অস্থির হচ্ছিস কেন? আসবে। কলকাতা কি আর এক দৌড়ের রাস্তা? ধামাখালি পৌঁছতেই কত সময় লাগে। তারপর ভটভটি।
আমার খুব আনন্দ হচ্ছে কিন্তু।
তোর তো সব তাতেই আনন্দ।
গাঁয়ে বড় একঘেয়ে জীবন, জানো তো! নতুন মানুষজন দেখলে একটু ভাল লাগে। সেই মেয়েটা আসবে তো!
হেমাঙ্গ সামান্য হেসে বলল, খুব পেকেছিল।
আহা, তাকে আমার প্রথম দেখেই ভীষণ ভাল লেগেছিল যে।
তোর কাকে ভাল না লাগে? সাজগোজ করা শহুরে মেয়ে দেখলেই তো তুই হাঁ হয়ে যাস। তখন তোর চোখের পলক পড়ে না।
কী বলে গো মিথ্যে কথা! বলে বাসন্তী হি হি করে হাসল।
রাস্তার দিক থেকে বাঁকা মিঞাকে আসতে দেখা গেল। পিছনে দুটো লোকের মাথায় একটা চৌকি। তারও পিছনে ফজল। তার মাথায় শতরঞ্চিতে বাধা একটা বিছানা।
একমুখ হাসি নিয়ে বাঁকা আগর ঠেলে ঢুকল, সব নিয়ে এলাম।
হেমাঙ্গ বলল, বেশ করেছ।
আপনি একটু ঘাটপানে যান। ততক্ষণে ফজল ঘটা গুছিয়ে দিক।
এখনই ঘাটে গিয়ে কী হবে? তাদের আসতে দেরি আছে।
কিছু বলা যায় না। হয়তো খুব ভোর-ভোর রওনা হয়ে পড়েছেন।
হেমাঙ্গ একটু হাসল। এ যাবৎ নিশিপুরে কম লোক আসেনি তার বাড়িতে। কিন্তু আজ যারা আসছে তাদের জন্য বাঁকা মিঞা আর বাসন্তী একটু যেন বেশিই তটস্থ। কারণটা কিছু ধরতে পারছে না হেমাঙ্গ। কোথাকার জল কোথায় গড়াচ্ছে কে জানে।
হেমাঙ্গ উঠে পড়ল এবং পায়ে পায়ে ঘাটের দিকেই এগোতে লাগল। ভারি বৃষ্টির পর শরৎকালটা ফুটে উঠছে সর্বে। এ সময়ে চারদিকে প্রকৃতির ঐশ্বর্য যেন থরে-বিখরে ফুটে ওঠে। এত সুন্দর ঋতু আর হয় না। তার উঠোনে শিউলিফুল ছড়িয়ে থাকে অজস্র। গন্ধে যেন বাতাস শুদ্ধ হয়ে যায়।
নদীর ধারটায় এসে দাঁড়াতেই মুগ্ধ সম্মোহিত হয়ে গেল হেমাঙ্গ। জল আকাশ আর আদিগন্তের প্রসার যেন তাকে টেনে নেয় বুকের মধ্যে।
আশ্চর্যের বিষয়, ঘাটে এসে দাঁড়ানোর দশ মিনিটের মধ্যেই যে ভটভটিটা এসে ভিড়ল সেইটে থেকেই নামল মণীশ, অপর্ণা, অনু আর—না, আর কেউ নয়।
মৃত পায়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল হেমাঙ্গ। মৃত ঠোটে হাসল। মৃত গলায় বলল, আসুন, আসুন। কোনও কষ্ট হয়নি তো!
ঘাটে চাঙড় ফেলা। পাথরের চ্যাটালোচাতালটুকু সাবধানে ডিঙিয়ে, মাটি আর ইঁটের পিছল ধাপ ভেঙে ভারসাম্য রাখতে রাখতে উঠে আসছিল অপর্ণা। হেসে বলল, কষ্ট নয় তো কি? বাব্বাঃ, যা দূর!
অপর্ণার তুলনায় অনেক বেশি সপ্রতিভভাবে উঠে এল মণীশ আর অনু। ঘাটে দাঁড়িয়ে চারদিকে চেয়ে মণীশ বলল, বাঃ, এ তো দারুণ সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ!
হেমাঙ্গ বলল, ক্যামেরা এনেছেন।
না।
অনু বলল, আমি এনেছি।
একজন আসেনি। সেই না-আসাটা নিয়ে কোনও প্রশ্ন করতে পারল না হেমাঙ্গ। অথচ প্রশ্ন করাটাই তো স্বাভাবিক ছিল। চারজনের একজন কেন এল না। সেই অনুপস্থিতি যে এই তিনজনের আসার চেয়েও অনেক বেশি গুরুতর সেটা হেমাঙ্গ টের পেল নিজের ভিতরে। তার চোখে এই শরতের সুন্দর সকাল, এই মায়াবী আলো, আদিগন্ত অফুরান বিস্তার সব যেন কেমন মিথ্যে-মিথ্যে লাগছে। সুর কেটে গেল, তালে ভুল।
অতিথিদের ঘরে নিয়ে এল হেমাঙ্গ, এই আমার জঙ্গলবাড়ি। দেখুন কেমন লাগে।
সৌজন্যের বশেই হবে, অপর্ণা উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, বাঃ, কী সুন্দর বাড়ি আপনার! লাউডগা বুঝি চালের ওপর?
অনেক কিছু আছে। দেখবেন।
মণীশ চারদিকটা দেখে-টেখে বলল, আপনি এখানে প্রায়ই থাকেন, না?
হ্যাঁ। আর তাই নিয়েই আমার আত্মীয়স্বজনের অশান্তি।
কেন? তাঁরা আপত্তি করেন নাকি?
খুবই করেন। বিশেষ করে মা। মায়ের ধারণা আমি সাধুসন্ত হয়ে যাচ্ছি।
মণীশ একটু হাসল, আজকাল অনেকেই কলকাতার বাইরে পলিউশন-ফ্রি এলাকায় বাড়ি-টাড়ি করে রাখে। ফুসফুস পরিষ্কার করার এর চেয়ে ভাল পন্থা আর কী আছে? শান্তিনিকেতনে ভিড় বাড়ছে তো এই জন্যই। কত টাউনশিপ হচ্ছে সেখানে।
বাঁকা মিঞা আর ফজল চলে গেছে। তারা ফের দুপুরে মুরগি বেঁধে দিয়ে যাবে। বাসন্তী ঘরের শেষ ঝাড়পোঁছ সাঙ্গ করে বেরিয়ে এল। একমুখ হাসি।
হেমাঙ্গ বলল, এ হল বাসন্তী। এখানে ওই আমার সব দেখাশোনা করে।
বাসন্তী ঢিপঢিপ করে সবাইকে প্রণাম করে চায়ের জল চড়িয়ে দিল স্টোভে।
অনু বলল, আমি চা খাবো না। একটু ঘুরে আসি মা।
হেমাঙ্গ বলল, আরে দাঁড়াও। আমার সঙ্গে যাবে।
আচ্ছা।
ব্যাগ থেকে একটা ক্যামেরা বের করে অনু টুক করে বাড়িটার একটা ছবি তুলে নিল। অনু একটা খুব নরম ভুষো নীলচে রঙের চুড়িদার পরে এসেছে। ফর্সা ও লম্বা মেয়েটিকে দেখাচ্ছে ভারি সুন্দর। দুই বোনের মুখশ্রীর তেমন মিল নেই। কিন্তু অনুর চটক বেশি। সহজেই নজরে পড়ে।
বাসন্তী বারান্দায় চেয়ার সাজিয়ে রেখেছিল। মণীশ আর অপর্ণা বসল; অপৰ্ণা বলল, ঝুমকিটা এল না। আজ ও চারুশীলার সঙ্গে কোথায় যেন যাবে। চারুর তো রোজ একটা না একটা কিছু আছেই।
হেমাঙ্গ হেসে বলল, জানি।
ঝুমকিকে ভীষণ ভালবাসে তো! ঝুমকি বলল, আমি তো নিশিপুর ঘুরে এসেছি মা, তোমরা যাও।
এসব কথা শুনছে হেমাঙ্গ, বুঝছে অন্যরকম। কেন আসেনি সেটা এরা কেউ জানে না। জানবেও না কোনও দিন। হেমাঙ্গ জানে। গভীরভাবে জানে।
চা খাবার ইত্যাদির পর্বটা কোনও রকমে পার হল হেমাঙ্গ। তারপর ভদ্রতা করে বলল, আপনারা কি একটু বেড়াতে যাবেন?
অপর্ণা বলল, আমার কিন্তু টায়ার্ড লাগছে।
মণীশ বলল, আমারও। একটু জিরিয়ে নিই, তারপর দেখা যাবে। বেরোনোর খুব একটা দরকার আছে কি? উঠোন থেকেই তো নদীটা দেখা যায়। এইটে যথেষ্ট। সামনে একটা নদী থাকলে আর কী চাই?
