আগে কে দেখাত?
সে আর একজন। এখন বিদেশে আছেন।
ওঃ। বলে চুপ করে রইল হেমাঙ্গ। ঝুমকি তার দিকে তাকাচ্ছে না। একটু তফাতে অনু আর চারুদির সঙ্গে কথা বলছে। বলুক। হেমাঙ্গর বুকটা তৃপ্তিতে ভরা। ঝুমকি আজ সাদা খোলের শাড়ি পরেছে।
হেমাঙ্গ আলগাভাবে প্রশ্ন করল, ইনটেনসিভ কেয়ারে নিয়ে গেছে নাকি?
অপর্ণা বলল, আমরা তা জানি না। আমাদের তো ভেতরে যেতেই দেয়নি।
জ্ঞান ছিল?
ছিল। কী হবে বলুন তো! আমার ছেলে খড়পুর হোস্টেলে। তাকে কি খবর দেওয়া দরকার?
না, এখনই নয়। আমরা তো আছি। দেখা যাক। তেমন দরকার হলে আমি আই আই টি-তে ফোন করে দেবো। ভাববেন না।
রাশভারী বড় ডাক্তাররা রুগীর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে বেশি মাখামাখি করে না। কিন্তু এ ডাক্তারটি তেমন রাশভারী নয়। ছিপছিপে, লম্বা, দারুণ ফর্সা এবং অতিশয় সুদৰ্শন ডাক্তারটি খুব স্মার্ট ভঙ্গিতে একটা কাচের দরজা ঠেলে লবিতে ঢুকে সোজা ঝুমকির সামনে চলে এল।
ওয়েল, আপনারা এখন আর থেকে কী করবেন? আমি ওঁকে ভর্তি করে নিয়েছি।
ঝুমকি তার দুখানা অপরূপ চোখ তুলে ডাক্তারের চোখের দিকে চেয়ে বলল, বাবা কেমন আছে?
ডাক্তার একটু হেসে বলল, এখনই বলতে পারছি না। তবে ই সি জি-টা একটু গোলমেলে।
অবস্থা কি খুব খারাপ?
কাল সকালে বলব। চিন্তা করবেন না। ম্যাসিভ অ্যাটাক নয়। ট্রিটমেন্ট শুরু হয়েছে।
কথা বলতে বলতে দুজনে কাচের দরজাটার দিকে হেঁটে গেল পাশাপাশি। হেমাঙ্গর অন্তরাত্মা বলে উঠল, কী কথা তাহার সাথে? তার সাথে?
অপর্ণা কিছু একটা বলছিল। হেমাঙ্গ বুঝতে পারছিল না।
অপর্ণা ফের বলল, বড্ড বাচ্চা না ডাক্তারটি?
হেমাঙ্গ বলল, হ্যাঁ। আমি বড় ডাক্তার আজই ডেকে আনিব।
না না, তার দরকার নেই এখনই। এও নাকি খুব বড় ডাক্তার।
কাচের দরজার পাশে দুজন মুখোমুখি দাঁড়ানো। ডাক্তারটি মিটমিটি হেসে কী যে বলছে! ঝুমকি অতি উন্মুখ হয়ে চেয়ে আছে কেন?
অপর্ণা ফেরা কী একটা বলল।
হেমাঙ্গ খুব অবাক হয়ে বলল, অ্যাঁ।
অপর্ণা ফের বলল।
হেমাঙ্গ আর চেষ্টা করল না বুঝতে। সে আর বুঝতে পারবেও না।
চারুশীলাও তাকে কিছু বলল।
হেমাঙ্গ ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে চেয়ে রইল। কিছুক্ষণ।
ফের অপর্ণাও কিছু বলল।
হেমাঙ্গ হাল ছেড়ে দিয়ে সামনের সোফাটায় বসে পড়ল ধাপ করে। রুমালে মুখ মুছতে লাগল। সে স্বাভাবিক নেই। কেমন একটা জ্বালাপোড়া হচ্ছে বুকে।
পূর্ণ তার পাশেই এসে বসল। বলল, আপনি নিজেকে পিন্টি ভাবছেন না তো!
গিল্টি!
মানে আপনার ওখান থেকে ফিরেই তো হল! ওটা কিন্তু কারণ নয়। ওর তো একবার হয়ে গেছে। আপনাকে ভীষণ আপসেট দেখাচ্ছে।
নুজুর রাশ শক্ত হাতে ধরার একটা চেষ্টা করে হেমাঙ্গ। বলল, ইটস এ সান্ড কেস। অতটা জার্নি করা বোধহয় উচিত হয়নি।
জার্নি তো এমন কিছু নয়। শুধু দুবার একটু চড়াই ভাঙতে হয়েছিল ঘাটে উঠতে গিয়ে।
হয়তো সেটাই কারণ।
তাতেই বা আপনার দায়িত্ব কি বলুন!
হেমাঙ্গ চুপ করে রইল। ডাক্তারটি এত কথা বলছে কেন ঝুমকির সঙ্গে? এত কথা কিসের?
নিশ্চয়ই ব্যাচেলর, না? বলেই হেমাঙ্গ তাকিয়ে দেখল তিনজন মহিলা তার দিকে বিস্ময়ভরা চোখে চেয়ে আছে। এত লজ্জা পেল সে যে উঠে একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসতে হল।
ফিরে এসে দেখল, ঝুমকি সোফায় মাথা নিচু করে মায়ের পাশে বসা।
অস্থির হেমাঙ্গ আবার বেরিয়ে এল। ফের ঢুকল। তারপর হঠাৎ বলল, ঝুমকি!
ঝুমকি তার দুখানা চোখ সমেত বিষণ্ণ মুখখানা তুলল। নীরব।
একটু এদিকে আসবেন? কথা আছে।
ঝুমকি ধীরে উঠল। এগিয়ে এল।
বলুন।
সরি। ভেরি সরি।
ঝুমকি যে অনেক কেঁদোছে তা তার মুখ দেখলেই বোঝা যায়। দুখানা টানা চোখ এখনও টলটল করছে। মৃদু স্বরে বলল, কী যে হয়ে গেল। হঠাৎ!
আমার খুব খারাপ লাগছে।
জানি। আপনি নিজেকে রেসপনসিবল ভাবছেন।
আমি তো খানিকটা রেসপনসিবলই।
না। তা কেন?
হেমাঙ্গ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ডাক্তার কী বলল?
ঝুমকি মাথা নেড়ে বলল, তেমন কিছু নয়।
অনেক কথা হচ্ছিল। আপনার সঙ্গে।
হ্যাঁ। উনি অনেকগুলো কেস হিস্ট্রির কথা বলছিলেন।
কেস হিস্ট্রি?
হ্যাঁ। এই সব ক্ষৈত্রে কি কি হতে পারে? বলছিলেন ই সি জি রিপোর্ট তেমন খারাপ কিছু নয়। তবে জোর করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
ওঃ। আচ্ছা, আপনাদের বোধহয় আজ খাওয়া হয়নি!
খাওয়া! না, সে সব আমাদের মনেই নেই। চারুমাসি একবার বলেছিল। কিন্তু আমাদের কি এখন খাওয়ার সময়?
হেমাঙ্গ বলল, কিন্তু উইকি হয়ে পড়বেন যে!
বাবার একটু ভাল খবর না পেলে খাবো কি করে? গলা দিয়ে নামবেই না।
তাই কি হয়? এরকম করতে নেই। আমি ওদের বুঝিয়ে বলছি।
গমনোদ্যত হেমাঙ্গর পথ আটকাল ঝুমকি, প্লিজ! কেউ কিছু খেতে পারবে না এখন। ডাক্তার এখনই আসবে খবর দিতে। আমাদের অপেক্ষা করতে বলে গেছে।
খবর! বলে হেমাঙ্গ ঝুমকির দিকে চেয়ে চোখ নামিয়ে নিল।
আবার লবিতে এসে বসল। তারা। চারজন মহিলা একসঙ্গে। একটু তফাতে হেমাঙ্গ। সে চুপ করে চোখ বুজে বসা। মাথার পিছনে জড়ো করা দুটো হাত। মন অস্থির। মাথা পাগল পাগল।
পাশে কেউ এসে বসল। একটা পারফিউমের গন্ধ।
হেমাঙ্গদা!
হেমাঙ্গ চোখ খুলল। অনু।
আপনার কী হয়েছে? এত আপসেট কেন?
ও কিছু নয়।
ভীষণ আপসেট। আমাদের চেয়েও বেশি।
হেমাঙ্গ একটু হাসল।
আই অ্যাম ভেরি সরি। মাই অ্যাপোলজি।
কেন বলো তো!
পরশু আমি আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি।
হেমাঙ্গ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ভালই করেছিলে। তোমার বাবার হার্ট অ্যাটাকটা নিশিপুরে হলে কী বিপদ হত বলো তো!
