তোমাকেও বসে থাকতে হবে না। দল করতে পারলে তাতে তো তুমিও থাকবে।
থাকব কি না কে জানে! আমার কথা তোমাকে ভাবতে হবে না। গলার জন্য একগাছা দড়ি ঠিক জুটবে।
উঃ, তোমাকে নিয়ে আর পারি না।
বীণা হঠাৎ বলল, আজ যাও সজল। আমার আজ আর বকবক করতে ভাল লাগছে না। মাথাটা ভীষণ ধরেছে। একটু চোখ বুজে শুয়ে থাকব।
সজল বিদায় নিল। সজল বোকা এবং আহাম্মক। নইলে নিমাইয়ের টাকায় দল খোলার কথা ভাবতে পারত না। কিন্তু নিমাই যে মালদার হয়েছে সেটা জানা ছিল না বীণার। ওর কি এতই টাকা? এমন বুদ্ধিই যদি ওর ছিল তা হলে এতকাল বউয়ের পয়সায় বসে বসে খেল কেন?
বীণা এই ধন্ধটা নিয়ে সারা দিন উপোসী পেটে বসে রইল। শুলো বটে, কিন্তু ঘুম এল না। সারা রাত কাটল এ-পাশ ও-পাশ করে।
খুব ভোরে উঠে সে মুখ হাত ধুয়ে বেরনোর জন্য তৈরি হল। মাথাটা আরও ভার হয়ে ছিঁড়ে পড়ছে। সারা গা জ্বরো রুগীর মতো তপ্ত। ঠাণ্ডা জল ছুঁলে ঘঁক াক করছে। চোখে জ্বালা-জ্বালা ভাব। এক কাপ চা আর একটা ব্যথার বড়ি খেয়ে একটু সামাল দিল সে। খালি পেটে ব্যথার বড়ি খেলে অম্বল উথলে ওঠে। কিন্তু কিছু মুখে দিতে ইচ্ছেই হল না তার।
যখন বাস ধরল তখন চারদিকে রোদ ঝলমল করছে। সেই রোদ চোখে লাগছিল খুব।
কাঁচরাপাড়ায় বড় রাস্তার কাছেই নিমাইয়ের দোকান। এই সাতসকালেও সেখানে রাজ্যের ভিড়। দোকানটা বাইরে থেকেই দাঁড়িয়ে একটু দেখল বীণা। চা, ঘুঘনি, পাউরুটি, চাপাটি আর জিলিপি খুব বিক্রি হচ্ছে। ভিতরে নিমাইকে দেখা গেল না।
একটা ছোকরা দরজার কাছেই একটা টেবিলে চা দিচ্ছিল। ভিতরে ঢুকে বীণা তাকেই জিজ্ঞেস করল, নিমাইবাবু কোথায় বলতে পারো?
ও বাড়িতে।
ও বাড়ি! সেটা কোথায়?
নতুন দোকানে। সামনে এগিয়ে গেলে বা হাতে পাবেন।
বীণা ইতস্তত করছিল। হঠাৎ ভিতরের কোনও ঘর থেকে নির্মলকে বেরিয়ে এসে ক্যাশ কাউন্টারে বসতে দেখল সে।
বীণা এগিয়ে গিয়ে বলল, তুমি তো নির্মল?
নির্মল দু-এক সেকেন্ড চেয়ে থেকেই টপ করে উঠে দাঁড়িয়ে সেই সরল হাসিটা হেসে বলল, দিদি! কখন এলেন?
এইমাত্র।
বসুন বসুন। চা খান এক কাপ। আর কী খাবেন বলুন?
কিছু নয়। তোমার নিমাইদা কি নতুন দোকান দিলেন?
হা। বড় দোকান। কাছেই তো। যাবেন?
একবার দেখা করব।
চলুন তা হলে, আপনাকে নিয়ে যাই।
তুমি ব্যস্ত হয়ো না। আমি খুঁজে নিতে পারব।
আরিব্বাস, তাই হয়? আপনি এসে পড়েছেন যখন, তখন আমার ওপর সব ছেড়ে দিন। তার আগে একটু কিছু মুখে
দিন।
আমার একটুও খাওয়ার ইচ্ছে নেই। মাথা ভীষণ ধরেছে।
অন্তত এককাপ চা! স্পেশাল করে দেবে।
আগে ওর সঙ্গে দেখা করি, তারপর।
তা হলে চলুন।
বাইরে এসে একটা রিকশা নিল নির্মল। বীণা বলল, দূর নাকি? রিকশা নিচ্ছ কেন?
দূর নয়। কাছেই। হেঁটে যাওয়ার দরকার কী?
হেঁটেই যাই চল। হাঁটতে ভালই লাগবে।
তবে তাই চলুন। রিকশার অবশ্য ভাড়া লাগত না। আমাদেরই রিকশা। নিমাইদা তো অটোরিকশাও কিনছেন।
খুব ফলাও কারবার তো!
লোকে বলে নিমাইদা যা ধরেন তাই সোনা হয়ে যায়। বাজারে এক পয়সা ধার নেই। সবাই মানে।
শুনে বীণার বমি-বমি করছিল। এত পয়সা করল ওই লোকটা? কি করে হয়?
মিনিট কয়েক হাঁটার পর যে দোকানটার সামনে তারা পৌঁছলো সেটা আসলে একটা ধাবা। মস্ত জায়গা নিয়ে ছড়ানো ব্যবস্থা। সামনে মস্ত করগেটেড শেডের তলায় সারি দিয়ে খাঁটিয়া পাতা। ভিতরে মস্ত রেস্টুরেন্ট। মেলা টেবিল-চেয়ার। সবটা ঝকঝাক তকতক করছে। তরি রুটি সেঁকার গন্ধ, কমা মাংস হচ্ছে, কোল্ড ড্রিঙ্কস সাজানো, মস্ত ফ্রিজ। বেশ কিছু খদ্দের বসে আছে। উঠোনের এক দিকে বাথরুমপায়খানা, চৌবাচ্চা ভর্তি জল, মগ, সব আছে। দোকানের সামনের দিকে এক কোণে পান সিগারেটের দোকান রয়েছে।
এইটেই। ভিতরে আসুন দিদি।
এটা কি ধাবা?
হ্যাঁ। রাতে খুব ভিড় হয়। দুপুর থেকে শুরু হয় ভিড়টা।
কবে হল? মাস দুয়েক।
নিমাইকে পাওয়া গেল না। বাজারে গেছে। সুতরাং বসতে হল বীণাকে। কাউন্টারের গদিআঁটা চেয়ারেই তাকে বসিয়ে নির্মল হাঁকডাক শুরু করে দিল। সবাইকে বুঝিয়ে দিল দোকানের মালকিন এসেছেন।
খাঁটি দুধে লিকার করা চা আর মচমচে টোস্ট চলে এল সঙ্গে সঙ্গে।
খান দিদি। টোস্টে স্পেশাল মাখন লাগানো আছে। আমরাই মাখন বানাই।
বীণা খুব অনিষ্ট্রের সঙ্গে চাটা মুখে তুলল। শুচিবায়ু করে লাভ নেই। নির্মল হয়ত দুঃখ পাবে।
কিন্তু সুস্বাদু টোস্ট আর চমৎকার চা খাওয়ার পর শরীরটা অনেক ভাল লাগল তার। গতকাল সারা দিন উপপাস গেছে। আজ ভীষণ দুর্বল লাগছিল শরীর।
দিদি, আপনাকে খুব টায়ার্ড দেখাচ্ছে। একটু বিশ্রাম করবেন? ভিতরে ভাল ব্যবস্থা আছে।
এই তো বেশ আছি।
নিমাইদার আসতে হয়তো দেরি হবে। আজ একটু মোটা বাজার আছে। ততক্ষণ আপনি একটু গড়িয়ে নিতে পারেন। শরীর ভাল নয় বলছিলেন। আসুন আমার সঙ্গে।
কি জানি কেন বীণা উঠল। ধাবার ভিতরে পিছন দিকে বেশ কয়েকটা ঘর রয়েছে। বেশ সাজানগোছান।
এ সব ঘর কার জন্য নির্মল?
তিনটে ঘর। দুটো নিমাইদা ব্যবহার করেন। আর একটা আছে কোনও গেস্ট এলে থাকেন। এখনও কেউ থাকেনি এখানে নতুন চাঁদর পাতা হয়েছে আপনার জন্য। একটু শুয়ে থাকুন।
আশ্চর্যের বিষয়, এই প্রস্তাবটিও বাক্যব্যয় না করে মেনে নিল সে। শরীরটা সত্যিই আর দিচ্ছিল না। বীণা শুয়ে পড়ল। বেশ নরম বিছানা। নির্মল জানালার পর্দা টেনে দিল। তারপর বেরিয়ে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে গেল সাবধানে।
