আপনি ডারলিং আর্থ-এ এ কথা লিখেছেন।
লিখছি। বলছি। আর কী করতে পারি বলুন! কিছুতেই কাউকে বুঝিয়ে উঠতে পারছি না, এখন পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য আমাদের একসঙ্গে বসা উচিত। জড়ো করা উচিত অল আওয়ার রিসোর্সেস। সবচেয়ে গুরুতর কাজ এখন এটাই। নইলে পৃথিবী চলে যাবে শয়তানের থাবায়। শুধু পরিবেশ তো নয়, মানুষকে ধরেছে আরও হরেক রকম ক্ষয়। আপনি কি জানেন হোমোসেকসুয়ালিটি একটা রোগ। মননীবিকার?
তাই তো মনে হয়।
এর থেকে পরিত্রাণ চাইছে না মানুষ। চাইছে তার এই রোগকে রাষ্ট্ৰীয় স্বীকৃতি দেওয়া হোক। হোমোসেকসুয়াল আর লেসবিয়ান মানুষ ও মহিলারা জোটবদ্ধ হচ্ছে, মিছিল করছে, আলাদা অলিম্পিক করছে, যেন সেটাই স্বাভাবিকতা।
জানি।
আরও কি জানেন যে, বাপ-মায়ের সঙ্গে সন্তানের যৌন সংসর্গকে পর্যন্ত রাষ্ট্ৰীয় তকমা এঁটে পাশ মার্কা দেওয়ার আয়োজন চলছে?
তাও জানি।
আপনি কি মানেন পৃথিবীর গম্ভীর গভীরতর অসুখ এখন?
মানছি।
এই অসুখ আমাকে দিনরাত কুরে কুরে খাচ্ছে। প্রাইজ দিয়ে আমি কি করব বলুন তো! কয়েক সেকেন্ড টিভি কভারেজ, মালা, রাষ্ট্রপতির হাত থেকে বেঁতে হাসি হেসে পুরস্কার নেওয়া—গোটা ব্যাপারটাই এত কৃত্রিম! জীবনে বহুবার আমাকে এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
হেমাঙ্গ হেসে প্রসঙ্গান্তরে গেল, এবার বলুন বলডিং হেড কতদূর এগোল।
শেষের দিকে। প্রকাশকরা তাগাদা দিচ্ছে। আমি একটু সময় নিচ্ছি। লেখা শেষ হতে আরও মাসখানেক। তারপর রিভিশন।
সামনের বছর বেরোবে?
মনে হয়।
আমি অপেক্ষা করছি।
আপনি একজন অত্যন্ত ভাল লোক। আপনি সত্যিই পৃথিবীকে ভালবাসেন।
ধন্যবাদ।
আরও দু-চারটে কথার পর ফোন রাখল কৃষ্ণজীবন। মন তিক্ততায় ভরা।
রিয়া কাছেপিঠেই ছিল। ফোন রাখার সঙ্গে সঙ্গে সামনে এসে দাঁড়াল।
কে ফোন করেছিল?
হেমাঙ্গবাবু।
কী বলছিলেন উনি?
এমনি। কেমন আছি জিজ্ঞেস করলেন।
একটা প্রাইজের কথা শুনলাম যেন!
ও কিছু নয়।
কে প্রাইজ পেল? তুমি নাকি?
কৃষ্ণজীবন একটু লজ্জিত হয়ে বলল, হ্যাঁ, সেরকমই বলছিলেন।
কী প্রাইজ?
তা জিজ্ঞেস করিনি। বোধহয় সেন্ট্রাল গর্ভনমেন্টের কিছু একটা হবে।
অত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার কী আছে? প্রাইজ তো একটা সম্মান।
হ্যাঁ। তা ঠিক।
তা হলে বলছ না কেন?
কৃষ্ণজীবন তার ক্লান্ত বিষণ্ণ দুটি চোখে তার সুন্দরী স্ত্রীর মুখের দিকে একটু চেয়ে থেকে বলে, আমি জানি না রিয়া। রেডিও বা টিভি-তে হয়ত আবার বলবে। শুনে নিও।
তুমি ইন্টারেস্টেড নও?
না। প্রাইজ নিয়ে লাফালাফি করার কিছু নেই। যখন দেবে, হাত পেতে নেব। আর কি?
এতক্ষণ গলায় একটু ধমক ছিল রিয়ার। এবার হঠাৎ কোমল হল। বলল, তুমি কেন এরকম গো? তুমি কেন আর পাঁচজনের মত নও? তোমার জন্য যে আমার ভয় করে।
কৃষ্ণজীবন তটস্থ হল। অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। কিছু বলল না।
রিয়া বলল, এইজন্যই তো তোমার সঙ্গে আমার লেগে যায়। তোমার কোনও রি-অ্যাকশনই হয় না কোনও কিছুতে। এইজন্যই তো আমি মাঝে মাঝে পাগল হয়ে যাই।
কৃষ্ণজীবন মৃদু একটু হেসে বলল, আমি পাঁচজনের মতোই। তবে আমার তো অনেক চিন্তা, তাই বোধ হয় রিঅ্যাকশন কম হয়।
না, তা নয়। তুমি বোধ হয় একজন মস্ত মানুষ। আমি বোধ হয় তোমাকে ঠিক বুঝতে পারি না। না গো?
ঘন ঘন মাথা নেড়ে কৃষ্ণজীবন বলল, তা নয়, তা নয়। ওরকম ভাবতে নেই রিয়া। আমি কত সামান্য তা তুমি জানো না।
রিয়া তার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে। তার দু চোখ বেয়ে টস টস করে জল গড়িয়ে নামে। একটু ফুঁপিয়ে উঠে বলে, আমি মাঝে মাঝে তোমার সঙ্গে রাক্ষুসির মত ব্যবহার করি। কিন্তু তুমি যে…
কথা শেষ করতে পারল না রিয়া। ভেঙে পড়ল।
দ্বিতীয় ফোনটা এল গভীর রাতে, যখন কৃষ্ণজীবন তার রচনার মধ্যে ড়ুবে আছে। সে যে পরিচ্ছেদটা লিখছিল তার শিরোনাম কপালকুণ্ডলার সেই বিখ্যাত লাইন, পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?
কী করছেন আপনি এখন? লিখছেন তো!
হ্যাঁ। তুমি কেমন আছ?
আচ্ছা, আমি যে বড় হয়েছি তা আপনি লক্ষ করছেন?
কৃষ্ণজীবন হাসল, করছি।
কেমন লাগছে আপনার আমাকে এখন?
তুমি তো সুন্দর মেয়ে।
আহা, ওভাবে বান্ধবীকে কমপ্লিমেন্ট দিতে হয়? একদম গাঁইয়া হয়ে যাচ্ছেন কিন্তু।
গাঁইয়াই তো ছিলাম!
সে ছিলেন তো ছিলেন, এখন ইউ আর এ ফেমাস ম্যান, এ সেব্রিাইটি। আপনি যে একটা প্রাইজ পেলেন আমি জানি।
ওটা কিছু নয়।
তাও জানি। আপনি একটা খুব অহঙ্কারী লোক।
আমি তো উল্টো জানতাম।
মোটই না মশাই। আচ্ছা বলডিং হেড কি আমি একটু অ্যাডভান্স পড়তে পারি না?
পারো। ইন ফ্যাক্ট আমি একজন কাউকে শোনাতে চাইছিলামও।
সত্যি? তা হলে কবে?
তোমার কখন সময় হবে?
আমার তো এক্ষুনি আপনার কাছে যেতে ইচ্ছে করছে।
পাগল। বলে হাসল কৃষ্ণজীবন। তারপর বলল, কাল আমার ক্লাস নেই।
আমিও স্কুল পালাব। কোথায় আর কখন?
একটু ভাবল কৃষ্ণজীবন। তারপর বলল, বেলা বারোটায় গোল পার্কের রেলিং-এর সামনে থেকো। তুলে নেব।
খিক খিক করে হাসল অনু। বলল, উইল ইট বি সিক্রেট অ্যান্ড রোমান্টিক মিটিং?
নো, নটি গার্ল। ইট উইল বি অ্যান অ্যাকাডেমিক মিটিং।
আচ্ছা বাবা, তাই হোক। তবু তো কিছুক্ষণ কম্পানি পাওয়া যাবে।
তোমার এখনও একটা বয়ফ্রেন্ড জুটল না?
কে বলল জোটেনি?
কে সে?
আপনিই তো আমার বয়ফ্রেন্ড।
কৃষ্ণজীবন হাসল। বলল, বড্ড পাকা হয়েছে।
কত বয়স হল জানেন? এখন আমি আর গার্ল নই, এ উওম্যান।
