কৃষ্ণজীবনের প্রতি বড় শ্ৰদ্ধা হল চয়নের। এ তো ভালবাসার সময় নয়। ভাত-কাপড়ের চেয়েও মানুষের অনেক বেশি অভাব এখন এই মহাৰ্ঘ ভালবাসার। ওই এক জায়গায় মানুষ এখন দেউলিয়া। এখন মানুষের ভালবাসার লগ্নি বড় ছোট। বউ আর বাচ্চাকে নিয়ে ছোট ফ্রেমে ভালবাসাকে বাঁধিয়ে নিয়েছে সে।
মোহিনী মুখ তুলে চয়নের দিকে চেয়ে বলল, চয়নদা, মাকে একটু খবর দেবেন? ওই লালরঙা ফোন-বইতে হৃদয়রঞ্জন দাসের নম্বর।
কৰ্ডলেস টেলিফোনটা পড়ে গিয়েছিল। এখনও ঠিক আছে কি? চয়ন ফোন তুলে কানে দিয়ে দেখল, ডায়ালটোন আছে। নম্ববটা বের করে নার্ভাস আঙুলে ডায়াল করল সে। মোহিনীর মাকে সহজেই পাওয়া গেল। বললেন, কী হয়েছে চয়ন?
আপনার শ্বশুরমশাই মারা গেছেন।
ওঃ! আচ্ছা আসছি। উনি কী করছেন?
উনি খুব ভেঙে পড়েছেন।
ভেঙে পড়েছে?
ভীষণ। সামলোনো যাচ্ছে না।
অত ভেঙে পড়ল কেন? শ্বশুরমশাইয়ের বয়স হয়েছিল তো।
আপনি আসুন।
মোহিনী তার বাবাকে দুটি কিশোরী-হাতে ঘিরে রেখেছে। তাড়িয়ে দিতে চাইছে যতেক শোকতাপ। পারছে না। কৃষ্ণজীবনের হেঁচকি উঠছে। তার মধ্যেই হাহাকার হয়ে বুক থেকে শ্বসবায়ু বেরিয়ে আসছে, বাবা!
এইভাবেই আরও আধ ঘণ্টা কাটবার পর রিয়া এলেন। মুখে চোখে থমথমে ভাব। কান্না নেই।
কৃষ্ণজীবনকে তেমনি ধরে আছে মোহিনী। তবে কৃষ্ণজীবন এখন সোফার পিছনে মাথাটা সম্পূৰ্ণ এলিয়ে চোখ বুজে আছেন। চোখ অবিরাম বর্ষণ করছে অধারা। কেঁপে কেঁপে উঠছে বুক। কত কালের জমা দীর্ঘশ্বাসসমূহ উপর্যুপরি বেরিয়ে আসছে বুক থেকে।
রিয়া দৃশ্যটা দেখল একটু থমকে দাঁড়িয়ে। তার পর হঠাৎ চয়নের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, এখন আমরা কী করব বলো তো!
চয়ন বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে বলল, আপনাদের একবার ওখানে যাওয়া দরকার। এখনই।
এখনই! কিন্তু এখনই কি করে?
কৃষ্ণজীবন দুটি অসহ্য রাঙা চোখ মেলে তাকায়। তারপর কান্নাভেজা গলায় বলে, তোমাদের যাওয়া দরকার নেই।
রিয়া কি সামান্য স্বস্তি বোধ করল? বলল, তুমি কি যাবে?
কৃষ্ণজীবন হঠাৎ যেন সচকিত হয়ে সোজা হলেন। তারপর দুহাতে ফের মুখ ঢেকে ফেললেন। অদ্ভুত চাপা একটা আর্তনাদ করে উঠলেন, মুখাগ্নি বোঝ। মুখাগ্নি? আমি তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্ৰ, শ্ৰদ্ধাধিকারী। বোঝে এসব? আমি না গেলে হবে এসব? হবে। বাবা বারান্দায় শুয়ে আছে আমার জন্য। প্রাণ নেই, তবু অপেক্ষা করছে। জানো এসব? মানো?
রিয়া কাছে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায়। কোমল কষ্ঠে বলে, ওরকম কোরো না গো! অত ভেঙে পড়তে নেই। আমি কি তোমাকে একা ছাড়ব ভেবেছ? আমরা সবাই যাবো। ওরা একটু তৈরি হয়ে নিক?
কৃষ্ণজীবন কিছুই বললেন না, আর একটা কান্নার ঘূর্ণিঝড় যেন অন্তস্তল থেকে উঠে এল তার। ভেসে যাচ্ছিলেন।
এইটুকু দেখে বিদায় নিল চয়ন। তার আর কিছু করার নেই। শোকেসন্তাপে চেনা কৃষ্ণজীবনের ভিতর থেকে যে আর একজন কৃষ্ণজীবন বেরিয়ে এলেন তাকে এতকাল চিনত না চয়ন। এ এক আশ্চর্য কৃষ্ণজীবন। ইনি গাছপালা, পশুপাখি ভালবাসেন এটা সে জানত। কিন্তু সেই ভালবাসার এই গভীর উন্মোচন আজ বড় লজ্জিত করে চয়নকে। এত ভালবাসা। মানুষটার। এতবৃদ্ধ গ্রাম্য সরল এক বাবার জন্য এই বিশ্বখ্যাত মানুষটার এত ভালবাসা, এত হাহাকার? কৃষ্ণজীবনের মতো মানুষকে দেখলেও বোধ হয় বহু জন্মের পাপ কাটে।
তুমি চালিও না, তুমি চালিও না, অ্যাকসিডেন্ট করবে। আমি ড্রাইভার ডাকছি। চারুশীলাদের একজন চব্বিশ ঘন্টার ড্রাইভার আছে।
দাঁতে দাঁত চেপে কৃষ্ণজীবন বলল, না, আমি পারব। আমাকে পারতেই হবে।
পিছনে তিন বিস্ময়াবিষ্ট ছেলেমেয়ে, সামনে রিয়া, কৃষ্ণজীবন গাড়ি ছাড়ল। তার চোখ আজ উষ্ণ প্রস্রবণের মতো ভেসে যাচ্ছে জলে। দীর্ঘশ্বাসে পাজর ভেঙে যাচ্ছে যেন।
এই তো সেদিন আমপল্লবটা বাংলাদেশ থেকে এনে দিয়েছিল সে। মুখে কী অপার্থিব হাসি ফুটেছিল বাবার? কী হল। তোমার বাবা? হঠাৎ কী হল? এইভাবে যেতে হয় বুঝি?
কিছুই কি দেখতে পাচ্ছে না সে? সব যেন আবছা। চোখের জলে পথের আলো নানা বিভ্ৰম ঘটাচ্ছে। কৃষ্ণজীবন তীব্র হর্ন দিয়ে দিয়ে চালাচ্ছে গাড়ি। বাইপাস ধরে উত্তর দিকে মুখ ঘুরিয়ে সে জোরে ছেড়ে দিল গাড়ি।
অত জোরে নয়, ওগো সাবধান!
কিছু হবে না। আমাকে কনসেনট্রেট করতে দাও। কথা বোলো না।
রিয়া কথা বলল না আর। মাঝে মাঝে রুমালে চোখ মুছে নেয় কৃষ্ণজীবন। গাড়ি চালাতে থাকে।
এরা কেউ জানে না, তাদের সম্পর্ক রচিত হয়েছিল অভাবে খিদেয়, অনেক সর্বনাশকে ঠেকিয়ে। বাবা তাকে পড়াত, চাষ করতে শেখাত। বাবা তাকে শিখিয়েছিল পৃথিবীকে ভালবাসতে। পিতা ধর্ম, পিতা স্বৰ্গ, পিতাহি পরমং তপঃ…
উড়ে গেল ভি আই পি, উড়ে গেল যশোর রোড। তার পর গায়ে যাওয়ার ভাঙা রাস্তা। গাড়ি লাফায়, টাল খায়, যায়। পিছনে ঘুমিয়ে পড়েছে দোলন, আর দুজন চিত্রাৰ্পিত বসে আছে। তারা জানে না কিভাবে শোক করতে হয়। তারা দাদুকে ভাল করে চেনেই না।
গ্রামবাসী অনেক জড়ো হয়েছে উঠোনে। রামজীবন দাদাকে দেখে দৌড়ে এসে কাটা কলাগাছের মধ্যে পড়ে গেল। পায়ের ওপর, দাদা রে!
নয়নতারার চোখে আর জল নেই। সারা দিন ভুল বকে, কেঁদে হাঁফিয়ে এই এখন বিষ্ণুপদর খাট আঁকড়ে ধরে পড়ে আছে নিঝুম হয়ে। তাকে কেউ সরাতে পারেনি। মাঝে মাঝে বলে উঠছে, কালঘড়ি দেখেছিল না! কালঘড়ি। তখনই জানতাম। তখনই জানতাম ফাকি দেবে।
বাবার শিয়রে এসে দাঁড়াল কৃষ্ণজীবন। অপলক চেয়ে রইল মুখের দিকে। বাবার গালে তিন-চার দিনের দাড়ি। মুখ বড় প্ৰশান্ত। চোখভরা ঘুম। একজন শান্ত, নিরীহ, নিপাট মানুষ। এই পৃথিবীর কারও সঙ্গে তাঁর কোনোেও বিবাদ ছিল না। ছিল না ঋণ, অভিযোগ, ক্ষোভ বা হিংসে। বাবার মুখের দিকে চেয়ে থাকে সেই গুণাবলীর উত্তরাধিকার আজ গ্রহণ করার চেষ্টা করছিল কৃষ্ণজীবন। এও জ্ঞান, এও বিদ্যা, এও দীনজনের মতো নতমস্তকে গ্রহণ করতে হয়।
