অনুকে ঘণ্টাখানেক বাদে ঘরের পিছনকার বাগানে গিয়ে একা পেয়ে গেল হেমাঙ্গ।
অনু, আই অ্যাম সরি।
অনুঘাসের ওপর হাঁটু মুড়ে চুপ করে বসেছিল। মুখখানা গভীর, চোখ দূরের দিকে। জবাব দিল না।
হেমাঙ্গর সাহস হচ্ছিল না। ওর পাশে গিয়ে বসতে। একটু পিছনে দূরত্ব রেখে বসে সে নরম গলায় বলল, ওঁরা তোমার ভয়ে আজই ফিরে যেতে চাইছেন। কেন যে আমাকে তুমি এত অপমান করছা!
অনু মুখ না ফিরিয়ে বলল, আমার দিদি খুব বোকা। তাই তাকে অপমান করাও খুব সোজা।
ঝুমকিকে আমি একটুও অপমান করিনি। তুমি জানো না বোকা মেয়ে, ঝুমকি আমাকে কিরকম হিপনোটাইজ করে ফেলেছে। কিন্তু আমি তো বিয়ে করব না। কখনও। সেই জন্য আমি ওর কাছ থেকে দূরে থাকতে চাই।
সেই কথাটা আমার দিদিরও জানা দরকার। দিদি হয়তো এতটা জানে না। আজই গিয়ে দিদিকে বলব শী ইজ ইন পারসুট অফ এ ওয়াইল্ড গুজ।
হেমাঙ্গ হঠাৎ সামান্য রেগে গেল। চাপা গলায় বলল, তুমি কেন আমাদের মধ্যে আসছ বলো তো! আমাদের ব্যাপারটা আমাদেরই সেটল করতে দাও না কেন?
আমি আমার দিদিকে ভীষণ ভালবাসি। শী ইজ এ ভেরি সিম্পল টাইপ গার্ল। ও হয়তো আপনার ফিলজফিটা বুঝতেই পারেনি। আই মাস্ট কশান হার।
হেমাঙ্গ আর কথা খুঁজে পেল না। চুপ করে রইল।
দুপুরে খাওয়ার পর একটু বেলা থাকতে থাকতেই ফিরে গেল ওরা। মণীশ যাওযার সময় গম্ভীর মুখে বিষণ্ণ গলায় বলল, ডোন্ট মাইন্ড। এর পর যদি কখনও আসি একা আসব। তখন থাকব। ইউ আর এ নাইস ম্যান।
ওরা চলে যাওয়ার পর এত ফাঁকা লাগল হেমাঙ্গর যে সে সহ্য করতে পারছিল না। বড্ড একা, বড্ড অসহায়। একটা তিক্ততায় ভরে আছে মনটা।
রাতটা কাটিয়ে পরদিন সকালেই সে ফিরল কলকাতায়। ধামাখালিতে রাখা থাকে তার গাড়ি। ঝড়ের গতিতে গাড়ি চালিয়ে সে দুপুরের আগেই পৌঁছে গেল চারুশীলার বাড়ি।
চারুদি, প্রবলেম।
কি হয়েছে তোর? এরকম দেখাচ্ছে কেন?
আমি একটা সমস্যায় পড়েছি।
বোস। তোর তো সব সময়ে সমস্যা। কী হয়েছে। ধীরে ধীরে বল।
হেমাঙ্গ বসল। ভোবল। তারপর বলল, মণীশবাবুর মেয়ে অনুকে তো চিনিস! মেয়েটা কেমন?
খুব ভাল মেয়ে। লেখাপড়ায় খুব ভাল। কেন?
মেয়েটা একটু পাজি, না?
না তো। কি সব বলছিস!
মেয়েটা নিশিপুরে গিয়ে এমন একটা সিন ক্রিয়েট করল যে, মণীশবাবু সন্ত্রীক চলে এলেন। দুদিন থাকার কথা ছিল। থাকলেন না।
তাই বুঝি? দাঁড়া তো, আমি ঝুমকির সঙ্গে ফোনে একটু কথা বলি।
না। এখন থাক।
থাকবে কেন? অসভ্যতা কেন করেছে জানা দরকার।
তুই তো এখনও সবটা জানিস না, কী বলবি ঝুমকিকে?
কিছু বলব না, ডেকে পাঠাবো। ও এলে শুনবো।
তোকে কিছু বলতে হবে না। ঝুমকিকে বলিস আমাকে যেন সুবিধেমতো একটা ফোন করে। আমি বাড়িতে থাকব।
কিন্তু কি হয়েছে বলবি তো!
আজ নয়। আজ আমি টায়ার্ড।কাল-পরশু এসে বলব।
বাড়ি ফিরে হেমাঙ্গ কিছুক্ষণ ঘুমোলো। রাতে তার একদম ঘুম হয়নি। কাল। মাথা গরম, অপমানে গা রি-রি করেছে।
ফোনটা এল রাত সাড়ে দশটায়। হেমাঙ্গ তখন বসে আকাশ-পাতাল ভাবছিল।
আমি ঝুমকি বলছি। আপনি ফোন করতে বলেছিলেন?
হ্যাঁ।
বলুন।
অনু আপনাকে কিছু বলেছে?
অনু! না তো!
কাল নিশিপুরে গিয়েছিল। রাগ করে ফিরে এসেছে। কিছুই বলেনি?
না। তবে মা বলছিল ওর নাকি মুড অফ হয়ে গিয়েছিল।
হেমাঙ্গ একটু চুপ করে থেকে বলল, ঘটনাটা আপনাকে আর আমাকে নিয়ে।
আমাদের নিয়ে! কী ঘটনা একটু বলবেন?
শী থিংকস দ্যাট উই আর ইন লাভ।
ঝুমকি কোনও জবাব দিল না।
শুনছেন?
ঝুমকি ক্ষীণ গলায় বলল, শুনছি।
আপনি তো জানেন, আমি একটু একা টাইপের লোক। একা থাকতে ভালবাসি। জলে-জঙ্গলে ঘুরি। খেয়ালি। জানেন তো!
জানি।
আমাকে মাঝে মাঝে ভূতে পায়। আমি যে কী করি তা বুঝতে পারছি না। অনু কাল আমাকে খুব অপমান করেছে। হয়তো করাই উচিত।
আমি অনুর হয়ে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। ওকে যা বলার আমি বলব।
প্লীজ, বলবেন না। অনুর নামে নালিশ করার জন্য ফোন করতে বলিনি। আর একটু গভীর কথা আছে।
কী কথা?
গলা শুনে মনে হচ্ছে আপনারও মুড আজ ভাল নেই। কথাটা বলার জন্য একটু ভাল মুড দরকার।
ঝুমকি একটু হাসল। বলল, মুড ভালই আছে। বলুন। বলব?
না কি আর একটু সময় নেবো?
আপনার ইচ্ছে।
আমি আপনাকেই জিজ্ঞেস করতে চাই। কারণ আমার চেয়ে আপনিই হয়তো ভাল বুঝবেন।
কি জিজ্ঞেস করতে চান?
অ্যাম আই ইন লাভ উইথ ইউ?
ঝুমকি খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর প্রায় পিসপিস করে বলল, তার আমি কী জানি!
হেমাঙ্গ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমিও জানি না।
ঝুমকি চুপ করে রইল।
হেমাঙ্গ সামান্য বিষণ্ণ গলায় বলল, এই কথাটাই অনুকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। ও ভুল বুঝল।
আপনি বারবার অনুর কথা বলছেন কেন? ও ছেলেমানুষ, ওর কথা ধরবেন না।
হেমাঙ্গ স্বগতোক্তির মতো করে বলল, আমি যে কী ভীষণ সমস্যায় আছি তা বোঝাতে পারব না।
কিসের সমস্যা?
আগে বলুন আপনি নিশিপুরে গেলেন না কেন?
ঝুমকি একটু চুপ। তারপর খুব নিচু গলায় বলল, আপনি আমাকে অ্যাভয়েড করতে চান বলে যাইনি।
জানি। কিন্তু অ্যাভয়েড করতে চাইলেও পারছি না কেন? আপনি যাননি বলে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। দিনটাই মাটি হয়ে গেল যেন।
ঝুমকি চুপ।
আমি আপনাকে নিয়েই প্রবলেমে পড়েছি। রশ্মিকে নিয়ে আমার এই প্রবলেম ছিল না। আই নেভার মিসূড় হার। কিন্তু আপনাকে মিস করি কেন?
ঝুমকি চুপ।
কিছু বলুন, প্লিজ!
ঝুমকি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কী বলব?
