পুলিন দাদুর হয়ে গেল।
পুলিন! পুলিনের কী হল?
আজ টিউবওয়েল পাম্প করছিল সকালবেলায়। সেইখানেই স্ট্রোক।
বলিস কি?
বটতলা থেকে ডাক্তার এসে দেখে বলল, হয়ে গেছে।
দূর! কী যে বলিস। পুলিন বয়সে আমার ছোটো যে!
চলো দেখবে।
বিষ্ণুপদর হাতে পায়ে হঠাৎ একটা পররানি উঠল। ক্ষীণ গলায় সে ডাকল, নয়নতারা।
নয়নতারা পান-দোক্তা পাচ্ছিল দোতলার বারান্দায়। ডাকটা শুনতে পেল না। কানে একটু কম শোনে ইদানীং ও। পটল তার হেঁড়ে গলায় ডাক ছাড়ল, ও ঠাকুমা?
নয়নতারা মুখ বাড়িয়ে বলল, কী রে?
পুলিনদাদু মারা গেল সকালে। দাদুকে নিয়ে যাচ্ছি।
সর্বনাশ! বলিস কি?
বিষ্ণুপদ অসহায় মুখ করে বলল, আমার শরীরটা কেমন করছে। এসো তো!
নয়নতারা পক্ষিণীর মতো নেমে এল নিচে। বলল, কী হয়েছে তোমার?
একটু ধরা তো! ঘরে নিয়ে যাও।
পটল আর নয়নতারা বারান্দা অবধি আনতে পারল বিষ্ণুপদকে। বারান্দাতেই শুইয়ে দিতে হল। হাতে পায়ে কাঁপুনিটাই বড্ড বেশি।
ওরে, ডাক্তার ডেকে আন।
পটল গম্ভীর হয়ে বলল, ডাক্তারই তো পটল তুলেছে। বটতলা থেকে মিত্তিরকে ডেকে আনি ঠাকমা?
তাই যা দাদা। তাড়াতাড়ি যা।
পটল গেল।
কিন্তু বিষ্ণুপদ ততক্ষণে এগিয়ে পড়েছে অনেক। ধুলোপায়ে রাস্তা হাঁটছে। মাথার ওপর আলোভরা আকাশ, দুধারে ধানক্ষেত। লধার। তারপর গায়ের পথ। হাতে আম্রপল্পটা ধরা। যাক, বহুকাল বাদে দেশে ফেরা হচ্ছে তাহলে!
১১১. শোকের এমন প্রকাশ
শোকের এমন প্রকাশ বহুকাল দেখেনি চয়ন। এরকমও হয় নাকি আজকাল মা-বাপ মারা গেলে? শোকের প্রকাশ কত কমে গেছে মানুষের আত্মীয়তা জিনিসটাই হয়ে গেছে একটা ফিকে ধারণা মাত্র। মা-বাপ বুড়ো হলে সংসারের মস্ত বোঝ। তারা মরলে মানুষ আজকাল কাদেও না ভাল করে। কৃষ্ণজীবনের গভীর শোকাহত মুখটা তাকে গভীর আঘাত করল আজ। এ মুখখানা সে বোধ হয় আমৃত্যু ভুলতে পারবে না।
ঘটনাটা ঘটল, তার সামনেই এক বিকেলে। মোহিনীকে পড়াচ্ছিল চয়ন। কৃষ্ণজীবন ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে বাইরের ঘরে বসে জুতো ছাড়ছিলেন। ঠিক সেই সময়ে টেলিফোন বাজল। রিসিভার ধরলেন কৃষ্ণজীবন নিজেই। দুবার বললেন, হ্যালো। তারপর বললেন, আঁ! তার পরই কর্ডলেস টেলিফোনটা তাঁর স্মৃলিত হাত থেকে সশব্দে পড়ে গেল মেঝেয়।
কী হল? বলে উঠে দাঁড়াল মোহিনী। সঙ্গে সঙ্গে চয়নও।
পাশের ঘরে দৌড়ে গিয়েই মোহিনী চিৎকার করে উঠল, বাবা! ও বাবা! তোমার কী হয়েছে।
চয়ন একটু নাৰ্ভাস পায়ে গিয়ে পর্দা সরিয়ে দরজায় দাঁড়াল। টেলিফোনের টেবিলটার পাশে দাঁড়িয়ে কৃষ্ণজীবন। মুখখানা ছাইবৰ্ণ, চক্ষু স্থির এবং অস্বাভাবিক বিস্ফারিত, দুটো হাত মুঠো পাকাচ্ছে আর ধুলে যাচ্ছে। মোহিনী দুহাতে বাবাকে আঁকড়ে ধরে প্রাণপণে ঝাঁকুনি দিতে লাগল, বাবা! বাবা গো! ও বাবা! তোমার কী হল বাবা?
কৃষ্ণজীবন ধীরে ধীরে তার বিস্ফারিত চোখ বুজলেন এবং চোখ ভরা জল দাদর করে নেমে আসতে লাগল।
চয়ন ফোনটা কুড়িয়ে নিয়ে ক্ৰ্যাডলে রাখল। তারও হাত-পা কাঁপছিল নার্ভাসনেসে। এমন কীই বা ঘটতে পারে যাতে উনি এত ভেঙে পড়লেন? মোহিনীর মা তাঁর দুই ছেলেকে নিয়ে কোথাও গেছেন। বোধ হয় যোগব্যায়ামের ক্লাবে। সেরকমই আবছা জানা আছে চয়নের। একে সামলানোর জন্য এখন একজন শক্তসমর্থ লোক দরকার। সে বা মোহিনী কেউই সেই সামর্থ্য রাখে না।
সামলে গেলেন অবশ্য কৃষ্ণজীবন নিজেই। দুহাতে নিজের অরণ্যের মতো চুলের গোছা খামছে ধরে ছেলেমানুষের মতো প্রথম ফুঁপিয়ে, তারপর ড়ুকরে কেঁদে উঠলেন শক্তপোত কৃষ্ণজীবন। এই কান্নাটার দরকার ছিল। কাঁদতে কাঁদতে পিছু ফিরে একটু টলোমলো পায়ে হেঁটে সোফায় বসে পড়লেন। তারপর শ্বাসরোধকারী একটা শব্দ করতে করতে ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলতে লাগলেন, না…না…না…না…
মোহিনী পাশে গিয়ে বসল। বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, কাঁদে না বাবা, কাঁদে না, কী হয়েছে বাবা?
কৃষ্ণজীবনের এই শোক চয়নের কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা। শক্তসমর্থ, বিখ্যাত, প্রতিষ্ঠিত এবং বয়স্ক কৃষ্ণজীবন এত ভেঙে পড়তে পারেন তার ধারণা ছিল না। চয়নের ভয় হচ্ছিল যোগব্যায়ামের ক্লাসে গিয়ে দোলনের কিছু হল নাকি? সে জানে কৃষ্ণজীবন দোলনকে প্ৰাণাধিক ভালবাসেন।
প্রায় মিনিট দশেক কৃষ্ণজীবন ওরকমই বেহেড রইলেন। শুধু মোহিনী বাবাকে ছাড়ল না। ধীরে ধীরে যেন মায়ের। মতো-বাবার মাথাটা নিজের কাঁধে টেনে নিল, অবিকল মায়ের মতোই হাত বুলিয়ে দিতে লাগল মাথায় আর গালে, কাঁদে না বাবা, অত কাঁদে না। কী হয়েছে বলবে তো!
কৃষ্ণজীবন মেয়েকে আঁকড়ে ধরলেন হঠাৎ মুখ তুলে বললেন, এ কি হতে পারে বল তো! হতে পারে? বাবা নেই। বাবা কোথায় যাবে আমাকে ছেড়ে? কোথায়?
এ প্রশ্নের জবাব মোহিনী কি দিতে পারে? উচ্ছ্বসিত কান্নায় ভেসে গেছে মানুষটির যত জ্ঞান, যত অভিজ্ঞতা, শোক ভাসিয়ে নিয়ে গেছে গাম্ভীর্য ও ব্যক্তিত্ব, কৃষ্ণজীবন যেন এখন অসহায় শিশু।
চয়নের মা মারা গিয়েছিল। সে মৃত্যু যেন শোক বয়ে আনেনি, এনেছিল প্রার্থিত মুক্তি। মায়ের জরাজীর্ণ অস্তিত্বের বন্ধন যেন অষ্টপাশে বেঁধে রেখেছিল চয়নকে। মা মরে যাওয়ায় কি শোক হয়নি তার? হয়তো তাও হয়েছিল। তবে নানা অনিশ্চয়তায় দিশাহারা, এপিলেপসির প্রকোপ, দাদার মুখাপেক্ষিতা সব মিলিয়ে এমন জট পাকিয়ে গিয়েছিল যে, শোটাকে চিনতেই পারল না সে। এমন কি তার দাদা অয়নকেও কাঁদতে দেখেনি সে। গাম্ভীর্যের পোস্টার মুখে সেঁটে দাঁড়িয়েছিল শুধু।
