আজ বিকেলেও মণীশকে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখতে পেল না। অপর্ণা। ডাক্তার বলছে, অবস্থা স্টেবল। কিন্তু তেমন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছে না। আজ মণীশের বস এসেছিল বিশাল একখানা কনটেসা গাড়িতে চেপে, বয়স চল্লিশের নিচে। দারুণ স্মার্ট, পার্শি লোকটা ডাক্তারের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ গন্তীর মুখে কথা বলছিল। ইংরেজিতে। অপর্ণা পাশেই ছিল, কিন্তু এক বর্ণও বুঝতে পারেনি। অনীশ বা অনু হলে বুঝত। অপর্ণা ওরকম খই-ফোনা ইংরেজি বুঝতে পারে না। মণীশের বস বনাতওয়ালার আবার বিদেশেই জন্ম, সেখানেই লেখাপড়া।
পুরো না বুঝলেও ভাবসাব এবং গলার স্বর থেকে অনুমান করতে পারে, মণীশের বেঁচে যাওয়ার একটা আউটসাইড চান্স আছে। আউটসাইড চান্স কাকে বলে তা অবশ্য অপর্ণা জানে।
ছেলেমেয়েদের মতো অপর্ণা ভেঙে পড়েনি বটে, কিন্তু তাকে অনেক চাপ নিতে হচ্ছে মনের মধ্যে। অপর্ণা আর কতটা পারবে, তা জানে না। তবে সে পৃথিবীর এবং জীবনের নেতিবাচক দিকটাকে সবসময়ে বড় করে দেখে, সঠিক গুরুত্ব দেয়। তার আশা ভরসা, স্বপ্ন কখনোই মাত্ৰ-ছাড়া নয়। মণীশ যেমন আদ্যন্ত ব্লপ্লের ঘোরে বাস করে, অপর্ণার তেমনই সবসময়ে কঠিন মাটিতে পা।
মাছের ঝোল বেশী রাখতে নেই, তাহলে রুটির সঙ্গে ওরা ভাল খাবে না। আসলে রুটির সঙ্গে ডিম বা মাংসই ভাল। কিন্তু অপর্ণার সময় হয়নি বাজার করার। ফ্রিজে মাছ ছিল, তাই রাঁধছে। মণীশের অসুখ বলে ওরা হয়তো খাবার নিয়ে কথা তুলবে না। খুশী না হলেও না। ওরা খাবারের স্বাদ পায় না এখন। বাবা ওদের ভুবনময়। বাস্তববাদী অপর্ণা, হিসেবী অপর্ণা, একটু কৃপণ অপর্ণার চেয়ে ওরা অনেক বেশী পছন্দ করে বেহিসেবী, ক্যাপাটে, স্বপ্নশীল মণীশকে।
সেই একই কারণে কি অপর্ণাও পছন্দ করেনি মণীশকে?
ঘুম চোখে অনুশীলা এসে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়াল, মা, এ সময়ে কি ড্যাডিকে নিয়ে ডিসকাস করা ভাল?
কে ডিসকাস করছে?
ওই তো। ওরা করছে। দাদা আর দিদি।
ডিসকাস করলে কী হয়?
এ সময়ে তো ড্যাডি সিক। এখন কী ডিসকাস করা ভাল? সুপারস্টিশন আছে না?
কিসের সুপারস্টিশন?
ডিসকাস করাটা আমার ভাল লাগছে না। আমাদের চুপ করে থাকা উচিত!
তা কেন? ডিসকাস করলে খারাপ কিছু হয় না। তুই আজ সারাদিন বেরোসনি, যা একটু ছাদে ঘুরে আয়।
ছাদটা ভীষণ অন্ধকার। আমি ভয় পাই।
উঃ, তোর ভয় নিয়ে আর পারি না বাপু। ভয়ে ভয়েই তুই শেষ হয়ে গেলি। বড় হচ্ছিাস, এখনও অত ভয় কিসের!
অনু ছিলো ছলো চোখে চেয়ে থাকে। জবাব দেয় না।
অপর্ণা বলে, তাহলে যা না, স্টিরিওটা চালিয়ে গান শোন। পিয়াসার ক্যাসেটটা চালা, আমিও শুনতে পাবো।
ভুরুঙ্গুয়ে সুমি বরং মোহিনীদের বাড়ি থেকে একটু ঘুরে আসি মা ও বোজ আসে, আমি তো যাই না।
কটা বাজে?
পৌনে আটটা মাত্র। কাছেই তো!
একটু দোনোমোনো করে অপর্ণা। পাড়ার একটা কেষ্ট ঠাকুর সম্প্রতি অনুর পিছনে লেগেছে। ঘন ঘন বাড়ির সামনে দিয়ে যাতায়াত করে। লেটার বক্সে চিঠিও ফেলে গেছে দু দিন। গুরুতর কিছু নয়। তবু সাবধান হওয়া ভাল।
এত রাতে যাওয়া ভাল দেখাবে না।
কেন, কি হয়েছে মা? এক মিনিটের তো রাস্তা!
সেই ছেলেটা যদি পিছু-টিছু নেয়?
দুকু মুক্ত করবে? ওরা তো কাওয়ার্ড টাইপেরই হয়। সামনে আসতে সাহস পায় না। আমি পাত্তাই দিই না।
সে আমি জানি।
ও ছেলেটা একদম হ্যাংলা। মোহিনীর পিছনেও লেগেছিল। ওরকমই চিঠি দিত।
তারপর কী হল?
কী আবার হবে! মোহিনী পাত্তা দেয়নি, তাই আর পিছনেও লাগৈ না। তুমি ভয় পেও না।
মৃত্যুহলে। মনটা একটু ভাল লাগবে। ছাতা নিয়ে যাস। বৃষ্টি আসতে পারে। আধঘণ্টার মধ্যে ফিরবি।
আছে।
মোহিনী তোর কেমন বন্ধু?
জাস্ট বন্ধু।
ওরা ভাল লোক তো?
খুব ভাল। ওর বাবা ফার্মার ছিল।
কী ছিল?
ফার্মার। চাষ-টাস যারা করে।
চাষা নাকি?
ঠিক তা নয়। তবে ওরকমই। ওদের গ্রামটা ভীষণ নাকি অজ পাড়া গা। শেয়াল ডাকে।
কে থাকে। সেখানে?
সবাই। মোহিনী বলেছে। ওর দাদু-টাদু সব সেকেলে আর আন এড়ুকেটেড।
কিন্তু ওর বাবা তো বিরাট চাকরি করে! বিদেশে যায় শুনেছি!
ওর বাবা একজন প্ৰাইম এনভিরনমেন্টালিস্ট।
সেটা আবার কী?
ও তুমি বুঝবে না। নাইস ম্যান। খুব শান্ত, ঠাণ্ডা, ভেরি আন্ডারস্ট্যান্ডিং। ঠিক আমার বাবার মতোই।
চাষা ছিল বলছিস?
খুব গরিব। ওদের সঙ্গে একদম মেলে না। সম্পর্কও নেই।
তাই বল! যাবো মা?
যা।
০১০. কামিনী-কাঞ্চন থেকে তফাত
রামকৃষ্ণদেব বলেছেন, কামিনী-কাঞ্চন থেকে তফাত তফাত খুব তফাত থাকো। কাঞ্চনকে এড়াতে পারেনি হেমাঙ্গ। তবে কামিনীকে অনেকটাই অনেকটাই পেরেছে। গড়চার বাড়িতে আসার পর তার জীবন প্রায় কামিনী-শূন্য।
তবে এই যে একটা গোটা বাড়ি নিয়ে সে একা থাকে এটা কারও কারও কাছে খুব অন্যায় রকমের বাড়াবাড়ি বলে মনে হয়। বিশেষ করে পিসতুতো দিদি চারুশীলার কাছে। পিসতুতো হলেও চারুশীলা একসময়ে তাদের বাড়িতেই লালিত পালিত হয়েছে। কারণ পিসিমার ছিল দুরারোগ্য নানা আধিব্যাধি। চারুশীলাকে দেখার কেউ ছিল না। সেই শিশুকাল থেকে চারুশীলা তার ওপর শতেক খবরদারি করে এসেছে। আজও করে। মাঝে মাঝে এসে বলে, অ্যাই, তোর বাড়িটা সামনের শনিবার ছাড়তে হবে, আমি এখানে একটা পার্টি দেবো।
হেমাঙ্গ আপত্তি করলেও এঁটে ওঠে না। দিদিটি বড়ই প্রখরা। যখন মুখ ছোটায় তখন রোখে কার সাধ্য। হেমাঙ্গ অগত্যা বাড়ি ছেড়ে কোনও ছোটখাটো টু্যরে আশেপাশে কোনও জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হয়। মেয়েদের সে যে পছন্দ করে না তার অন্যতম প্রধান কারণ কি এই দিদিটি? হতে পারে। চারুশীলা দুর্দান্ত সুন্দরী। দুটো সিনেমার নায়িকাও হয়েছিল। মুখখানা এমনিতে সুন্দর হলেও ফটোগ্ৰাকী নয় বলে আর বিশেষ সুযোগ পায়নি। তবে সুন্দরী বলেই ভাল একখানা বর বাগিয়ে নিয়েছে। ওর স্বামী আন্তর্জাতিক সম্মান-টম্মান পাওয়া একজন বিখ্যাত স্থপতি। সল্ট লোকে অনেকগুলো বাড়ি তার ডিজাইন করা। দিল্লি, বোম্বাই, নিউ জার্সি ও লন্ডনের শহরতলীতে সে বেশ কয়েকটা বাড়ি বানিয়ে নাম করে ফেলেছে। দেদার টাকা। উদয়াস্ত ব্যস্ত মানুষ। স্বামী যেমন ব্যস্ত, বউটির তেমনই অখন্ড অবসর। সারাদিন নেই কাজ তো খই ভাজ করে বেড়াচ্ছে। পার্টি দেওয়ার জন্য চারুশীলার জায়গার অভাব নেই। গোলপার্কের কাছে তার নিজস্ব বাড়িটিই কি কম? তবু চারুশীলা যে হেমাঙ্গর বাড়ি মাঝে মাঝে ধার করে সে শুধু কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বজায় রাখার জন্য।
