কৃষ্ণজীবনও একটু হাসল। তারপর বলল, আপনার যে কিছুই লাগে না তা আমি জানি।
বিষ্ণুপদ একটা সরল শ্বাস ফেলে বলল, বড় কষ্ট করে বড় হয়েছে। বাবা, তুমি জানবে না তো কে জানবে? কত অল্পে কত সামান্য নিয়েও মানুষের চলে যায়, তা তুমি ভালই জানো।
কৃষ্ণজীবন মেদুর চোখে চেয়ে বসে রইল। জবাব দিল না। জীবনের গম্ভীর গভীরতর মর্মস্থল থেকে মাঝে মাঝে উঠে আসে হলাহল, মাঝে মাঝে উঠে আসে অমৃত। মন্থন করো, জীবনের গভীরে দাও ড়ুব। নইলে ওপরসা ওপরসা ভেসে বেড়ানো হবে, লাগবে হাজার উপকরণ, বোঝাই যাবে না কেন জন্ম, কেন এই জীবনযাপন।
কৃষ্ণজীবন মৃদু স্বরে বলল, বামার বউ আমার কাছে গিয়েছিল। সে কিছু টাকা চায় আর ওই রামজীবনের বাড়িটা চায়।
তুই কি বলেছিস?
আমি কিছু বলিনি। বলেছি, ভেবে, পরামর্শ করে বলব।
কত টাকা চায়?
এক লাখ।
কেন?
বলছে তাদের বড় অভাব, বামার চিকিৎসার জন্য মেলা খরচ হচ্ছে, এইসব আর কি!
বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, টাকার জন্য আমার ওপরেও হামলা করেছিল। লোভে পাগল হয়ে গেছে।
আমার মনে হয় টাকাটা দিয়ে ওদের ঠাণ্ডা করে দেওয়াই ভাল। নইলে আবার এসে আপনাদের জ্বালাতন করবে।
তুমি অনেক শিখেছে। বাবা, তবু লোকচরিত্র বোঝো না। ওদের লাখ লাখ টাকা দিয়েও কিছু হবে না। ওটা তো খিদে নয়, হাঁকাই। টাকা দাও, ফের কিছুদিন পরে এসে হাত পেতে দাঁড়াবে।
দেবো না তাহলে?
না বাবা। তুমি গরিবের ছেলে হলে কি হবে, এখনও টাকার ওপর তোমার কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। ভাবো বুঝি টাকা দিয়েই সব সমস্যা মেটানো যায়! ওরকম ভেবো না।
কৃষ্ণজীবন একটু হাসল, সবাই যে টাকা-টাকাই করে।
তোমার টাকার ওপর মায়া হল না কেন বলো তো?
মায়া? কিসের মায়া বাবা?
তুমি গরিবের ছেলে, নুন জুটতো তো পান্তা জুটিত না তোমার, জুতো জামা বই খাতা পেনসিলের জোগাড় ছিল না, সেই তুমি এখন টাকার মুখ দেখলে, তবু টাকাকে তোমার খোলামকুচি মনে হয় কেন বাবা?
কৃষ্ণজীবন একটু হেসে বলে, টাকা নিয়ে ভাবতে বলেন নাকি বাবা?
না, তবে টাকা বড্ড উড়ছে তোমার চারদিকে। ঠিক জোচ্চোরেরা ঘিরে ধরবে। শ্যামলীকে বেশি প্রশ্রয় দিও না। ওদের টাকার অভাব নেই। দুটি মোটে মানুষ, বামা চাকরিও করে। ওদের অভাব কি? তবে রামজীবনের ওই বাড়িটায় এসে যদি থাকতে চায় তো থাকবে। রেমোর কাছে কথাটা পাড়াবখন।
সেই বুদ্ধিই ভাল।
এ বাড়ির পিছনেও তুমি অনেক টাকা ঢেলেছে। এতটা না করলেও হত। বউমা আর ছেলেপুলেদের দিকটাও তো দেখতে হয়!
তাদের জন্যও অনেক আছে বাবা। বেশি টাকাও ভাল নয়। হঠাৎ হাতে বেশি টাকা পড়লে সৎকাজে ব্যয় করা ভাল। নইলে ছেলে।পুলে ওই টাকার পাল্লায় পড়ে নষ্ট হয়।
বিষ্ণুপদ একটু চুপ করে থেকে হঠাৎ অনাবিল হাসিতে মুখ উদ্ভাসিত করে বলল, একটা বড় ভাল কথা শুনলাম আজ। বেশ বলেছে। বাবা।
কৃষ্ণজীবন চুপ করে কিছুক্ষণ বসে থাকে। আজ যে ছেলের মেজাজ ভাল নেই তা বুঝতে পারে বিষ্ণুপদ। সেও কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
কৃষ্ণজীবন হঠাৎ বলে, আপনার বা চোখের ছানিটা বোধহয় ম্যাচিওর করে গেছে। কিছু দেখতে পান বা চোখে?
বিষ্ণুপদ ডান চোখে হাত চাপা দিয়ে বা চোখে চারদিকটা দেখে নিয়ে হাসতে হাসতে বলে, না। বড্ড ধোয়া ধোয়া। এই যে তোকে দেখছি, একটা কেউ বসে আছে বোঝা যায়। তার বেশী নয়। তবে ডান চোখে দেখি।
বাঁ চোখটা কাটিয়ে নিতে হবে।
দরকার কি? দেখার আছেই বা কি? চলে তো যাচ্ছে!
না বাবা। বেশি ম্যাচিওর করে গেলে চোখটা যাবে। এসব পুষে রাখা ভাল নয়। আমি কলকাতায় ফিরেই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলব। আজকাল ঝামেলা কম। মাইক্রো সার্জারি করালে এক দিনের বেশি আটকেও থাকতে হয় না।
আবার খরচের পাল্লায় পড়বে?
কৃষ্ণজীবন হেসে বলে, মানুষ খরচ করলে তার বদলে কিছু পায়ও তো! শুধু খরচ দেখলেই কি হবে বাবা?
সে তো খাঁটি কথা। কিন্তু লোকে ওই খরচটাই যে দেখে।
আপনি আর ওসব নিয়ে মাথা ঘামাবেন না-চোখটা না কাটালেই নয়।
এখানে হয় না?
না বাবা। মাইক্রো সার্জারি করাতে হলে কলকাতায় যেতে হবে। তাতেই বা কি? কলকাতা তো একটুখানি রাস্তা। আমি আপনাকে গাড়ি করে নিয়ে যাবো।
ও বাবা! গাড়িতে কি কম তেল পুড়বে? তার দরকার নেই। ট্রেনেই যেতে পারব।
» ১০৬. মধ্যপ্রদেশের বান্ধবগড় অরণ্যে
শুরুটা হল এইভাবে : মধ্যপ্রদেশের বান্ধবগড় অরণ্যে এক শীতের বিকেলে আমার সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। সেই রাজকীয় বিশাল সুন্দর শরীর ধীর গতিতে উঠে এসেছিল একটা পাথরের চাতালে। আমি মুগ্ধ, সম্মোহিত। ভয় নয়, শ্রদ্ধা ও আবেগে আমার মাথা নত হয়ে এসেছিল তার সামনে। কী নিরাসক্ত, নির্ভীক আর উদাস তার চোখ। পৃথিবীতে তার ভয় পাওয়ার মতো কিছুই নেই। হা, এমন এক অসামান্য জীবকে চিড়িয়াখানার করুণ আঁচার মধ্যে পুরে কী অপমানটাই না করে মানুষ! এমন দিনের কি আর দেরি নেই যখন রাজ্যহারা এই রাজা আশ্রয়হীন, খাদ্যহীন, বীতশ্রদ্ধ এই পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নেবে? ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হচ্ছে পাখি, পশু, পতঙ্গের প্রজাতি।
প্রথম পরিচ্ছেদের নাম দিল কৃষ্ণজীবন, দি কিং ইজ ডায়িং।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের নাম, দি ফানি ব্যালান্স শিট। তাতে মানুষের সংখ্যা ও পৃথিবীতে উৎপন্ন ফসল ও খাদ্যের অনুপাত আর পশু ও তার খাদ্যের অনুপাতের বিস্তারিত পরিসংখ্যান, কতটা দূষণ ঘটছে পৃথিবীতে আর কতটাই বা শোষিত হচ্ছে সেই দূষণ, গাছপালা অরণ্যের হিসেবনিকেশ।
