বিষ্টুপুরে যাবে?
বিষ্টুপুর! সেখানে তো অবস্থা দেখে এলে! আইয়ে ভাইয়ে বাড়ির দখল নিয়ে কুরুক্ষেত্র হচ্ছে। দাদা আমাকে বলে গেল, তারা বুড়ো বয়সে বিষ্টুপুরে এসে থাকার সাধ ছিল। এদের কাণ্ড দেখে সে ইচ্ছে চলে গেছে। কত বড় বাড়ি, দুখানা দালান, জায়গাও কত, তবু দোতলা একতলা নিয়ে মাথা কুটে মরছে দুজনে। মেজদা চিরকালই স্বার্থপর, বউটা তো আরও। ওখানে কে থাকতে যাবে বাবা?
তা হলে কী চাও? বীণা ঝামরে উঠে বলল, কী চাই তা জানি না।
রাগ করছ কেন? রাগের কথা বলিনি। তোমার ভালমন্দ দেখার দরকার হলে দেখব। আমার সাহায্য পাবে। আর যদি কারও সঙ্গে ঘর বাঁধে তখন তার ওপর দায়িত্ব বর্তাবে।
মেয়েরা কি নুনের পুঁটুলি? এর ওর কাঁধে ভর দেবো কেন?
নিমাই গম্ভীর মুখে চুপ করে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল, কী করতে চাও বীণা?
বীণা চুপ করে থাকে।
নিমাই ফের তার শান্ত গলায় বলে, ফের দল করতে চাও? সজলবাবু তো আমাকে সেরকমই বলে রেখেছিল। তুমি টাকা দিতে বারণ করেছ, ভাল কথা। কিন্তু যদি মত পাল্টাও, যদি সজলবাবুর সঙ্গে জোট বেঁধে দল করতে চাও তো আমাকে বোলো। আমার অত টাকা নেই বটে, কিন্তু কিছু দিতে পারব।
আমি দল করতে চাই না।
তা হলে কী করবে?
ভাবছি।
তা হলে ভাবো কিছুদিন। আমার সাহায্য দরকার হলে বোলে।
বীণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, বাবার শ্রাদ্ধে তুমি পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছ শুনলাম।
হুঁ।
কেন দিলে? ওদের তো দরকার ছিল না।
দরকারের কথা তো ভাবিনি।
কাজটা ঠিক করানি। দাদা তো খরচের কোনও কার্পণ্য করেনি। দেদার খরচ করেছে। সেজদার অবস্থাও এখন তাল। তুমি খামোখা কেন দিতে গেলে? এই জন্যই তোমাকে লোকে আহাম্মক ভাবে।
নিমাই মৃদু গলায় বলল, আহাম্মকই তো। জন্ম-আহাম্মক। তবে আমার বড় ইচ্ছে হয়েছিল ওই মানুষটার শেষ কাজে আমারও কিছু দেওয়া থাক। আহাম্মকি হয়ে থাকলে হোক, আমার মনটা তাতে ভালই লাগছে।
বীণা পাশ-চোখে নিমাইয়ের দিকে তাকাল। লোকটা কতটা আহাম্মক সে আজ বুঝতে পারছে না। সে আজ বুঝতে পারে না একজন আহাম্মক কি করে আজ এতটা হয়ে উঠতে পারল। বীণা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
শোনো, একটা কথা।
নিমাই ধীরে মুখ ফিরিয়ে বলল, বলো।
আমার একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দাও।
চাকরি আমি কোথায় পাবো?
তোমার তো অনেক চেনা।
তা আছে। তবে তারা কেউ চাকরি দেওয়ার মতো নয়।
তা হলে আমি কী নিয়ে বাঁচব?
কী নিয়ে বাঁচতে চাও? চাকরি তো বেঁচে থাকার কোনও কারণ নয়।
আমাকে তো কিছু একটা করতে হবে, নাকি?
সেটা তুমিই ভাল বুঝবে।
আমি এ রকম হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকব নাকি?
নিমাই একটু হাসল। বলল, আচ্ছা, ভেবে দেখব। তেমন কাউকে পেলে বলেও রাখব চাকরির কথা।
তোমারও তো হিসেব রাখার জন্য লোকের দরকার হয়। হয় না?
হয়। তবে আমার লোক আছে। আর যাই হোক, তোমাকে নিজের কর্মচারী বানানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
কেন, আমি তোমার কর্মচারী হলে ক্ষতি কী? সম্পর্কটা নতুন রকমের হবে। মালিক-কর্মচারীর।
বীণা হাসল, কিন্তু নিমাই হাসল না। বলল, সম্পর্কটার আর দরকার কি? তোমার যাতে গ্রাসাচ্ছাদনের কষ্টটা না হয় তা আমি দেখব বীণা।
সম্পর্কটা তুমি চাও না?
নিমাই চুপ করে জানালার বাইরে চেয়ে রইল।
বীণা তেতো গলায় বলল, তুমি ভাবো যে সজলের সঙ্গে আমি…?
নিমাই আস্তে করে মুখ ফেরাল। বলল, আর হয় না বীণা। আর হয় না।
কিছু হওয়াতে বলিনি। একটা চাকরির কথা বলেছি।
আমার চাকরি কেন করবে?
আচ্ছা বাবা, তোমার নয়, আর কারও চাকরি তো হতে পারে!
না, তাও পারে না। তোমার ক্ষমতা ছিল অভিনয়ের, তা ছাড়া আর কোনও কাজে তো তোমার অভিজ্ঞতা নেই। চাকরির বাজার খুব খারাপ বীণা। সহজে হয় না।
আমি যে পাগল হয়ে যাচ্ছি।
নিমাই তার দিকে ধীরে ফিরে তাকাল। তারপর বলল, কেন পাগল হচ্ছ বীণা? তোমার কষ্ট কিসের?
সে তুমি বুঝবে না। কোনওদিন আমার কষ্ট বুঝেছ?
ব্যথিত গলায় নিমাই বলে, বুঝেছি। তোমার কষ্ট নিজের চোখে দেখেছি। না বুঝে উপায় ছিল না।
তা হলে আজ বুঝছ না কেন? আমি যে মনে মনে ভিখিরি হয়ে গেছি, সেটা বুঝতে পারছ?
না, তা পারছি না। তোমার যাত্রার দলের কাজটা নেই, এটাই কি বড় কথা?
সেটাই বড় কথা। সেটা যে কত বড় কথা তা তুমি বুঝবে না।
নিমাই দুধারে মাথা নেড়ে বলল, না, আমি তা বুঝব না বীণা। আমার বুঝবার মতো মন নেই। তবে একটা কথা বুঝি। তুমি অভ্যাসের দাস হয়ে যাচ্ছ। যাত্রার দলের যে জীবন তার রকম আলাদা। বড় বারমুখী করে দেয় মানুষকে। ও রকম কি ভাল বীণা?
উপদেশ দিতে শুরু করলে নাকি?
না, তা কেন? উপদেশ নয়। ভেবে দেখতে বলি। শান্ত হও, মাথা ঠাণ্ডা করো, তারপর ভাবো।
মাথা ঠাণ্ডা থাকছে না। মাথা ঠাণ্ডা রাখাই কঠিন।
এত বড় একটা শোক পেলে, সেটাও তো একটা ক্রিয়া করবে!
শোক! ওঃ, তুমি বাবার কথা বলছ?
হ্যাঁ।
বীণা যেন একটু দ্বিধায় পড়ে গেল। তারপর বলল, হঠাৎ বাবার কথা তুললে কেন? বাবার মরার সঙ্গে আমার অবস্থার সম্পর্ক কী?
বলছিলাম, এ সময়টায় অত উত্তেজিত হতে নেই। শোক মানুষকে শান্ত সমাহিত আত্মমুখী করে দেয়। দেয় না?
আমি অতসব জানি না। বাপের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক কী ছিল বলো তো! আমার বাপু অত সেন্টিমেন্ট নেই।
তাই দেখছি।
বীণা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, শোনো, আমার সঙ্গে কিন্তু সজলের কোনও সম্পর্ক নেই। ও তোমাকে যা বলেছে বানিয়ে বলেছে।
