আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতাকে হেমাঙ্গ খুব অপছন্দ করে না। সে বিজ্ঞানের ছাত্র নয়, কারণ সলিড জিওমেট্রিও ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাস তাকে চোখ রাঙিয়ে এমন ভয় দেখিয়েছিল যে, সে পালিয়ে বাঁচে। কিন্তু বিজ্ঞানের অত্যাশ্চর্য আবিষ্কারকসমূহকে সে অতিশয় বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করে। বিশেষ করে ভোগ্যপণ্য ও নিত্য ব্যবহার্য যে সব জিনিস হাতের কাছে এগিয়ে বিজ্ঞান, সেগুলিই তাকে আকর্ষণ করে সবচেয়ে বেশী। তবে বিজ্ঞানের কিছু অভিশাপও আছে। তার মধ্যে একটা হল টেলিফোন আর বাড়িটাকে টেলিফোনমুক্ত রাখতে পারলে সে সত্যিকারের স্বাধীন হতে পারত। কিন্তু ভাড়াটে ভদ্রলোক অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে একটা জ্যান্ত টেলিফোনও রেখে গেছেন এবং হেমাঙ্গর বাবা সেটা বহাল রেখেছেন। ফলে বহির্জগতের নানা কৌতূহল ও প্রশ্ন তাকে সময়ে অসময়ে ব্যতিব্যস্ত রাখে। পিসতুতো দিদি চারুশীলার আক্রমণ ওই টেলিফোনের মাধ্যমেই আসে সবচেয়ে বেশী।
রাত দশটায় হেমাঙ্গ অখণ্ড মনোযোগে ভি সি আর-এ একখানা সায়েন্স ফিকশনের ক্যাসেট চালিয়ে দেখছিল। ঠিক এই সময়ে চারুশীলার টেলিফোন এল।
কি রে! কী করছিস?
হ্যালো ব্রেন, আবার কিসের দরকার পড়ল?
তোর ঘরে কিসের শব্দ হচ্ছে বলতো! ভি সি আর চলছে নাকি? একা বাড়িতে বসে ব্লু ফিল্ম দেখছিস না তো!
তুই একটা অত্যন্ত বাজে মেয়ে, তা কি জানিস?
একটু হেসে চারুশীলা বলে, আহা, দোষের তো কিছু নয়। এখন বয়স হয়েছে, একা বাড়িতে থাকিস, ওসব তো হবেই বাবা। স্বীকার করলেই হয়। শুধু শুধু সাধু সেজে থাকা কেন বাপু?
তোর মতো সবাই রাদি মার্কা কিনা। আমি একটা সায়েন্স ফিকশন দেখছি।
আজকাল বেশীর ভাগ ইংরেজি ছবিতেই একটু পর্ণোগ্রাফি থাকে।
থাকলে থাকে। তোকে আমার মরাল গার্জিয়ান হতে হবে না।
আবার খিলখিল হাসি শোনা গেল।
হেমাঙ্গ গম্ভীর গলায় বলে, দেখ, রাত দশটার সময় ইয়ার্কি ভাল লাগে না। ছবিটা শেষ হলেই আমি শুতে যাবো। কাল অপিস আছে। তোর মতো বেলা নটায় ঘুম থেকে উঠলে আমার চলবে না।
তুই কিরকম কাজের লোক তো জানি। আমিও একটা দরকারেই ফোন করছি। মোটেই ইয়ার্কি নয় সেটা।
তাহলে ভ্যানতাড়া করছিস কেন? কী দরকার?
আচ্ছা, তোর একজন চেনাজানা হোমিওপ্যাথ আছে না? চৌধুরী না কী যেন!
আছে তো। কর্ণাদ চৌধুরী।
অ্যাপায়েন্টমেন্ট পাওয়া কি শক্ত?
দিন দশেক লাগে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে। কেন?
আমার একটা বন্ধু আছে না, রিয়া, ওর একটু প্রবলেম হচ্ছে।
কী প্রবলেম?
মেয়েদের অনেক প্রবলেম থাকে। তাতে তোর কী দরকার?
যা বাবা! আমি তো সেফ অ্যাকাডেমিক ইন্টারেস্ট থেকে জিজ্ঞেস করলাম।
মুকু রূপার ছেলেমানুষদের অত ইটারেট ভাল নয়। যাকগে, কাল একটা আপয়েন্টমেন্ট করে দিবি? বিকেল ছটা সাড়ে ছঢা। নাগাদ?
রিয়া মানে সেই মোটাসোটা ফর্সা মতো না? যার হাজব্যান্ড একটু গেয়ো টাইপের, কিন্তু দারুণ কোয়ালিফায়েড!
হ্যাঁ। কিন্তু রিয়া মোটেই মোটা নয়। সলিড হেলথ।
একটু বেশী সলিড। তোর মতোই।
কী, আমি সলিড! জানিস, গত এক বছরে আমার ওজন দেড় কেজি কমেছে, দশ গ্রামও বাড়েনি!
দেখে তো তা মনে হয় না। স্বামী বেচারা হিল্লিদিল্লি করে মরছে আর বউ গ্যাট হয়ে বসে বসে খাচ্ছে আর মুটোচ্ছে। তোর মতো আইড়ল ব্রেনের অপদাৰ্থ মেয়েদের দেখে দেখেই আমার বিয়ের ইচ্ছেটা চলে গেছে।
আর তোকে দেখে বহু মেয়ে চিরকুমারী থাকবে বলে তৈরি হচ্ছে, তা জানিস? আমার বর হিল্লি দিল্লি করে বেড়ায় সেটা কি আমার দোষ? আমি তো বলেই দিয়েছি, অত টাকা রোজগারের কোনও দরকার নেই, এবার একটু বাড়িতে থাকো। যা আছে তাতেই আমাদের ঢের। কিন্তু পুরুষদের তো টাকার নেশা। আরও চাই, আরও চাই। এই যে তুই, মামার টাকার পাহাড়ের ওপর বসে আছিস, তাও টাকার গন্ধে গন্ধে কোথায় কোথায় ছোঁক ছোঁক করে বেড়াচ্ছিস। আজকাল তো শুনি গায়ে গঞ্জের ছোটো ছোটো ইস্কুলে অবধি অডিট করতে যাস। শুনে ঘেন্নায় মরে যাই।
একটা চড়াই পাখির মাথায় যেটুকু ঘিলু আছে সেটুকুও যদি তোর থাকত! জানিস তো, ভগবান খুব ইমপারাশিয়াল। যাকে বিউটি দেন তাকে ব্ৰেনটা দেন না, যাকে ব্রেন দেন তাকে বিউটি থেকে বঞ্চিত করেন। এরকমই। আর কি! তবে ব্ৰেন না থাকা খুব ভাল। ব্ৰেনলেসরাই জগতে সুখী। পাখির মস্তিষ্ক না হলে কেউ ভাবতে পারে যে, আমি টাকার লোভে গাঁয়ে অডিট করতে যাই?
তাহলে কোন যাস?
আমার রুদ্র্যাল লাইফ দেখতে ভাল লাগে, তাই যাই।
শেষে একদিন একটা গায়ের বঁধু এনে হাজির করবি নাকি? দেড় হাত গোমটার নিচে নোলক দুলবে, চোখে জ্যাবড়া কাজল, কনুই অবধি গয়না, পরনে রোলেক্স শাড়ি!
তবু তোদের চেয়ে ভাল। রাত হয়ে যাচ্ছে, ছাড়ছি।
ওরে দাঁড়া দাঁড়া। আমার অ্যাপয়েন্টমেন্টটার কী হবে?
কী আবার হবে! বলে দেখবখন।
দেখবখন বললে হবে না। কালকেই চাই।
হয়ে যাবে।
চেম্বারটা বদ্রীদাস টেম্পল স্ট্রিট না?
হ্যাঁ। তুই তো একবার গিয়েছিলি!
সে তো কবে! তিন বছর আগে।
তোর কথা শেষ হয়েছে?
না, না, শোন লোকটার ভিজিট কত?
জানি না। ষাট-টাট হবে। কেন, রিয়ার কি টাকার প্রবলেম?
না। তবে ওর মেয়ের একটি প্রাইভেট টিউটর আছে। ছেলেটা খুব ভাল। দারুণ পড়ায়। বোধহয় ছেলেটা এপিলেপটিক। জানিস তো, এপিলেপিসির কোনও চিকিৎসাই নেই। রিয়ার ইচ্ছে সেই ছেলেটাকেও নিয়ে যায়। ভিজিট বেশী হলে পেরে উঠবে না।
