নিমাই একটু চুপ করে থেকে বলল, টাকাপয়সা কামাই করার কথা যদি বলো তা হলে বলতে হয়, সে রকম সা উনি করেননি। ভরসাটা ছিল সততার ওপর, ধর্মভয়ের ওপর। তার দাম দিয়ে থাকলে সেটাই কাজের কাজ হয়েছে। কত চোর ডাকাত পাজিরাও তো পয়স কামাই করে।
বীণা হঠাৎ বলল, তুমি কি সৎ থেকেই বড়লোক হয়েছে বলে।
নিমাই মৃদু হেসে বলে, একে বড়লোক বলে না। বড়লোকের রকম আলাদা। আসল বড়লোক তুমি দেখইনি। আমার একখানা হোটেল। ভগবানের দয়ায় চলে বলে রক্ষা। আর ধাবাটা কিন্তু আমার নয়। নিরঞ্জনবাবুর। উনিই টাকা ঢেলেছেন, আমার কিছু অংশ আছে। আমাকে বলে ওয়ার্কিং পার্টনার।
আর রিক্সা অটোরিক্সা?
দুটো রিক্সা আর একখানা অটোরিক্সা আমার আছে। তাও কেন জানো? মালপত্র আনা-নেওয়ার জন্য। বাকি সময়টা সওয়ারি টানে। আমার কোনও চুরিটুরির পয়সা নেই বীণা। তোমার বাবার বিশ্বাস বৃথা যায়নি এখনও। তবে আয়ু এখনও পড়ে আছে। যদি কখনও পা পিছলে যায় তখন এসে দুয়ো দিও।
তোমাকে দুয়ো দিলেই বুঝি আমার সুখ?
তা নয়। জানতে চাইছিলে তাই বললাম।
বীণা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, জেনে খুশিই হচ্ছি। আমার মতো তুমি নও। আমি তো পাপীতাপী মানুষ। চোরও।
কে জানে কেন নিমাই এ কথাটার প্রতিবাদ করল না। বাইরের দিকে চেয়ে রইল নীরবে।
খানিক বাদে বীণা বলল, টাকাটা তো তুমি কাকাকে ফেরত দিয়েই দিলে, তাতেও কি আমার পাপ কাটে না?
ফেরত তুমি দাওনি বীণা। তোমাকে বাঁচাতে সেই ডলার আর পাউন্ড আমি মেঝে খুঁড়ে বের করে ফেরত দিই।
কেন দিলে? কাকার কি ওতে অধিকার? কার টাকা কাকে ফেরত দিলে বলো তো! ওই ডলার আর পাউড বেচে কাকা মস্ত দল করেছে জানো? চিৎপুরে ঘর ভাড়া করা হয়ে গেছে। পড়তি একজন ফিলুস্টারকে অবধি নিয়েছে দলে। ওই টাকা তো চোরের ওপর বাটপাড়ি হল!
নিমাই ব্যথিত মুখে বলল, জানি। কিন্তু আমি কাজটা করেছি তোমাকে বাঁচাতে। কাউকে বিপদ থেকে রক্ষা করাটাই ধর্ম। কাকার দল তোমাকে মেরে ফেলত বীণা।
অত সোজা নয়। থানাপুলিস আছে। তুমি কাজটা ঠিক করোনি। ওই টাকাগুলো আজ আমার হাতে থাকলে আমিই একটা দল খুলে ফেলতে পারতাম। কাকার পরোয়া করতাম নাকি?
থানাপুলিস কাকে দেখাচ্ছ বীণা? কাকা যদি তোমাকে মারতে চাইত না হলে কি পারত না। ও সব মানুষ দু-দশটা খুন অনায়াসে করতে পারে। পুলিস কিছু করতে পারত না। তোমার অভিজ্ঞতা নেই বলে বলছ। ও টাকা তোমার ভোগে লাগত না। বেঘঘারে মারা পড়তে শুধু। তবে কথাটা তুমি ঠিকই বলেছ, পগার টাকা কাকার পাওনা হয় না। সে তোমারও হয় না। শুনেছি সেটা লাল সিং-এর টাকা। কিন্তু ওয়ারিশান খুঁজে বের করে তার হাতে টাকা তুলে দেওয়ার দায় তো আমার নয়। তোমার। আমি শুধু তোমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছি।
এটাকে কিরকম বাঁচা বলে বলো তো! আমি কি বেঁচে আছি নাকি? এর চেয়ে মরলে জ্বালা জুড়োত। ৪৬০
তুমি কিভাবে বাঁচবে, কিভাবে বাঁচতে চাও তা তোমাকেই ঠিক করে নিতে হবে। এখন জীবনটা তোমার একার। মরলে জ্বালা থাকে না ঠিকই, কিন্তু মরা তো আছেই। জীবন না চাইলে মরণকে আর ডেকে আনতে হবে না।
অত কাঠ-কাঠ কথা বলছ কেন? আমি তো আমার মতো করেই নিজের পথ করে নিচ্ছিলাম। তুমি এসে বাগড়া দিলে। মেঝে খুঁড়ে কোথায় টাকা আছে দেখিয়ে দিলে। দানি?
শোনো বীণা, টাকা যে ওখানেই আছে তা আমার জানার কথা নয়। ও টাকার হদিশ আমি পেয়েছিলাম হঠাৎ করে। তুমি বলোওনি। টাকাটা তোমার হেফাজত থেকে কোথায় গেল তা কাকা ভেবে পাচ্ছিল না। তারপর তার নজর পড়ল আমার দিকে। ভাবল, ও টাকা তুমি আমাকেই দিয়েছ ব্যবসা করতে। ওপরে লোকদেখানন ছাড়াছাড়ির অভিনয় করতে করতে আসল কাজ হাসিল করছি। আমার বদনাম হচ্ছিল।
বীণা একটু অবাক হয়ে বলে, এত কথা আমি জানতাম না তো!
জানার কথাও নয়। তুমি কাকার চোখে ধুলো দিতে ঘরে একটা ভুয়ো গর্ত খুঁড়ে রেখে বাপের বাড়ি পালিয়ে গিয়েছিলে। ওটা বড় ছেলেমানুষী হয়েছিল। ওভাবে কি পার পেতে। একদিন বনগাঁয়ে ফিরতেই হত। তখন কী হত বীণা?
আচ্ছা, তুমি কি আমাকে ঘেন্না করো?
হঠাৎ এ কথা কেন?
জিজ্ঞেস করছি। আমি তো চোর, পাপী, নটী। আমাকে কি আজকাল তোমার ঘেন্না হয়?
কম্বলের নোম বাছতে গেলে তত কম্বলই কাবার, ঘেন্না করাটা আমার আসে না। সে তুমি ভালই জানো।
জানতাম। কিন্তু আজকাল সন্দেহ হচ্ছে।
ঘেন্না করলে তোমার ভাত খেতাম নাকি? তোমার রোজগারে প্রতিপালন হয়েছি মা-বাপ সমেত। ঘেন্না করলে পারতুম?
তখন করতে না। এখন করো। আমি তো বলেইছি, আমার কাছে পাপপুণ্যের দাম নেই। বাঁচার জন্য আমাদের মতো মানুষকে সব করতে হয়। ভগবান বলে যদি কেউ থাকে তবে তিনি সেটা বুঝবেন। তিনিই জানেন মানুষ কেন কোন কাজ করে।
একটু হেসে নিমাই বলে, ভগবানের ওপর তোমার এত বিশ্বাস থাকলে করে যা খুশি। ওটাও একটা দর্শন হতে পারে। আমি অত জানি না, বুঝি না। আমার একটা বিশ্বাস আছে মাত্র, সেইটে নিয়ে চলি। সেটা ভুলও হতে পারে।
বীণা চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। প্রসঙ্গটা পাল্টানো দরকার। কোন কথা থেকে কোথায় গড়াল! না, সে নিমাইয়ের সঙ্গে তর্ক বা ঝগড়া করতে তো চায় না।
কিছুক্ষণ ভেবে হঠাৎ বীণা বলল, আমার আর বনগাঁয়ে পড়ে থাকার মানে হয় না।
নিমাই ধীর গলায় বলে, তবে পড়ে আছ কেন?
কোথায় যাবো বলো তো! কোন চুলোয়? থেকে থেকে ওখানেই একটা অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু ভাবি একা একা ওখানে পড়ে থেকে কী হচ্ছে আমার।
