজোয় তোমার সবাইকে নিয়ে কুলু-মানালি যাওয়ার কথা না? বুবকা হয়তো আশা নিয়ে আসবে, হয়তো বন্ধুদের কাছে গল্পও করবে। যাওয়াটা যে হচ্ছে না তা জানিয়ে দিলাম।
মণীশ অবাক হয়ে বলল, যাওয়া হচ্ছে না কে বলল? কেনই বা যাওয়া হবে না? যাওয়া-আসার রিজার্ভেশন কবে হয়ে গেছে।
অপর্ণা গম্ভীর হয়ে বলে, যাওয়া যে হচ্ছে না তার একটা খুব সহজ সরল কারণ আছে।
কি কারণ অপু?
আমি যেতে দিচ্ছি না।
মণীশ ব্যথিত মুখে বলে, কেন অপু? আমার তো কিছু হয়নি। ভাল আছি। ছেলেটা আশা করে আসবে। ছেলেটার কত খাটুনি যাচ্ছে, ওর একটু রিলিফ হত।
ওর বয়স পড়ে আছে। সারা দুনিয়া চষে বেড়াতে পারবে। কিন্তু তোমাকে আমি এই শরীরে কিছুতেই ঘরের বার হতে দেবো না।
মণীশ একটু হেসে বলে, এভাবে বাক্সে পুরে রাখতে চাও? সেটাই কি বেঁচে থাকা?
বেঁচে থাকো তো আগে, বেড়ানো অনেক হয়েছে। বেঁচে থাকলে আরও হবে। নিশিপুরের ধকলেই কেমন বিগড়ে গিয়েছিলে বলো তো। এখন দৌড়ঝাঁপ একদম বন্ধ।
খুব হতাশ করে দিলে ভাই। টিকিটগুলো কাটা ছিল। এই পুজোর বাজারে কনফার্মড টিকিট। তিন মাস আগে কেটে রেখেছিলাম।
কালকেই টিকিট ফেরত দাও।
করুণ মুখ করে মণীশ বলে, আর একবার ভেবে দেখ। আমি না হয় গিয়ে হোটলের ঘরেই বসে থাকব, তোমা ঘুরে বেড়িও।
