বীণা শুয়ে শুয়ে ভাবছিল, সে তো ভাব করতে আসেনি। সে শুধু একটা কথাই বলতে এসেছে। লোভী সজল যদি বীণার বারণ না শুনে যাত্রার দল খোলার প্রস্তাব নিয়ে আসে তা হলে যেন নিমাই রাজি না হয়। সে যতদূর সজলকে চেনে, তাতে তার দৃঢ় বিশ্বাস, সজল তা করবে। ওর চরিত্র বলে কিছু নেই, বুদ্ধিও অবাস্তব। ও আরও একবার নিমাইয়ের কাছে এসেছিল বীণার ওপর অধিকার ছেড়ে দেওয়ার কথা বলতে। সেটা বড় লজ্জার ব্যাপার হয়েছিল বীণার কাছে। নির্বোধ সজল যাত্রার দল খোলার জন্য পাগল হয়ে গেছে। এখন তার পক্ষে সবই সম্ভব।
কিন্তু নিমাইয়ের অবস্থা দেখে বীণাও একটু হকচকিয়ে গেছে। এ কি ময়দানবের কাণ্ড? মাত্র দু-তিন বছরে এত কাণ্ড কি করে নিমাই ঘটিয়ে তুলল? আগে তো এখানেই একটা ফলের দোকান চালাত। তাতে পেটও চলত না ভাল করে।
ভাবছিল, খুব ভাবছিল বীণা। ভাবতে ভাবতে কখন ঘঘারের মতো ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল কে জানে! অতল গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে সে ভাবছিল, কাজটা ঠিক হচ্ছে না।
যখন ঘুম ভাঙল তখন সকাল না বিকেল বুঝতে পারল না সে। জানালার পর্দা টানা, ঘরের দরজা ভেজানো। শুধু একটা জলের পরিচ্ছন্ন জগ আর ঢাকা দেওয়া চকচকে কাচের গেলাস কে রেখে গেছে যেন। আক তো টের পেল বীণা। ঢকটুক করে অনেকটা জল খেল। বাইরে এখনও দিনের আলো আছে।
মাথা ধরাটা ছেড়ে গেছে। শরীর দুর্বল হলেও তেমন জড়তা নেই। সামনে একটা ড্রেসিং টেবিল দেখে বীণা নিজেকে একটু গুছিয়ে নিল। লোকটা কি ফিরেছে?
বীণা উঠতে যাচ্ছিল, এমন সময়ে দরজায় টোকা দিয়ে বাইরে থেকে নির্মল জিজ্ঞেস করল, দিদি কি উঠছেন।
হ্যাঁ।
দাদা ফিরেছেন। ডাকব কি?
ডাকো।
ডাকতে বলার পর থেকেই বুকটা হঠাৎ দুরুদুরু করতে থাকে বীণার। কেন করে কে জানে? নিমাইকে সে কোনওকালে পূর্ণাঙ্গ পুরুষ বলে তো মনেও করেনি। তার কি তবে ভয় করছে? নার্ভাস লাগছে? লাগলে সেটা খুবই অস্বাভাবিক ব্যাপার।
দরজায় টোকা দিয়ে নিমাই বলল, আসব নাকি?
জবাব দিতে গিয়ে গলাটা দেবে গেল বীণার। ফেঁসে যাওয়া স্তিমিত গলায় বলল, এস।
দরজা ঠেলে যখন নিমাই ঘরে ঢুকল তখন বীণা অন্য দিকে মুখ ফিরিয়েছিল।
নিমাই বেশ দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলল না।
খুব আস্তে চোখ ফেরাল বীণা। মানুষটা নিমাই বটে, আবার নয়ও। সেই ছোেটখাটো চেহারা, তবে শরীরটা পোড় খেয়েছে। রংটা আরও তামাটে। পরনে একটা ফর্সা ধুতি আর সাদা শার্ট। হাতে ঘড়ি। কিন্তু এ তো বাইরের খোলস। যেটা অবাক হওয়ার সেটা হল, নিমাইয়ের মুখচোখ। সেই ভীতু, আত্মবিশ্বাসহীন, জ্বলজুলে চাউনি আর নেই। বদলে ভরপুর, শান্ত, আত্মবিশ্বাসী একজোড়া চোখ।
বীণা বলল, বসবে না? কথা আছে।
নিমাই চেয়ারে বসল। কিন্তু কিছু বলল না। বড় চুপচাপ।
বীণা এই নিমাইকে ঠিক চিনতে পারছে না। কে জানে কেন, তার একটু ভয়-ভয় করছে। সে স্তিমিত ধরা গলায় বলল, একটা জরুরি কথা বলতে এসেছি।
ও। সংক্ষিপ্ত জবাব দিল নিমাই।
সজল বলে একটা ছেলে আছে বনগাঁয়ে। ছেলেটা যাত্রার দল খুলবে বলে পাগল। সে হয়ত তোমার কাছে এসে টাকা চাইবে। ওকে টাকাপয়সা দিও না।
সে ইতিমধ্যে বারকয়েক এসে ঘুরে গেছে।
বীণা সচকিত হয়ে সবিস্ময়ে বলল, এসে গেছে?
কয়েকবার। তোমার নাম করেই বলেছে যে, তুমি নাকি দল খুলতে চাও, টাকার দরকার।
সর্বনাশ! কী মিথ্যুক! তুমি দাওনি তো?
না। অতটা আহাম্মক হলে আমার চলে না। তবে তাকে বলেছি, বীণা যদি নিজে প্রস্তাব দেয় তবে ভেবে দেখব।
আমি কিন্তু ওকে পাঠাইনি। মিথ্যে কথা বলেছে।
ওর চোখের দিকে তাকিয়ে তাই মনে হচ্ছিল।
একটু শঙ্কিত হয়ে বীণা বলল, ও তোমাকে আর কী বলেছে?
নিমাই মাথা নেড়ে বলে, আর কিছু নয়।
আমার সম্পর্কে কিছু বলেনি তো!
নিমাই একটু চুপ করে থেকে বলল, তোমাদের সম্পর্কের কথা বলে।
কী সম্পর্ক?
ভাব-ভালবাসার কথা। তোমরা বিয়ে করবে। ঘর বাঁধবে। এই সব।
বীণার মাথায় বজ্ৰাঘাত হল। সে শুধু বলল, কী সর্বনাশ!
১০৮. চারদিকে কত গাছ
চারদিকে কত গাছ, তবু চড়াইপাখি সব সময়ে মানুষের ঘরে কেন বাসা বাঁধে বল তো।
বাসন্তী মশলা বাটছিল। বলল, তোমার সব উটে প্রশ্ন বাপু। চড়াইপাখি কোথায় বাসা করে তাই নিয়ে সকালেই কেন ভাবতে বসলে বলো তো!
তুই কখনও লক্ষ করিম না যে অন্য পাখিরা গাছে বাসা বাঁধে কিন্তু চড়াই নয়?
কে জানে বাপু চড়াইয়ের বৃত্তান্ত। ঘরের মধ্যে বাসা করেছে নাকি? তা হলে ভেঙে দাও। ওরা ঘরদোর বড় নোংরা করে।
ভেঙে দেবো কি রে? ওরা আমার বন্ধু যে।
এখন কাক বক চড়াই শালিখ তোমার বন্ধু হচ্ছে নাকি? তুমি না পারো আমিই চড়াইয়ের বাসা ভেঙে দিয়ে যাবো।
খবরদার না, বাসায় যদি ডিম থাকে?
বাসন্তী অবাক হয়ে বলে, থাকলে কী হল? হাঁস-মুরগির ডিম ভেঙে দুনিয়াসুদ্ধ লোক খাচ্ছে না?
তোর মায়া-দয়া একটু কম আছে বাসন্তী। এত নিষ্ঠুর কেন তুই?
বাসন্তী ফিক করে হেসে বলল, রাগ করলে নাকি? তোমার যে সব অদ্ভুত কাণ্ড! অত মায়া করছ, কিন্তু দুনিয়াতে মানুষের খাওয়ার জন্যও তো ভগবান কিছু জীবকে পাঠিয়েছেন। জলের মাছ, ডাঙার পাঠা, খাসী, মুরগি এদের সৃষ্টিই তো খাওয়ার জন্য।
ভগবানের সঙ্গে তোর এসব নিয়ে কথা হয় নাকি?
আহা, সংসারের যা নিয়ম তাই বলছি।
সংসারের যে কি নিয়ম তা কেউ জানে না। যার যেমন প্রবৃত্তি সে সেরকম নিয়ম করে নেয়। বুঝেছিস?
বুঝেছি গো বুঝেছি। এখন তেনারা কখন আসবেন বলো। সকাল তো আটটা বাজে।
