ওখানে ডাক্তার নেই, না?
না। ওখানে কিছু নেই। কিছু নেই। ডাক্তার না, নার্সিংহোম না, অ্যাম্বুলেন্স না, গাড়ি না।
তা হলে কারও অসুখ করলে কী করে লোকেরা?
ভটভটিতে চাপিয়ে শহরে আনে। যদি না আনা যায় তা হলে ভগবানকে ডাকে।
তোমার বাবা লাকি। তুমি রাগ করে চলে এসে ভালই করেছে।
আপনি সেই জন্য আপসেট?
না।
তা হলে?
হেমাঙ্গ একটু হাসল।
দিদিকে বাইরে নিয়ে গিয়ে কী বললেন?
বললাম তোমাদের কিছু খাওয়া উচিত।
মাত্র এই কথা?
হেমাঙ্গ হাসল, আর কী বলব?
অনু চুপ করে রইল।
কী ভাবছো অনু?
আপনার ভীষণ ইগো।
তাই বুঝি?
অথচ আপনি ভীষণ ভালও তো!
ভাল?
হ্যাঁ, ভাল।
কে জানে কী!
আমি জানি আপনি ভীষণ ভাল। যদিও ইউ আর নট মাই টাইপ অফ এ যান। তবু আপনি আপনার মতো করে ভীষণ ভাল।
তোমার ফেভারিট টাইপ কেমন?
স্মার্ট, প্র্যাক্টিক্যাল, ড্যাশিং। ওই যে, ডাক্তার ভট্টাচাৰ্য আসছে।
সুদৰ্শন ডাক্তারটি এসেই ঝুমকিকে ডেকে নিয়ে গেল। হেমাঙ্গর অন্তরাত্মা বলে উঠল, যেও নাকো অই যুবকের
কাচের দরজাটা ঠেলে ওরা ভিতরে চলে গেল। খনিক দূর দেখা গেল ওদের। তারপর চোখের আড়ালে।
হেমাঙ্গ হতাশায় কেমন স্থবির হয়ে যাচ্ছে এখন। তার মনে হচ্ছে সে একটা ভুল করছে। এখনই তার যা করা উচিত তা সে করছে না। বয়ে যাচ্ছে একটা জরুরি সময়। এর পর দেরি হয়ে যাবে।
অনু বলল, আজ আপনি সত্যিই খুব রেস্টলেস। তাই না?
হেমাঙ্গ স্তিমিত গলায় বলল, মানুষ তো ঘটনাবলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
কিন্তু কী হয়েছে?
কথাটার জবাব দেওয়ার আগেই ঝুমকিকে দেখা গেল, ফিরে আসছে।
বাবাকে দেখে এলাম মা!
অপর্ণা চমকে উঠে বলল, কী দেখলি?
ব্যথাটা কমেছে একটু।
কথা বলল?
ডাক্তার বলতে দিল না। বাবা আমার হাতটা একটু ধরল।
কিছু বলল না?
একটু হাসল।
এখন আমরা কী করব?
ডাক্তারবাবু বলল, ভয় নেই। আপনারা বাড়ি চলে যান। অনেকগুলো টেস্ট করা হচ্ছে। কাল-পরশুর মধ্যেই অবস্থাটা বোঝা যাবে। হয়তো সিরিয়াস কিছু নয়।
বলল?
হ্যাঁ তো।
ঠিক শুনেছিস?
হ্যাঁ মা। চলো আমরা বাড়ি যাই।
ঝুমকিদের বাড়িতে নয়, চারুশীলা তাদের নিয়ে এল নিজের বাড়িতে। বলল, তোমাদের তো আজ রান্নাই হয়নি, বাড়ি গিয়ে রোধে খেতে হবে। আমার বাড়িতে সব অ্যারেঞ্জমেন্ট করা আছে, চলো।
বিপর্যন্ত, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত একটি পরিবার জড়ো হল চারুশীলার বাড়িতে। আজ কারও মন ভাল নেই। হেমাঙ্গ চুপ করে ওদের পাশাপাশি বসে রইল সোফায়। একজোড়া চোখ তাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। তার চোখও ছয়ে আসছে। ওকে। মাঝে মাঝে আটকে যাচ্ছে চোখে চোখ। হেমাঙ্গর ভিতরে একটা জ্বালা। ওই ডাক্তারকে সে ভুলতে পারছে না।
তিন দিন বাদে ছাড়া পেল মণীশ। জানা গেছে তার হার্টে কিছু হয়নি, পেটে গ্যাস জমে চাপ ধরেছিল বুকে। আপাতত ভয় নেই।
১১০. বাংলাদেশে যাওয়ার আগে
বাংলাদেশে যাওয়ার আগে বিষ্ণুপদ বলে দিয়েছিল, পূর্বপুরুষের ভিটোটা একটু দেখে আসিস বাবা। আমার তো আর যাওয়া হবে না। তুই দেখে এলেই আমারও এক রকম দেখাই হবে।
ঢাকায় নেমে নানা কনফারেন্সে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল কৃষ্ণজীবন। তারপর একদিন বাংলাদেশেরই একটি অমায়িক ছেলে আনোয়ার তাকে একখানা টিয়োটা গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে গেল তার গায়ে। যেতে যেতে বলল, কিছু চিনতে পারবেন না। সব পাল্টে গেছে।
কৃষ্ণজীবন হেসে বলল, চিনিব কি? আমার তো কিছু মনেই নেই।
দুবার ফেরী পেরিয়ে বেশ একটু ধকলের পর যখন গায়ে পৌঁছালো কৃষ্ণজীবন তখন দুপুর। সেই খাড়া শারদীয় রোদে সে দেখল, কিছু আহামারি গ্রাম নয়। একটু ছন্নছাড়া। ক্ষেতে ফসল আছে। গাছপালা বিশেষ রকমের সতেজ।
আনোয়ার দু-চারজনকে জিজ্ঞেস করে একটা বাড়ি খুঁজে বের করল। বলল, দাদা, এইটেই আপনাদের বাড়ি ছিল।
কৃষ্ণজীবন নির্বিকার চোখে চারখানা টিনের ঘর আর একটা কোঠাবাড়ি আর উঠোন সমেত বাড়িটা নিরীক্ষণ করল। এই তাদের বাড়ি। এ বাড়ির স্মৃতিমেদুর মায়ায় বিষ্টুপুরে এক বৃদ্ধ নৃত্যুজ হয়ে বসে থাকে আজও। কৃষ্ণজীবন পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। সামনে আনোয়ার।
খবর পেয়ে বাড়ির মালিক বেরিয়ে এল। মধ্যবয়স্ক একজন রোগা মানুষ।
আসেন, আসেন। বলে নিয়ে গেল ভিতরে। কোঠাবাড়ির বারান্দায় চেয়ার পেতে দিল। বসাল।
দেখতে আসছেন? দেখেন, ভাল করে দেখেন।
কৃষ্ণজীবন একটু হেসে বলল, এ বাড়ি কি হাতবদল হয়েছে, নাকি আপনারাই প্রথম থেকে আছেন?
বিশ্বাসবাবুদের কাছ থেকে আমার আব্ববাজান কিনেছিলেন। তারপর থেকে আমরাই আছি। এই কোঠাবাড়িটা ছিল না, আর ওই পশ্চিমের ঘরটা নতুন করে করা হয়েছে।
একটা পুকুর ছিল বলে শুনেছি। আছে?
আছে। এই কোঠাবাড়ির পিছনে।
একটা করমচা গাছ ছিল।
আছে।
এরা সম্পন্ন গৃহস্থ নয়। আবার একেবারে হা-ভাত জে-ভাতও নয়। এদের যা অবস্থা তার চেয়ে ভাল অবস্থা কি তাদের ছিল? মনে হয় না।
লোকটার নাম রজব আলি। মুখে হাসি লেগেই আছে। বলল, আজ এইখানেই দাওয়াত হোক। নিজের বাড়ি দেখতে এলেন, ছাড়ছি না।
কৃষ্ণজীবন মাথা নেড়ে বলল, উপায় নেই সাহেব! আমাকে এখনই ফিরতে হবে।
আনোয়ারও ঘড়ি দেখে বলল, আর পনেরো মিনিটের মধ্যে রওনা না হলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট রাখা যাবে না।
পনেরো মিনিটের মধ্যেই বাড়িটা ঘুরে দেখল কৃষ্ণজীবন। গায়ের বাড়ি যেমন হয় তেমনি। কোনও আলাদা বৈশিষ্ট্য নেই। এ বাড়িতে তাদের চার পুরুষের বাস ছিল। কিন্তু সেই ইতিহাস তো খুঁজে পাওয়া যাবে না কোথাও। শুধু স্মৃতি, শুধু মায়া নিয়ে অপেক্ষা করে থাকে তার বাবা। দেশ বলতেই ভিজে যায় মন।
