আজ্ঞে হ্যাঁ। গতকাল বীণা বনগাঁ থেকে কাঁচরাপাড়ায় গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে খবরটা দিল বিকেলবেলায়। তখনই চলে এলাম।
তোমরা এখনও একসঙ্গে থাকে না। আজ্ঞে না। সম্পর্কটা সেরকম নয়।
কৃষ্ণজীবন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কোনও সম্পর্কই আর বেঁধে রাখতে পারছে না মানুষকে পরস্পরের সঙ্গে। এ বড় ভাগের সময় এল। বিষ্ণুপদ আর নয়নতারাদের আর পাওয়া যাবে না দুনিয়াতে। তারা হারিয়েই যাবে বুঝি।
একটু বেলায় শোরগোলটা উঠল। জামতলার দিকে তিনটে গলা উঠল সপ্তমে। বামাচরণ চেঁচাচ্ছিল, বিশ্বাস না হয় মাকে জিজ্ঞেস করে দেখ, দোতলাটা বাবা আমাকে দিয়ে গেছে কি না। দেখ জিজ্ঞেস করে। বাবা নিজের মুখে বলেছে আমি মরলে তুই দোতলাটা নিস।
বামার বউ গলা মিলিয়ে বলল, আমরা তো আর বলতে যাইনি। উনি নিজের মুখেই বলে গেছেন।
রামজীবন তেজের সঙ্গে বলল, দোতলা-ফোতলা ভুলে যাও। থাকতে হয় তো থাকতে পারে, কিন্তু দোতলা কেউ পাবে না। মা থাকবে যেমন আছে। বাবার সব জিনিস সাজিয়ে রাখা হবে ওখানে।
বামাচরণ বলল, কেন? এত বড় জায়গাটা ফাঁকা ফেলে রাখবি, এ কি গায়ের জোর নাকি? দোতলা আমার পাওয়ার কথা।
কৃষ্ণজীবনের কানে আঙুল দিতে ইচ্ছে করছিল। এরা তার শোকর দ্ৰব্য মনটাকে ছিন্নভিন্ন করে দেবে। সে গভীর স্বরে ডাল, পটল!
পটল দৌড়ে এল, বলো জ্যাঠা। চল তো, ঘুরে আসি।
পটলের সঙ্গে হাটে-মাঠে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়াল কৃষ্ণজীবন। মনটা ছিছিক্কারে ভরা। তার বউ ছেলে-মেয়ে ওই কদৰ্য ঝগড়ার সাক্ষী থাকছে। বিষিয়ে যাচ্ছে তারা। দূষিত হয়ে যাচ্ছে চারপাশ।
যখন ক্লান্ত কৃষ্ণজীবন ফিরল তখন ঝগড়া থেমেছে। কিন্তু এ হল বারুদের স্তুপের ওপর বসে থাকা। এই বাড়িঘর যতেক নির্মাণ এসব বাইরে থেকেই দেখতে ভাল। এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকে স্বার্থপরতা।
এ বাড়িটা তার বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে ইচ্ছে হল একবার।
সে ফিরে বারান্দার কোণে কুশাসনে চুপ করে বসে ছিল, এমন সময়ে রিয়া এসে সামনে দাঁড়াল, শুনছ?
বলো।
খুব চাপা গলায় রিয়া বলল, এখানে কি থাকা যাবে? ঝগড়া তো শুনলে!
শুনলাম।
কিরকম খারাপ খারাপ সব কথা বলছিল দুজন। বাড়ি করে দিয়ে তুমি আরও বিপদ করেছ।
কৃষ্ণজীবন চুপ করে থাকে।
চলো, চলে যাই। শ্রাদ্ধের সময় না হয় আসা যাবে। কী বলো?
কৃষ্ণজীবন আরও খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, তাই চলো! তোমরা তৈরি হয়ে নাও।
দুপুরের খাওয়াটা হোক। তারপর।
কৃষ্ণজীবন স্তিমিত গলায় বলল, আচ্ছা।
কলকাতার দিকে গাড়ি চালাতে চালাতে কৃষ্ণজীবন ভাবছিল, বিষ্টুপুরে তার কি আর ফিরে আসা হবে? এই ভাগের বাড়ি, তলায় তলায় আক্রোশ, বোজ ঝগড়া—এ সবের মধ্যে হারিয়ে যাবে তার ধ্যান, তার প্রজ্ঞার অনুভূতি। না, বিষ্টুপুর নয়। অন্য কোথা, অন্য কোনওখানে।
বর্ধমানের দিকে একটা খামারবাড়ি দেখে এসেছিল সে। লাগোয়া জমিই অনেকটা, চার বিঘের ওপর। প্রচুর গাছ আছে। বুড়ো মালিক বিক্রি করে দিতে চায়। এখনও কি আছে? থাকলে কিনে নেবে সে। মাঝে মাঝে তার যে পালানো দরকার। সভ্যতা থেকে, আত্মীয়তা থেকে, সম্পর্ক থেকে।
বাড়ি এসে গুম হয়ে রইল কৃষ্ণজীবন। গুটিয়ে গেল নিজের মধ্যে। আর এই গুম হওয়া ভাবটা অব্যাহত রইল বিষ্ণুপদর শ্রাদ্ধ অবধি। ন্যাড়া মাথায় ফিরে এল কলকাতায়।
তারপর একদিন অনুর ফোন, কতকাল দেখা হয় না বলুন তো! এখন কী নিয়ে ব্যস্ত আপনি বলডিং হেডের কাজ তো শেষ?
আমার বাবা চলে গেলেন।
সে তো জানি। স্যাড। আমার বাবারও খুব শরীর খারাপ হয়েছিল একদিন, জানেন। আমাদের এত ভয় হয়েছিল।
উনি এখন ভাল আছেন?
হ্যাঁ। কিন্তু কবে দেখা হবে বলুন তো! আবার তো ফুরু করে চলে যাবেন বিদেশে, না?
কৃষ্ণজীবন হাসে, হয়তো যাবে।
কবে? সামনের মাসে। বেলজিয়াম।
উঃ, পারেনও বটে আপনি ঘুরতে।
তুমি বেড়াতে ভালবাসো, না?
খুব বাসি।
আমি বেড়াতে যাই না, আমি যাই পৃথিবীটাকে বুঝতে। কত চেষ্টা করি, কিছুতেই আজও বুঝতে পারি না এ পৃথিবীটা কিরকম, এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কী?
আপনি আমাকে বুঝিয়ে দেবেন।
নিজে আগে বুঝি তবে তো!
শুনুন, একটা খবর আছে।
কি খবর?
হেমাঙ্গ অ্যান্ড দিদি। বলে হি হি করে সে অনু।
১১২. এইভাবেই দান উল্টে যায় পৃথিবীর
এরকমও হয়? এইভাবেই দান উল্টে যায় পৃথিবীর? একতাল কাদার মতো একটা মানুষ ছিল তার হাতে। বশংবদ, জোরে কথা কইতে জানত না, সর্বদা বিগলিত হয়ে থাকত। একটা জায়গায় শুধু শক্ত ছিল। ধৰ্মভয়। কিন্তু তবু তাকে ইচ্ছেমতো চালিয়েছে বীণা। ছিল অন্নদাস।
এখন সেই ছোট মানুষটা যে পাহাড় হয়ে দাঁড়াল। উঁচু, কঠিন, গায়ে আঁচড় বসানো যায় না।
শ্রাদ্ধের পর দিন একসঙ্গে ফিরছিল তারা। বাসে পাশাপাশি বসে। ঘটনাটা এমনি ঘটেনি। বীণা ঘটিয়েছিল। কেন ঘটাল? তার বড় ইচ্ছে হয়েছিল জানবার, নিমাইয়ের পরিবর্তন কতটা হল বা সত্যিই হল কিনা। তাই রওনা হওয়ার আগে সে গিয়ে বলল, তুমি যাচ্ছ? আমিও তো যাবো, একসঙ্গে গেলে হয় না?
নিমাই উদাস গলায় বলল, যাবে? তা কথা কি?
বসে পাশাপাশি খানিকক্ষণ নীরবে বসে থাকার পর বীণা বলল, তোমার খুব মন খারাপ, না।
নিমাই জানালার বাইরে চেয়ে ছিল। একবার মুখ ফিরিয়ে তাকে দেখে নিয়ে বলল, বড় উঁচু মানুষ ছিলেন। লোকে এ সব মানুষকে ঠিক বুঝতে পারে না।
বাবা তোমাকে খুব ভালবাসত। খুব ভরসা ছিল তোমার ওপর।
হুঁ।
বীণা আর এক ধাপ এগিয়ে বলল, বাবা যে তোমার ওপর ভরসা করত তুমিও তার দাম দিয়েছ। তাই না?
