এইভাবে এগিয়ে গেল তার দ্বিতীয় গ্রন্থ, দি বলডিং হেড। কখনও পরিসংখ্যান, কখনও অঙ্ক, কখনও নীরস বিজ্ঞানের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে পুরাণ, ওল্ড টেস্টামেন্ট, কোরান, রিলকে, লোরকা, বোদলেয়ার, টলস্টয়, রবীন্দ্রনাথ, মিশে যাচ্ছে স্মৃতি, লোকগাথা, রূপকথা। বন্ধুহীন এক প্রবহমানতা। রূপসী বাংলার কত কবিতার যে অনুবাদ ঘটাল সে! লিখতে লিখতে সংশয় আসে, এ কি তরল ছেলেমানুষী হয়ে যাচ্ছে। এ কি হয়ে যাচ্ছে একান্ত ব্যক্তিগত রচনা। মাঝে মাঝে তার কাউকে শোনাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কাকে শোনাবে? কার সময় আছে? কে শুনবে মন ও কান দুই-ই নিবিষ্ট রেখে?
সংসার ছেড়ে হয়ত একদিন তাকে পরিব্রাজক হয়ে যেতে হবে। এ সংসার তাকে কিছুই দেয়নি, দিতে পারবে না আর। রিয়া তাকে শাসন করতে করতে এমন একটা সীমারেখায় পৌঁছে দিয়েছে সেটা যেন ঘর ও বাইরের মধ্যবর্তী চৌকাঠ। পেরোলেই মুক্তি। সে সহ্য করতে পারে না চটুল হিন্দি গান বা ভিসি আর-এ যখন তখন সিনেমা চালানো, জোরে কথা বলা, অকারণে রাগারাগি চেঁচামেচি, ঝি-এর সঙ্গে বিতর্ক তাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। সে কখনও কাউকে শাসন করতে পারে না, তর্ক বা ঝগড়া সে কখনও করেই না। তবে কি তার রাগ হয় না? হয়। কিন্তু সেই রাগ যেন এক অন্ধ হাতির মত দাপাদাপি করে তারই ভিতরে। তার হৃদযন্ত্রে, পাকস্থলীতে, ফুসফুসে, মস্তিষ্কে সর্বত্র সেই অন্ধ রাগের ধাক্কা গিয়ে লাগে। তাকে ক্লান্ত করে দেয়, বিধ্বস্ত করে ফেলে, নিঃকুম করে দেয়।
রিয়ার রাগ আজকাল এতই বেড়েছে যে সে আর তার মুখোশটাও রাখছে না মুখে। বারবার সে পনের লক্ষ টাকার হিসেব চাইছে। বিষ্টুপুরের বাড়ি নিয়ে তার দাপাদাপিও সাঙ্ঘাতিক। তার ধারণা হয়েছে সব টাকা ঢেলে ফেলেছে সে গাঁয়ের বাড়ির পিছনে। তাকে শোষণ করে নিচ্ছে তার আত্মীয়রা।
কোনও কথাই সে রিয়াকে বোঝাতে পারে না। একদিন চেষ্টা করতে গিয়েছিল, রিয়া হঠাৎ উন্মত্তের মতো প্রথমে একটা স্টিলের গেলাস ছুঁড়ে মারল তাকে। সেটা কৃষ্ণজীবনের কাঁধে সামান্য আঘাত করে ছিটকে গেল। পরের ঘটনা মারাত্মক। একটা রুটি বেলার বেলন দিয়ে ঘাড়ে, কপালে, গালে, হাতে এলোপাথাড়ি মারল তাকে। কৃষ্ণজীবন চুপ করে দাঁড়িয়ে শুধু ক্ষীণ আটকানোর চেষ্টা করে গেল। কোনও শোধ নিল না। সে অবাক দুটি চোখে ক্রোধ ও আক্ৰোশের বিকৃত চেহারাটা দেখছিল। এ সবই তার অভিজ্ঞতার সঞ্চয়। এই পৃথিবী থেকে সে কত কিছু শেখে রোজ!
ঘটনার সময়ে ছেলেমেয়েরা বাড়িতে ছিল না। কিশোরী একটি ঝি ছিল। সেই পরে এসে তুলে ভিজিয়ে তার ক্ষতস্থানের রক্ত মুছিয়ে দিয়েছিল।
না, কৃষ্ণজীবনের এত কিছু যায় আসে না। শুধু মনঃসংযোগ কেটে যায়। হারিয়ে যায় চিন্তার সূত্র। তাকে অপমান করবে কে? ধুলোমাটি থেকে সে উঠে এসেছে। তার অস্তিত্বের সর্বাঙ্গেই তো অবমাননার ধুলোমাটি লেগে আছে। তার কোনও জ্বালা-যন্ত্ৰণা নেই।
সংসারে তার একটা মাত্র বন্ধু। দোলন। কিন্তু দোলনও কত বড় হয়ে গেল! আগে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমোত। আজকাল একটু তফাত। আর আগের মত আবোল-তাবোল কথা হয় না তাদের মধ্যে।
সংসারের বধন কি শিথিল হয়ে এল তার কাজের মধ্যে, লেখার মধ্যে যখন ড়ুবে যায় তখন তার তথাকথিত আপনজনেরা হারিয়ে যায় কোথায়। এই যে বলডিং হেড লিখছে সে, লিখতে লিখতে যেন কোন অতলে তলিয়ে যাচ্ছে সে। বারবার চলে আসছে কত তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা, কত স্মৃতির টুকরো, কত বৃষ্টির বিকেল, শীতের রাত, দেশ ও বিদেশের কত ল্যান্ডস্কেপ, ট্রামে বাসে ট্রেনে শোনা কথা, সংলাপের অংশ। লিখতে লিখতে নাওয়া-খাওয়া ভুল হয়ে যায়।
আমেরিকা থেকে পাবলিশার তার দ্বিতীয় গ্রন্থের জন্য অগ্রিম দশ হাজার ডলারের একটা চেক পাঠিয়ে দিয়েছে। এ টাকার কথা গোপন করতে হল তাকে রিয়ার কাছে। কাজ কি অশান্তি বাড়িয়ে। সে মরে গেলে এ সব টাকা তো ওরাই পাবে। আপাতত টাকার কথাটা চাপা থাক।
কিন্তু টাকার এই আকর্ষণ, এই গুরুত্বকে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না সে। গরিব ঘরের ছেলে, প্রাণান্তকর কষ্টের মধ্যে বড় হয়েও কেন সে টাকার মূল্য বুঝছে না, এ প্রশ্নের জবাব সে তার বাবাকেও দিতে পারেনি সেদিন।
কৃষ্ণজীবন টের পায় দিন দিন সে এক গভীর নিঃসঙ্গতার মধ্যে চলে যাচ্ছে। তার বন্ধু নেই, আত্মীয় নেই, ভালবাসার লোক নেই কেউ। শুধু সে আর কাজ।
উত্তেজিত একটা টেলিফোন এল এক সকালে।
হ্যালো, আপনি কি মর্নিং নিউজটা শুনেছেন টিভি-তে?
না তো!
আমি হেমাঙ্গ বলছি। আপনি যে বিরাট একটা প্রাইজ পেয়েছেন।
কৃষ্ণজীবন উদাস গলায় বলল, আপনি কেমন আছেন? অনেকদিন আপনার দেখা নেই।
আরে মশাই, আমি ভালই আছি। আপনি যে প্রাইজ পেলেন সে বিষয়ে একটু রি-অ্যাকশন দেখান!
ওরা যে কেন আমাকে প্রাইজ দেয় কে জানে। পৃথিবী গোল্লায় যাচ্ছে, প্রাইজ দিয়ে কী হবে বলুন তো?
আচ্ছা মানুষ আপনি। একটু খুশি হবেন তো!
খুশি! তা খুশিই না হয় হলাম, ফর ইওর সেক। কিন্তু আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, প্রাইজ আসলে ঘুষ। আমার প্ল্যান বা পরামর্শ কিছুই ওরা নেবে না, ফাইল বন্দি করে ফেলে রাখবে। আর প্রাইজ দিয়ে বন্ধ রাখবে আমার মুখ।
আপনি একজন ইমপসিবল মানুষ। কিন্তু এরকমই থাকুন। খাঁটি লোক পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমে।
কৃষ্ণজীবন একটু হাসল, হারিয়ে যাচ্ছে না। তেমন মানুষ জন্মাচ্ছেই না আর। জন্মও একটা বিজ্ঞান। মানুষ তা মানছে। কই। অপমানুষে পৃথিবী ভরে যাচ্ছে।
