তা পেলাম। তবু পুরনোরা বেশি টানে। বাপ-দাদার ভিটে। পূর্বপুরুষদের বাস ছিল। ওর রকমটাই আলাদা। এই যে কৃষ্ণ একখানা গাছের ডাল হাতে করে এসেছে, কী বলব তোমাকে, সেই ডালখানাও যেন আমার সঙ্গে কত কথা কইল।
ওরকম হয়। তা বলে আমন চুপ মেরে যাও কেন? আমার যে ভয় করে।
ভয়! না, ভয়ের কি? পুরনো সব কথা মনে পড়ছিল। সামান্য সামান্য সব ঘটনা, তুচ্ছ সব কথা। তাই যেন মনটা রসস্থ হয়ে গেল।
তোমার বড় মায়া গো!
সেই জন্যেই তো দেহ ছাড়ে না।
বালাই ষাট। ওসব বলতে আছে?
কৃষ্ণকে দেশের বাড়ি দেখতে পাঠালাম। তা তার চোখ দিয়ে যেন আমারও দেখা। মনটা কিছু অস্থির হয়েছে তাই।
হ্যাঁ গো, তোমার যদি এতই মায়া। তবে ঘুরে এসো না একবার। আজকাল কত লোক তো যাচ্ছে।
না না, সে ব্যাপারই নয়।
কেন বল তো!
গিয়ে কত পরিবর্তন দেখতে পাবো। সে কি ভাল লাগবে? মনটা খারাপ হয়ে যাবে। আমাদের কোঠাবাড়ি ছিল না, এখন হয়েছে। ঘরদোর; গা সবই পাল্টে গেছে কত। ভাল লাগবে না। মন খারাপ হবে।
তাহলে বসে বসে ভাববে শুধু?
বিষ্ণুপদ একটু হাসল, ভাবতেই ভাল গো! ভাবনাও এক রকমের ওষুধ। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।
আমি যে কিছু ভাবি না, তাহলে আমার কী হবে? তুমিও ভাবো। তবে নিষ্কর্মর মতো নয়। তোমার আলাদা একটা রকম আছে, বাস্তববোধও আছে। আমার হল অলস
বিষ্ণুপদ কয়েকটা দিন ভেসে রইল মনের এরোপ্লেনে। মাটিতে পা দিল না। খুব রসস্থ মন, খুব আনমনা।
একদিন সকালে বিষ্ণুপদ নয়নতারাকে ডেকে বলল, আমার কত বয়স হলো বলো তো! হিসেব আছে?
তা কেন থাকবে না?
হিসেব করে দেখ তো বেশ করে।
হঠাৎ আবার বয়সের দরকার পড়ল কেন?
অনেককাল বয়সের কথা ভাবছি না। একটু হিসেব করা ভাল। কত হল?
বোধহয় ছিয়াত্তর সাতাত্তর।
উঁহু, বড্ড নামিয়ে ফেলছো। একটু ওপরে ওঠে।
অত চুলচেরা হিসেব কি আমরা পারি? দু-এক বছরের তফাত হতে পারে।
যতই কমাও, প্রকৃতির নিয়মে আমার বয়স আশি পেরিয়েছে।
ওম্মা গো! কী বলে রে ডাকাত! আশি! তোমার কি মাথা খারাপ নাকি?
আশি তো ছার, আমার হিসেবে বিরাশি।
কিছুতেই নয়, তোমাকে কি ভীমরতিতে ধরল, হ্যাঁ গা?
না। সে তোমাকেই ধরেছে।
তা আজ বয়স নিয়ে ঘাটাঘাটি কেন বাপু? জন্মদিন করবে নাকি?
এক গাল হেসে বিষ্ণুপদ বলে, তা করলে হয়। সেবার-কবে যেন— আমার জন্য রেমো একটা কেক এনেছিল। এসে বলল, বাবা, জন্মদিনে সাহেবরা কেক খায় শুনেছি। তাই আনলাম। শুনে হেসে বাঁচি না। জন্মদিন কবে তারই ঠিক নেই, উনি কেক এনে হাজির।তবে জিনিসটা ছিল বেশ ভাল। এখনও মুখে স্বাদটা লেগে আছে। তা লাগাও একটা জন্মদিন। তারিখটা যখন মনে নেই তখন যে কোনও দিন লাগালেই হয়।
নয়নতারাও হাসছিল। বলল, অত সোজা নয়। শাশুড়ি ঠাকরুনের কাছ থেকে আমি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করেছি। তোমার জন্ম কার্তিকে।
তাই বুঝি? সেজন্যই এমন পাথরচাপা কপাল।
কেন, কার্তিকে জন্মানো বুঝি খারাপ?
লোকে বলে, কার্তিকে রবি নীচস্থ থাকে। এ মাসের জাতকের উন্নতি করা খুব কষ্ট। তবে হলে ধীরে ধীরে হয়।
কপাল তোমার মোটেই খারাপ নয়। কষ্ট ছিল, কিন্তু আমাদের মতো বর-বউতে এমন ভাব খুঁজে বের করো তো! পাবো। আর এক জোড়া?
তা ঠিক।
আজকাল বর-বউয়ের ঝগড়ায় বাড়িতে কাক-চিল বসতে পারে না। আমাদের কোনওদিন ঝগড়া হয়েছে বলো?
বিষ্ণুপদ মিটমিটি হেসে বলল, সে একখানা বিশ্বরেকর্ডই বটে। জীবনে একবারটিও ঝগড়া করলে না। করলেও পারতে। তাতে একটু ঝাল-নুনের কাজ হত জীবনটায়।
কেন, ঝগড়া করিনি বলে কি আপুনি লেগেছে তোমার?
বিষ্ণুপদর হাসতে হাসতে চোখে জল এল। বলল, না গো ঠাট্টা করলাম। তুমি কি তেমন মেয়ে? কত কষ্ট দিয়েছি। ভাত-কাপড়ের, কত খাঁটিয়েছি সংসারে, একবারটি নালিশ করেনি।
কেন করব নালিশ? যার কাছে নালিশ করব সে কিছু কম কষ্ট করেছে? তোমার কষ্ট দেখে নিজের কষ্টের কথা ভুলেই যেতাম।
সেই জন্যই তো তুমি রমণীরত্ন।
ও আবার কী? অত প্রশংসা করতে হয় না।
প্রশংসা করলে কী হয়?
লোকে বলবে বউয়ের আঁচলধরা।
তাহলে সেঁচিয়েই বলতে হয় কথাটা। লোকে নিন্দে করুক, তাতে আমার আনন্দই হবে।
ও গো! কী মানুষ তুমি গো?
বিষ্ণুপদ হাসতে হাসতে বলল, যাঃ, এক ধাক্কায় আমার বয়সটা বোধহয় সত্যিই কমিয়ে দিলে!
বয়স আবার কিভাবে কমল?
আনন্দে কমে, ফুর্তিতে কমে। তোমার কথায় আজ খুব আনন্দ হচ্ছে আমার। ওই ছিয়াত্তর সাতারই থাক।
অতও হয়তো নয়। আমাদের মোটা হিসেব। দু-চার বছর কমই হবে হয়তো। হ্যাঁ গো, কেক খেতে ইচ্ছে হয়েছে নাকি?
আনাবে?
তা আনাতে পারি। রোমমাকে বলে দেবোখন।
বিষ্ণুপদ ঘুরে ফিরে গিয়ে আম্রপল্লবটা দেখে। শুকিয়ে আসছে। তা হোক। ওটার গায়ে যেন পুব বাংলার আকাশ, বাতাস, মাটির রস, গন্ধ, গাঁয়ের ধুলো সব লেগে আছে। আপল্পবটা হাতে নিয়ে মাঝে মাঝে বসে থাকে বিষ্ণুপদ। নয়নতারাকে বলে, হ্যাঁ গো, এটা পুঁতলে কি গাছ হবে?
তাই কখনও হয়! তুমি তো আমার চেয়ে চাষবাস কম বোঝ না।
তা বটে। কলমের গাছ করলে হত। বলে দিলে কৃষ্ণ সেই বাড়ি থেকে একটা গাছের চারাও আনতে পারত।
ওগো, অত পুরনো আমল আঁকড়ে থাকতে নেই।
জানি। মনটা বড় উচাটন।
বিষ্ণুপদ সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে এই আশ্চর্য নির্মাণ দেখে। ভাঙা ঘর সোপার্ট করে রাজপ্রাসাদ উঠল। দুনিয়াতে এরকমই সব হয় কাণ্ডকারখানা।
ও দাদু! বলে পটল হুড়মুড় করে সাইকেল নিয়ে এসে ঢুকল।
কি রে?
চলো।
কোথায় যাবো?
