কৃষ্ণজীবন তার বাবাকে প্রণাম করল।
হরিবোল, বিষ্ণুপদ কাঁধে উঠলেন। চললেন। রাত ভোর হওয়ার আগেই ছাই হয়ে গেলেন। পঞ্চভূতের শরীর নিয়ে নিল যে যার ভাগেরটা। যা রয়ে গেল তা স্মৃতি।
খালের নোংরা জলে স্নান করে যখন উঠে এল কৃষ্ণজীবন তখন তার বুক পাথরের মতো নিস্তব্ধ। যেন হৃৎপিণ্ডও থেমে গেছে। ব্রাহ্মমুহূর্তের বৈরাগ্যের রং চারদিকে। জীবন ও মৃত্যুর অর্থহীনতার মাঝখানে কী মহান এই পার্থিব জীবন। ক্ষণস্থায়ী, অথচ কত বর্ণময়।
সকালের আলো ফুটল। শ্মশানযাত্রীরা ফিরে এল নিঃশব্দ পদসঞ্চারে। বিধ্বস্ত, বিহ্বল বাড়িটায় আজ সকালে জাগরণের কোনও কোলাহল শোনা গেল না। খুব নিঝুম।
কৃষ্ণজীবন যখন ধড়া পরে বারান্দার প্রান্তে একটি কুশাসনে নিস্তব্ধ হয়ে বসেছিল তখন কোমল কচি দুখানা হাত পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল তার গলা, বাবা!
বড় চমকে ওঠে কৃষ্ণজীবন। কে?
খুব কেঁদেছো বাবা?
আয় দোলন।
দোলন পাশটিতে বসে বাবার মুখের দিকে চেয়ে থাকে।
কৃষ্ণজীবনের দুচোখ দিয়ে ফেঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়ে জল।
দোলন আর কিছু বলে না। শুধু চেয়ে থাকে। এ বাড়িটা কাদের সে বুঝতে পারে না। এরা কারা তাও তার কাছে স্পষ্ট নয়।
বাঁ পাশে কুয়োতলা, তারপর বাগান, সামনে উঠোন। কৃষ্ণজীবন তার বাবার পরিধি দেখছিল। গত কয়েক বছর বাবা এই বাড়ির চৌহদ্দির বাইরে বড় একটা যায়নি। যেখানে কৃষ্ণজীবন বসে আছে সেখানে ছিল একখানা দাওয়া। কৃষ্ণজীবন বাঁধিয়ে মোজেইক করে দিয়েছে। দাওয়ার এই প্রান্তটিতে বসে ঝুম হয়ে চেয়ে থাকত। কী দেখত বাবা? কী দেখত। অভাবক্লিষ্ট জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে এই দাওয়ায় বসে আকাশ-পাতাল ভাবত। ক্লকিনারা পেত না, থৈ পেত না এই জীবনের, এই পৃথিবীর। কৃষ্ণজীবন বিদেশে গেছে শুনলেই বাবা পটলের ভূগোলের বই আর ম্যাপ খুলে বসত। এই মস্ত পৃথিবীর কোন সুদূর প্রান্তে গেছে তার ছেলে তা অনুধাবন করত। হয়তোবা ছেলের চোখ দিয়েই দেখার চেষ্টা করত অচেনা বিদেশ। অজানা দেশ, অচিন দেশ কত কি দেখা হল না তার। বোঝ হল না এই জীবনের অর্থ।
বাবার সেই বিস্ময়ের উত্তরাধিকার আজ কোলে নিয়ে বসে আছে কৃষ্ণজীবন। মাথার ওপর ওই যে মহাশূন্য, এই চারদিকে পরিব্যাপ্ত বিশ্বজগৎ তার অর্থ কি কৃষ্ণজীবন জানে? এই যে মৃত্যু এসে নিয়ে গেল মানুষটাকে—এরই বা অৰ্থ কি? কোথায় যায়? নাকি… যায় না কোথাও?
দিনের আনোয় চেনা মুখগুলি ফুটে উঠল চারধারে। শোকস্যুপ্ত একটা বাড়ির উঠোনে, বারান্দায়, ঘরে সরস্বতী, বীণাপাণি, রামজীবন, বামাচরণ, নয়নতারা। বাচ্চা বউরা। বিষ্ণুপদ বিশ্বাস কি বেঁচে আছে এদের মধ্যে।
আম্রপল্পবটা মা যত্ন করে রেখে দিয়েছে বিছানার পাশে একটা ফুলদানিতে।
ওইটে ধরে বসে থাকত, বুঝলি? কেমন ধারা হয়ে গিয়েছিল।
জানি মা।
কী থেকে কী হয়ে গেল বাবা, বল তো! শেষ দিনটায় বয়সের হিসেব নিচ্ছিল। কেন নিচ্ছিল কে জানে!
মায়ের দিকে চেয়ে বিহ্বল হয়ে যায় কৃষ্ণজীবন। তার মা আর বাবা বিয়ের পর থেকে বোধ হয় একটি দিনও পরস্পরকে ছেড়ে থাকেনি। নিবিড় গভীর ছিল দুটি মানুষের সম্পর্ক। দুজনে মিলে নিঃশব্দে টানত সংসারের জোয়াল। কখনও মা আর বাবার ঝগড়া বা মতান্তর হয়নি। মা যে কী ভীষণ একা হয়ে গেল তা শুধু গভীরভাবে টের পায় কৃষ্ণজীবন। এই একাকিত্ব কি মা সহ্য করতে পারবে? মা হয়তো পারবে। সংসারের সঙ্গে জড়িয়ে-মুড়িয়ে, নাতিপুতি ছেলে-বউ নিয়ে হয়তো বা পারবে। কিন্তু বাবার বদলে মা যদি যেত তাহলে বাবা পারত না। আরও বোবা হয়ে যেত, অসহায় হয়ে যেত। পুরুষরা তো সংসার নিয়ে জড়িয়ে-মুড়িয়ে থাকতে পারে না।
কৃষ্ণজীবনের গভীর শোকাহত চেহারা দেখে দোলন আর নয়নতারা ছাড়া কেউই বড় একটা কাছে ঘেঁষছে না।
নয়নতারা শুয়েই আছে ওপরের ঘরে। মাঝে মাঝে নানা কথা সুরভুরি কাটছে। তারপর দীর্ঘ বিরতি, চোখ বোজা। সেই চোখের কোলে জমে যাচ্ছে পুকুর।
বাড়ির আর সবাই সামলে উঠেছে। বাচ্চারা একটু খেলছে-টেলছে উঠোনে, বাগানে, পাড়ার লোকেরা আসছে যাচ্ছে। জামতলায় গিয়ে বিড়ি টেনে এল বামাচরণ। সবই দেখতে পায় কৃষ্ণজীবন। কিছুই স্পর্শ করে না তাকে।
রিয়া একসময়ে এসে বলল, ছেলেমেয়েদের স্কুল কামাই হচ্ছে। দুটো-তিনটে দিন হলে ক্ষতি নেই। কিন্তু তার বেশি হলে মুশকিল। জানোই তো মোহিনীর ফাইন্যাল ইয়ার।
কৃষ্ণজীবন তার উদাস চোখ জোড়া রিয়ার চোখে স্থাপন করে বলে, যাবে? যাও তাহলে।
আজ শনিবার, না গেলেও চলবে। কিন্তু কাল গেলে ভাল হয়।
অস্ফুট গলায় কৃষ্ণজীবন বলে, যেও।
তারও কত গুরুতর কাজ পড়ে আছে কলকাতায়। কত মিটিং সেমিনারে নেমন্তন্ন অপেক্ষা করছে। কিন্তু কিছুই তার ভিতরে কোনও তাগিদ সৃষ্টি করছে না আর। সামনে এক শূন্যতা নিয়ে সে স্তব্ধ হয়ে গেছে বড়। বারবার বুঝতে চেষ্টা করছে উত্তরাধিকারের কথা। তার ভিতরে বাবা কতটুকু বেঁচে আছে।
কে একজন একটা কাটা ডাব হাতে নিয়ে সামনে এসে বলল, এটা খেয়ে নিন দাদা।
কৃষ্ণজীবন চেয়ে দেখল, নিমাই। ডাবটা হাতে নিয়ে সে বলল, কেমন আছ নিমাই?
ভালই।
নিমাই যে ভাল আছে তা তার পরিচ্ছন্ন ধুতি বা জামাতে নয়, প্রকাশ পাচ্ছে তার মুখেচোখে। উদ্ভ্রান্ত, তটস্থ, ভীতু সেই মুখখানায় অনেক আত্মস্থ একটা ভাব। দেখে ভাল লাগে। নিমাই চুপ করে বসে রইল সামনে। ৪৫৮
তুমি আর বীণা কি একসঙ্গে এলে নিমাই?
