রজব আলিকে আনোয়ার বোঝাচ্ছিল, ইনি একজন মস্ত মানুষ। চারদিকে নাম। দেশ-বিদেশের পণ্ডিতেরা চেনেন। মোটাসোটা কেতাব লেখেন।
রজব আলি এ সব শুনে যেন বিগলিত হয়ে যায়। নিজের ছেলেরা সবাই ক্ষেতখামারে কাজ করছে। তাদের ডেকে দেখাতে পারল না বলে দুঃখ করে বলল, আবার আসেন একবার। সারাদিন থাকবেন।
ফেরার সময় কৃষ্ণজীবন উঠোনের বাইরে একটা ঝুপসি আমগাছের নীচে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল, এটা কি পুরনো গাছ?
জী। আপনার বাপ-দাদার আমলের বুড়ো গাছ।
একটা ছোট পল্লব ভেঙে নেবো?
রজব আলি শশব্যাস্তে বলল, নিশ্চয়ই। দাঁড়ান। আমি পেড়ে দিই।
আমিই নিচ্ছি।
একটা পাতাসমেত ছোট ডাল গাছ থেকে ভেঙে নিল সে। এটার চেয়ে মহাৰ্ঘ উপহার বাবার জন্য আর ভাবতে পারে না সে।
দুদিন বাদে ঢাকা থেকে কলকাতায় ফিরল সে। তারও দুদিন বাদে বিষ্টুপুর।
বিষ্ণুপদ হাঁ করে অবিশ্বাসের চোখে চেয়ে সব শুনল। তার যেন বিশ্বাস হচ্ছে না যে, গ্রামটা এখনও আছে, বাড়িটা আছে। বারবার তাকে স্পর্শ করল হাত বাড়িয়ে। বলল, সব দেখলি, অ্যাঁ! সব দেখলি?
হ্যাঁ বাবা, সব।
বল, আরও বল, সব শুনি।
বাবাকে কুদাচিৎ এত উত্তেজিত দেখেছে কৃষ্ণজীবন। একটা মানুষের কত টান থাকে তার পূর্বপুরুষের ভিটের ওপূর! অথচ সেখানে কীই বা ছিল আলাদা রকমের? কাঁচা বাড়ি, পুকুর, গাছপালা। কিন্তু ওভাবে তো দেখে না মানুষ। তার স্মৃতি, তার মায়া, তার পক্ষপাতই অন্য একটা মাত্রা যোগ করে দেয়। তখন আর সাধারণ একটা বাড়ি সাধারণ থাকে না। হয়ে যায় রূপকথার মতো অলৌকিক।
উঠোনের বাইরের দিকে একটা আমগাছ ছিল বাবা, মনে আছে?
হ্যাঁ, হ্যাঁ। মধুকুলকুলি আমি। আছে সেটা?
আছে। তার একটা পল্লব এনেছি আপনার জন্য।
সংগ্রহে পল্লবটা হাতে নিয়ে মাথায় ঠেকায় বিষ্ণুপদ। কয়েকদিনে পল্লবটা একটু শুকিয়ে গেছে। বিষ্ণুপদ তবু অবাক চোখে পল্লবটার দিকে চেয়ে থাকে। যেন অবিশ্বাস্য কিছু দেখছে।
যারা আছে তারা কেমন লোক?
গরিব সাধারণ লোক। আদর-যত্ন করতে চেয়েছিল। সময় ছিল না।
করমচা গাছটা?
আছে।
ঘরগুলো বোধহয় ভেঙে। আবার করেছে! না?
বোধহয়। তবে পরিবর্তন খুব একটা হয়নি শুনলাম।
বিষ্ণুপদ হাঁ করে শুনছে। স্মৃতিতে নতুন করে ঢেউ লাগছে। মন চলেছে উজানে। দুখানা স্বপ্নাতুর চোখ বিষ্টপুর ছেড়ে কোথায় কোন গহীন অতীতের অন্ধকার ভেদ করার চেষ্টা করছে।
নয়নতারাও সব শুনল। কিন্তু অত ভাবাবেগ নিয়ে নয়। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ভাল করেছিস গিয়ে।
বাবাকে খুশি করতে পেরেছি, এইটেই যথেষ্ট।
নয়নতারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, মানুষটা তেমন কিছু বলে না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে দেশের কথা খুব ভাবে। কেন ভাবে কে জানে বাবা! আমি তো অত ভাবি না। দেশে যে কোন সুখটা ছিল! সেখানেও অভাবের সংসার, এখানেও অভাবের সংসার।
কৃষ্ণজীবন মৃদু হেসে বলে, তোমার হল প্র্যাকটিক্যাল চোখ। বাবার তো তা নয়। বাবা অন্য চোখ দিয়ে দেখে। দেশে থাকতেও কচু-ঘেচুই খেয়েছে। তবু বলে, ওঃ, দেশে যা খেয়েছিলাম সেরকম আর হয় না। ওটা একটা মায়া।
হ্যাঁ বাবা, তোর বাবার মতো করে আমি দুনিয়াকে দেখি না কখনও।
কৃষ্ণজীবন সারাদিন ধরে বাবাকে ঘুরে ফিরে দেখল। বিষ্ণুপদ বড় নিঃকুম হয়ে আছে আজ! কথা নেই। স্মৃতির তাড়নায় আজ বিষ্ণুপদ অনেক তফাত হয়েছে।
নয়নতারা একবার বলল, বড় ভয় লাগছে। বাবা। ও যে মুখে একদম কুলুপ এঁটেছে।
কৃষ্ণজীবন বলল, আজ আর বাবাকে ঘাটিও না মা। আপনমনে থাকতে দাও। আজ বড় পিছুটান।
আমপল্লবটা সেই যে ধরে বসে আছে, একবারও ছাড়েনি।
পরদিন আম্রপল্লবটা ঠাকুরের সামনে রেখে বিষ্ণুপদ একসময়ে স্নান করল, ভাত খেল। খেতে বসে নয়নতারাকে বলল, কোঠাবাড়িতে থাকতে ইচ্ছে যায় না।
ও মা! কেন গো?
জুত পাই না। টিনের ঘর, মাটির ভিত সেই যেন ভাল ছিল।
তোমাকে নিয়ে আর পারি না। কৃষ্ণ এত পয়সা খরচ করে রাজার বাড়ি বানিয়ে দিল, তোমার তবু সয় না কেন?
আমার আর্ষ নেই গো। আমি বড্ড মাটির মানুষ যে!
তা জানি। বাবুগিরি তোমার কোনও কালে ছিল না। মোটা কাপড়, মোটা ভাত, এ সবই পছন্দ। তা জীবনে আরও তো নানারকম আছে। একটু চেখে দেখতে হয়।
চোখেই তো বলছি, এ আমার পোষাচ্ছে না।
হরি বলে মন। এখন কি আবার দালান ভেঙে পুরনো ঘর খাড়া করতে বলব নাকি কৃষ্ণকে?
বিষ্ণুপদ একটু হাসল। বলল, খুব ফুট কাটতে শিখেছো দেখছি। না, ওটার দরকার নেই। বললাম আর কি। তোমাকে ছাড়া আর কাকেই বা বলি!
আমাকেই তো বলে আর সেই জন্যই তো তোমার জন্য আমার কষ্টটাও বেশি।
আচ্ছা বলো তো, তোমার দেশে ফিরতে ইচ্ছে করে না?
সত্যি কথা বলতে কি, তুমি যেখানে থাকো সেটাই আমার দেশ। আমি আর অন্য দেশ নিয়ে ভাবি না। দেশ বলতে আমার হচ্ছে জন।
বিষ্টুপুর একটু হাসল, শোনো কথা! জন বলতে কি শুধু মানুষ, শুধু আত্মীয়? আর কিছু নয়?
আর কি?
গাছপালা, ঘরবাড়ি, মাটিটা পুকুরটা সবটাই তো জন।
তুমি বললে তাই।
আমাকে এসবও বলে দিতে হবে, তবে তুমি বুঝবে?
আমার বাপু অত মাথায় খেলে না। তুমি বোঝালে বুঝি।
বিষ্ণু পদ ভাতের গরাস নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, বুঝলে হয়তো বুঝবে। তোমার মন বড় পরিষ্কার। কী জানো, এই চার ধারে যা কিছু আছে সবই যেন মানুষ। গাছটা,, ঘরটা সবই যেন বড় আপনার জন্য। দেশের বাড়িতে তাদেরই তো রেখে এসেছি কিনা!
এখানে এসে যে আবার নতুন করে সবাইকে পেলে। গাছ, মাটি, ঘর।
