তা হলে অন্য দিক দিয়ে বলুন, আমার সম্পর্কে আপনার মনোভাব কিরকম?
ঝুমকি চুপ।
বলবেন না?
ঝুমকি খুব ক্ষীণগলায় বলে, বলে কী লাভ?
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে।
আপনি ভাল থাকুন। ছাড়ছি।
না, প্লিজ!
ঝুমকি ফোন ছাড়ল না। ধরে রইল। ফোন ধরে রইল হেমাঙ্গও। কেউ আর কোনও কথা বলতে পারছিল না। কিন্তু টের পাচ্ছিল দুজনেই ফোন ধরে আছে।
পাঁচ মিনিট পর হেমাঙ্গ বলল, আমার কথা আসছে না।
ঝুমকি মৃদুতম স্বরে বলল, আমি কী করব?
আপনি আমাকে একটু গাইড করতে পারেন তো, নাকি?
ঝুমকি চুপ।
হেমাঙ্গ একটু ধৈর্য হারিয়ে বলল, আপনি কিছু পারেন না।
কী পারতে হবে তাই তো বলেননি।
আচ্ছ, কাল একবার দেখা হতে পারে?
কোথায়?
কোথাও।
পারে! কিন্তু কোথায় দেখা হবে না জানলে যাবো কি করে?
আপনি বিকেল তিনটের সময়ে আপনাদের বাড়ির কাছে ন নম্বর বাস টার্মিনাসে থাকতে পারবেন? পারব।
কিছু মনে করলেন না তো! মনে করার মতো কিছু তো নয়। আপনি কি সাদা রং পছন্দ করেন?
সাদা?
হ্যাঁ। সাদা খোলের শাড়ি?
ঝুমকি একটু হাসল, কেন?
এমনি।
আপনি পছন্দ করেন? হ্যাঁ। সাদা রঙে মেয়েদের এত মানায়!
তাই বুঝি?
কিছু মনে করলেন না তো!
না।
বিরক্ত করলাম। ছাড়ছি।
ঝুমকি ক্ষীণ গলায় বলল, আচ্ছা।
ফোনটা রেখে দেওয়ার পর কৃতকর্মের অনুশোচনায় তার মন ভরে গেল। এ কী করল সে! ঝুমকিকে কাল সে কেন ডাকল? কী বলবে? অস্থির হেমাঙ্গ কিছুক্ষণ ঘরের মধ্যেই পায়চারি করল। তারপর ধীর পায়ে উঠে এল ছাদে। চাঁদ নেই। এক বুড়ি তারা কলকাতার স্নান আকাশে ছড়িয়ে রয়েছে বিশৃঙ্খলভাবে।
১০৯. বডন স্ট্রিটের বাড়িতে
সকালেই হেমাঙ্গ হাজির হল বডন স্ট্রিটের বাড়িতে।
মা।
ছেলের দিকে তাকিয়ে মা একটু অবাক হয়ে বলে, এ কি, আজ অফিসে যাসনি?
না। আজ তোমার হাতের রান্না খেতে এলাম।
ও আবার কোন দিশি কথা! আমি আজকাল রাধি নাকি! রাধে তো ঠাকুর। কী খেতে চাস?
হেমাঙ্গ বুঝতে পারল না, কেন সে বিডন স্ট্রিটে এল। মায়ের হাতের রান্না? একেবারেই নয়। তার আজ খাওয়ার কোনও ইচ্ছেই হচ্ছে না। তবু কিছুক্ষণ মায়ের সঙ্গে আবোল-তাবোল কথা বলল সে। আবোল-তাবোলই। কারণ বেশির ভাগ সময়েই সে বুঝতে পারল না সে কী বলছে। দুপুরে খাওয়ার পরই সে বেরিয়ে পড়ল গাড়ি নিয়ে। আজ গাড়ি চালানো তার উচিত হচ্ছে না। সে সম্পূর্ণ অন্যমনস্কভাবে চালাচ্ছে। কিছু দেখছে না, কিছু শুনতে পাচ্ছে না। গাড়ি চালিয়ে নিচ্ছে তার রিফ্লেক্স।
গোলপার্কের কাছাকাছি। যখন সে পৌঁছলো তখন দুটোও বাজেনি। সাদার্ন অ্যাভেনিউ ধরে অনেকটা গিয়ে সে ফিরে এল। আবার গেল। কিছুক্ষণ লেকের ভিতর দিয়ে চালোল। তারপর ঘুরে এল গোলপার্কের কাছে। মাত্র আড়াইটে। সময় এত ধীরে যায়? গাড়ি নিয়ে ফের ঘুরপাক খেল সে। অনেকক্ষণ। তবু তিনটের ঘরে কিছুতে পৌঁছাচ্ছে না ঘড়ির কাটা। তাজ্জব ব্যাপার!
ন নম্বর বাস টার্মিনাসের কাছেই গাড়ি পার্ক করে বসে থাকে সে। ঝুমকি কোন রাস্তা দিয়ে আসবে তা সে জানে। পূর্ণ দাস রোডের দিকে পলকহীন চোখে চেয়ে থাকল। সে।
ঘড়ির কাঁটা তিনটে পেরিয়ে গেল।
কেউই এল না। গাড়ি থেকে নেমে অনেকবার গোটা বাস টার্মিনাল চষে ফেলল সে।
সাড়ে তিনটে নাগাদ সে ফোন করল ঝুমকির বাড়িতে। কেউ ফোন ধরল না।
চারটের পর সে চারুশীলার বাড়িতে ঢুকল। কেমন মাতালের মতো লাগছে নিজেকে। এটা প্রত্যাখ্যান কি না তা সে বুঝতে পারছে না। তার অপমানিত বোধ করা উচিত কি না তাও না।
চারুশীলা বাড়িতে নেই। বাড়ির প্রকাণ্ড লিভিংরুমে একটা গভীর সোফায় ড়ুবে থেকে চোখ বুজে ঘটনাগুলিকে পরস্পরায় সাজাতে ব্যর্থ চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ। হল না। চোখ বুজে এল ক্লান্তিতে। কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়ল টেরও পেল न्त्रों।
চারুশীলাই ডেকে তুলল তাকে, কি রে? শরীর খারাপ নাকি?
হাসবার একটা চেষ্টা করে হেমাঙ্গ বলল, কোথায় গিয়েছিলি? বসে আছি কতক্ষণ!
গিয়েছিলাম নার্সিংহোমে। এখনই আবার যেতে হবে।
কেন? কার অসুখ?
মণীশবাবুর। হার্ট অ্যাটাক।
মণীশবাবুর! বলে হাঁ করে থাকে হেমাঙ্গ।
তোর ওখান থেকে ফিরেই নাকি বুকে ব্যথার কথা বলছিলেন, আজ সকালে নার্সিংহোমে রিমুভ করতে বলে ডাক্তার! ঝুমকি ফোন করেছিল, গাড়ি নিয়ে গিয়ে পৌঁছে দিয়ে এলাম।
হেমাঙ্গ বলল, ওঃ।
আমি তো লাঞ্চ করতেই পারিনি। ভীষণ খিদে পাওয়ায় বাড়িতে এসেছি। এখনই যাবো। তুই যাবি?
হেমাঙ্গ উঠে পড়ল। বলল, যাবো।
মুখে চোখে জল-টল দে, ততক্ষণে আমি লাইট কিছু খেয়ে নিই।
একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে হেমাঙ্গ। ঠিক বুঝতে পারছে না, এ সব অদ্ভুত ঘটনা অদ্ভুত সমযে ঘটছে কেন। এ সব ঘটনা কি কোনও ইঙ্গিত?
বিশাল নার্সিংহোমের রিসেপশনে শুকনো মুখে তিনজন বসে আছে। অপর্ণা, ঝুমকি আর অনু। হেমাঙ্গর বুকে চলকে উঠল কয়েক কোষ বাড়তি রক্ত। ঝুমকির পরনে কালো টেম্পল পাড়ের সাদা খোলের শাড়ি।
তাদের দেখে তিনজনই উঠে দাঁড়াল। অপর্ণা একটু এগিয়ে এসে হেমাঙ্গর দিকে চেয়ে বলল, দেখুন তো কী কাণ্ড!
কিভাবে হল?
পরশু তো আমরা ফিরে এলাম। সন্ধে থেকেই বলছিল, বুকে একটা পেইন হচ্ছে। খুব অ্যাকিউট নয়। কাল ছুটি ছিল, সারাদিন রেস্ট নিল। আজ সকালে অসহ্য ব্যথা।
ডাক্তার কী বলছে?
আমাদের ভেঙে কিছু বলছে না। মুখটা গম্ভীর।
ডাক্তারটি কে?
কে একজন ভট্টাচার্য। বড্ড কম বয়স। কেমন যেন ভরসা হয় না, অত বাচ্চা ডাকার কি পারবে? তবে অনেক নাকি
