পরদিন দুপুর বারোটায় জিনস্, সাদা শার্ট আর বড় রোদ চশমা পরা অনুকে যখন গাড়িতে তুলে নিল সে তখন কৃষ্ণজীবনের ভিতরে একটা কিছু হচ্ছিল। একটা সিরসিরে গোপন কাপন। মানুষ। এসব প্রবণতাকে বুদ্ধি ও বিবেচনা দিয়ে চাপা দেয়।
কোথায় যাব আমরা এখন।
কৃষ্ণজীবন হাসল, চল কোনও ভাল রেস্টুরেন্টে বসি।
আমার কিন্তু খিদে নেই।
এঃ হে, তোমাকে আজ লাঞ্চে ডাকলেই হত।
কেন ডাকেননি?
বড় ভুলে যাই যে!
এরকম আনমাইডফুল বয়ফ্রেন্ড নিয়ে যে আমার কী মুশকিল।
আইসক্রিম তো খেতে পারবে।
পারব।
তা হলেই হবে। চল।
খুব দামী একটা হোটেলের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত রেস্তোরাঁয় তারা বসল। কৃষ্ণজীবন তার হাতে টাইপ করা কয়েকটি শিট দিয়ে বলল, পড় তো।
অনু যখন পড়ছিল তখন তাকে লক্ষ করছিল কৃষ্ণজীবন। মেয়েটা এমনিতে একটু ফাজিল, কিন্তু যে-ই পড়তে শুরু করল অমনি গম্ভীর, স্থির, একাগ্র হয়ে গেল। একবারও চোখ তুলল না। খুব খুশি হল কৃষ্ণজীবন। মেয়েটা হয়ত কেবল ফাজিলই নয়, ভিতরে ভিতরে সিরিয়াস।
কয়েকটা পাতা ধীরে ধীরে পড়ে শেষ করল অনু। তারপর মুখখানা যখন তুলে তার দিকে তাকাল, তখন মেয়েটার মুখখানা লাবণ্যে ভরে গেছে।
বুঝতে পারছ অনু?
পারছি না? কী যে বলেন। কী অদ্ভুত লেখা!
শুধু প্রশংসা করলেই তো হবে না। ক্রিটিক্যালি পড়লে তবে আমি নিশ্চিন্ত হব।
ক্রিটিক্যালি! যা খুব সত্যি তাকে কি ক্রিটিসাইজ করা যায়?
ভোলাচ্ছ না তো!
না। আমি সে রকম গার্ল ফ্রেন্ড নই। আমি সিরিয়াস। আপনি একজন অদ্ভুত মানুষ। আমার কান্না আসছিল পড়তে পড়তে।
দ্যাটস গুড। দ্যাট ইজ ভেরি গুড। তোমার কি মনে হয় মানুষ এই লেখা পড়ে নড়েচড়ে বসবে। বই পড়লে মানুষের কিছু প্রতিক্রিয়া হয়। সেটা তাৎক্ষণিক। আমি চাই এমন লেখা লিখতে যা পড়ে মানুষ সত্যি করে কিছু করতে চাইবে এবং করবে।
অনু তার একখানা হাত বাড়িয়ে কৃষ্ণজীবনের হাতের ওপর রেখে একটু চাপ দিয়ে বলল, আপনিই হয়ত পারবেন। আমি তো অত বুঝি না।
তাও ঠিক। তোমার অভিজ্ঞতা কতটুকুই বা!
আমার আইসক্রিম কই?
আসবে। আমি বেয়ারাকে পরে আসতে বলেছি।
এবার ডাকুন।
কৃষ্ণজীবন অনুর জন্য আইসক্রিম আর নিজের জন্য কফির অর্ডার দিয়ে তৃপ্ত মুখে বসল।
তিন মাস বাদে বলডিং হেড বেরল আমেরিকা থেকে। নিউ ইয়র্কে রিলিজের দিন উপস্থিত ছিল কৃষ্ণজীবন। টিভি থেকে ছোট্ট সাক্ষাৎকার নিল তার।
রাতে হোটেলের ঘরে অন্ধকারে একা বসে কাচের শার্সি দিয়ে বাইরে চেয়ে সেন্ট্রাল পার্কের দৃশ্য দেখছিল সে। দেখতে দেখতে সে চলে গেল বিষ্টুপুর গায়ে, তার ছেলেবেলায়। কাদাজল ভেঙে ইস্কুলে যাচ্ছে। মাথায় কচুপাতা এক হাতে ধরা, জামার নিচে বইখা অন্য হাতে ধরা। খালি পা। চলেছে চলেছে। পথ ফুবোয় না আর। পিছল পথ। উঁচু নিচু পথ। কত দূরে ইস্কুল।
১০৭. মাসে মাসে পাঁচশো করে টাকা
মাসে মাসে পাঁচশো করে টাকা পাঠাচ্ছে নিমাই। মাসের প্রথমেই একটা ছেলে এসে দিয়ে যায়। হাত পেতে টাকাটা নিতে ইচ্ছে করে না বীণার। কিন্তু তবু নেয়। না নিলে তার চলবে কি করে? নিমকহারাম নিমাইয়ের জন্য তো সে কম করেনি। যদি সেই ঋণ শোধ করতে চায় তা হলে করুক। একটু বাধোবাধো লাগলেও পুরনো কথা ভেবে বীণ নেয়।
যে ছেলেটা টাকা দিয়ে যায় সে আজ সকালেই এসেছিল। বীণা কোনওদিন তাকে বসতে বলে না, কোনওরকম আপ্যায়ন করে না। নিমাইয়ের লোককে সে তা করবেই বা কেন? তবে ছেলেটা জারি দ্ৰ আর বিনয়। খুব নরম গলায় কথা বলে। আজ যখন এসে ঘর্মাক্ত মুখে একটু হেসে পকেট থেকে টাকা বের করে হাতে দিল তখন বীণার একটু মায়া হল। হঠাৎ বলল, তোমার নামটা কী বল তো!
নির্মল রায়।
কী করো।
নিমাইদার দোকান দেখাশুনো করি, সঙ্গে থাকি।
একটু বসে জিরিয়ে নাও। চা খাবে?
চা আমি খাই না।
তা হলে জল খাও।
ছেলেটা অনাবিল আনন্দের হাসি হেসে বলল, একটু আগেই রাস্তার কল থেকে জল খেয়ে এসেছি। বাসে খুব তেষ্টা পেয়েছিল।
আমার ঘরে খাবারটাবার কিছু তেমন থাকে না। মুড়ি খেতে পারো। খাবে?
না। আমি খেয়েই বেরিয়েছি।
তাহলে তোমার সঙ্গে কি দিয়ে ভদ্রতা করি?
ছেলেটা জিব কেটে বলল, কিছু লাগবে না দিদি।
নির্মলের হাসিটা বড় ভাল লাগল বীণার। সরল সোজা ছেলে। রংটা কালো হলেও মুখখানায় মায়া মাখানো। এখনও দুনিয়ার পাপ একে পায়নি।
তা হলে আসি?
এসো গিয়ে।
নিমাইদাদাকে কিছু বলার নেই তো!
না। কী বলার থাকবে? প্রথমবার তুমি টাকা দিয়ে একটা কাঁচা রসিদ লিখিয়ে নিয়েছিলে। মনে আছে? আর নাও না তো!
ছেলেটা লজ্জা পেয়ে একটু হেসে বলল, আর লাগবে না।
ছেলেটা চলে গেছে। বিছানার ওপর টাকাগুলো পড়ে আছে অবহেলায়। বীণা এক ধারে চুপ করে বসা। এই মাসোহারা ভাঙিয়ে তাকে বেঁচে থাকতে হবে নাকি? এই দয়ার দানে? চোখ থেকে মন থেকে স্বল্পগুলো সব মুছে যাচ্ছে। আলো, হাততালি, উল্লাস, ভরা আসরে নেমে প্রাণ ঢেলে অভিনয়—সব কি মরীচিকার মতো মিলিয়ে গেল? এখন গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য চেয়ে থাকতে হবে কাঁচরাপাড়ার দিকে? তার যে বড় অপমান লাগে।
কিছুক্ষণ অঝোরে চোখের জল ফেলল বীণাপাণি। বুকটা এত ভার হয়ে থাকে যে, বলার নয়। মাথা ধরে। শরীর বিবশ হয়ে যায়। মনের কষ্টে তার কি একটা লোগ পাকিয়ে উঠছে? মাথাটাও পাগল-পাগল লাগে আজকাল। কতকাল পালা নেই, রিহার্সাল নেই, প্রশংসা নেই, এখানে ওখানে দল বেঁধে যাওয়া নেই। বনগাঁয়ে থেকে তা হলে আর কী লাভ?
