কিন্তু যাবেই বা কোথায় সে? বাপের বাড়িতে ঝকঝকে দালান উঠেছে, একটু জায়গা সেখানে হতে পারে। কিন্তু সেখানেই বা কী আছে? কোন সুখ?
আজ সকালটা বড় ভারী। কেমন যেন!
এতদিনে কি কাকার রাগ পড়েনি? এককালে কাকা তো তাকে কতই স্নেহ করত। একবার যাবে নাকি কাকার কাছে? গিয়ে হাতজোড় করে বলবে, আর পারছি না কাকা, এ বারটা যদি ক্ষমা না কর তা হলে যে আমাকে গলায় দড়ি দিতে হয়।
না, কাকার কাছে আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে আর গিয়ে দাঁড়ানো যাবে না কখনই। কিন্তু কথাটা নির্লজ্জর মতো মাঝে মাঝে ভাবে সে।
সজল এল একটু বেলায়। একটু উস্কোগুস্কো চেহারা। বেচারা বড়লোক ধরার চেষ্টা করতে করতে হন্যে হয়ে গেল। ভাল একজন স্পনসর পেলেই যাত্রার দল খুলবে। কিন্তু কেউ বিশেষ আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
চা খাওয়াবে নাকি বীণা?
বীণা বিরস গলায় বলল, শরীর ভাল নেই।
কেন, কী হয়েছে?
সে জানি না। আজ আমি কিছু করব না।
গলার স্বর শুনে মনে হয় কান্নাকাটি করেছ।
মেয়েমানুষ অনেক কাঁদে। ছুতো পেলেই।
তুমি তো শক্ত মেয়ে, সহজে কদার পাত্রী নও।
এককালে শক্ত ছিলাম। আজ নেই।
সজল টুলের ওপর বসল। বিছানর দিকে চেয়ে বলল, টাকাগুলো তুলে রাখো। হাওয়া দিচ্ছে, উড়ে যাবে।
বীণা হাত বাড়িয়ে টাকাগুলো খামচে বালিশের তলায় চাপা দিয়ে রেখে বলল, তোমার কী হল?
কী আর হবে। চেষ্টা করে যাচ্ছি, হার মানছি না। তবে বাজার বড় সাজাতিক। আমার মতো আনাড়িকে কেউ পাত্তা দিতে চায় না। তোমার কথাও বলছি চারদিকে। আমার দলে তুমি থাকবেই। কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছে না।
আমার কথায় কাজ হবে কেন? আমি কোন্ বিনোদিনীটা বল তো?
আমার ধারণা ছিল এই অঞ্চলে তোমার খুব নাম। নাম যে নেই তাও নয়। সকলেই তোমাকে চেনে। কিন্তু উৎসাহ দেখাচ্ছে না।
তুমি বোকা। ভুলে যাচ্ছ কেন যে, আমার বদনামও আছে? কাকা তো আমাকে চুরির দায়ে তাড়িয়েছে।
ধুর! ওটা কোনও কথা নয়। যতদূর জানি কাকা তোমার বদনাম করে বেড়ায় না। তাছাড়া এ সব করার তার সময়। কোথায়? সে এখন নতুন নতুন পালা নিয়ে ব্যস্ত। দল বড় হচ্ছে। চিৎপুরে ঘর নিচ্ছে শুনলাম। পুরোপুরি পেশাদার ব্যাপার।
সব জানি। আমার মতো চুনোপঁটিকে নিয়ে ভাববার তার সময় নেই। তবু আমার বদনাম আমার চারদিকে একটা বেড়া তুলে দিয়েছে। তুমি বরং বনগাঁ ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে দল করো।
সে চেষ্টাও কি করিনি? এখানে দল করতে গেলে কাকা হামলা করতে পারে। সে হামলা না করলেও কম্পিটিশনে তার সঙ্গে পারব না। কিন্তু কোথাও কিছু সুবিধে হচ্ছে না।
তা হলে আর আয়ুক্ষয় করছ কেন?
কী করব তা বলতে পারো। আমার তো মাথায় কিছুই আসছে না।
কাকার মতো স্মাগলিং করো।
কী যে বলো! ও সব পারব না।
বীণা একটু হাসল। বলল, বড় শখের মূল্য দিতে হয়। নীতিকথা মেনে চলতে হয় না।
নীতিকথা মানিও না। বাঁচার জন্য সব কিছু করা যায়। কিন্তু সবার তো সব রকম গাট থাকে না। আমার ধাত ওরকম নয়। দেখ, শশা বিজনেসের চেয়ে ভাল বিজনেস কিছু নেই। আমি পারলে ওটাই পারব।
বীণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তা হলে চেষ্টা করে যাও।
করছি বীণা। তোমাকে একটা কথা বলব? অভয় যদি দাও।
বলই না। নাটক করার দরকার নেই।
তোমার হাজব্যান্ডের ব্যবসাটা ভালই চলছে শুনি। উনি আরও একটা হোটেল খুলছেন। জানো?
একটু অবাক হয়ে বীণা বলে, না। কিন্তু হঠাৎ তার কথা কেন?
বলছিলাম কি, নিমাইবাবুকে একবার অ্যাপ্রোচ করলে হয় না?
ভ্রূকুটি করে বীণা বলল, তার মানে?
উনি ইচ্ছে করলে আমাদের ফিনান্স করতে পারেন। দলের মালিকানা ওঁরই থাকবে, আমরা লাভের একটা অংশ পারিশ্রমিক নেবো।
বীণা প্রচণ্ড রাগের একটা উত্তাপ টের পেল তার মাথায়। রগের শিরাগুলো দপদপ করতে লাগল। কঠিন চোখে চেয়ে সে বলল, তুমি কি জানো ও লোকটাকে আমি কত ঘেন্না করি?
সেটা তো পারসোনাল লেভেলে। কিন্তু প্রফেশনাল লেভেলে হেল্প নিতে ক্ষতি কী? ওরও লাভ, আমাদেরও সাত। পিওর পার্টনারশিপ।
তুমি এক নম্বরের আহাম্মক বলেই এ কথা ভাবতে পারলে। যাত্রার দল খোলার কথা ভাবতে ভাবতে তুমি উন্মাদ হয়ে গেছ। সব জায়গায় পার্টনারশিপ চলে না। আত্মমর্যাদা বলে একটা জিনিস আছে।
সজল উত্তেজিত না হয়ে বলল, আচ্ছা, তুমি অত রেগে যাচ্ছ কেন? বাঁচার জন্য স্বাগলিং করার চেয়ে তো এটা ভাল।
ও কথা আর মুখে এনো না। তা হলে তোমার সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে না।
ঘাট হয়েছে বাবা। কিন্তু নিমাইবাবুর মাসোহারা তো নিচ্ছ বীণা। সেইজন্যই সাহস করে কথাটা পড়লাম।
মাসোহারা নিই কে বলল?
তা হলে?
আমার কাছে তার অনেক দেনা আছে। কষ্টের দিনে নিজে না খেয়েও তার সংসার টেনেছি। এখন সে সেই দেনা শোধ করছে। সে কথা তোমাকে বলেছি।
সরি বীণা। তোমার অতীতের কথাটা আমার খেয়াল ছিল না।
বীণা কিছুক্ষণ মুখটা জড়ো করা হাঁটুর মধ্যে খুঁজে রাখল। তারপর মুখ তুলে বলল, তাও নিতাম না, যদি কাকার চাকরিটা থাকত।
সজল কিছুক্ষণ গুম হয়ে থেকে বলল, তোমার রেফারেন্স না দিয়ে যদি নিমাইবাবুকে অ্যাপ্রোচ করি?
বীণা কঠোর গলায় বলে, কখনই নয়। ওকে ছেড়ে তুমি অন্য কথা ভাবো।
সজল কবুণ মুখ করে বলে, আর যে কাউকে রাজি করাতে পারছি না। শুনেছি উনি বেশ দয়ালু লোক।
দয়ালু নয়, দুর্বল লোক। কিন্তু ওকে ভুলে যাও সজল।
তা হলে একটা পরামর্শ দাও। এ ভাবে বসে থাকার মানে হয় না।
আমিও তো বসে আছি।
