বিষ্ণুপদ বলল, এ বাগানটা একটু পরিষ্কার করলে হয়।
তা হয়। রেমোকে বললেই লোক লাগিয়ে দেবে। কিন্তু তুমি এখানে বসে কেন? ওপরের বারান্দায় চেয়ার পেতে রেখেছি, সেখানে বসলেই তো হয়!
বারান্দায় তো রোজই বসি। আজ বাগানে বসতে ইচ্ছে হল। ইচ্ছে তো নানা রকমের।
পুরোনো বাড়িটার কথা ভুলতে পারছে না, না?
তা নয়। আসলে কি জানো, আমরা তো ভোগ করতে কোনওদিন শিখিনি। ভাল বাড়ি, ভাল জামাকাপড়, ভাল খাবার-দাবার এসব ভোগ করার জন্যও একটা ট্রেনিং লাগে, অভ্যাস লাগে। হঠাৎ বুড়ো বয়সে এইসব রাতারাতি হয়ে যাওয়ায় কেমন হাঁ ধরে যাচ্ছে! সেই হাফ ছাড়তেই বাগানে এসে বসা।
তোমার মুখ থেকে যা বেরোয় বেদবাক্য। কথাটা বলেছে বড্ড ভাল। ভোগ করতে শিখতে হয়। তবে চেষ্টা করতে করতে শেখাটা হয়েও যায়। না গো?
তোমার হচ্ছে, দেখছি। বলে বিষ্ণুপদ হাসল।
লজ্জা পেয়ে নয়নতারা বলে, মেয়েমানুষের মন তো বিষয়মুখী, তাই আমরা এগুলো তাড়াতাড়ি শিখি। তোমার মুখখানা আজ রসস্থ দেখছি যে! শরীর খারাপ নয় তো!
আরে না। তোফা আছি।
ভাঁড়িও না বাপু।
না গো, তোমার কাছে লুকোবো সাধ্যি কি! শরীর ভালই আছে। মনটা ভাল নেই।
কেন, হলটা কী?
ছেলেটা দুহাতে কেন যে এত খরচ করল! বউমার সঙ্গে হয়তো অশান্তি হচ্ছে।
সে আর বলতে! খুব হচ্ছে।
জানো ঠিক?
আন্দাজ করছি। ছেলে মুখ-ফস্কা দু-একটা কথা বলেও ফেলে। আর বউমা তো স্পষ্ট কথা শুনিয়েই গেছে! ওসব গায়ে মাখলে তো চলবে না। ছেলে তার বাপ-মায়ের প্রতি কর্তব্য করেছে। বাপ-মাও তো ফ্যালনা নয়।
একটু কম করে করলেও হত। বউমা তো খুব অন্যায্য কথা বলেনি।
সে বিদেশ থেকে মেলা টাকা পেয়েছে তাই করেছে। তার পরিশ্রমের রোজগার।
বিষ্ণুপদ কথাটা ঠিক স্বীকার করতে পারল না। একটু চুপ থেকে বলল, সবই বুঝি নয়নতারা। তবু বলি, এতটা না করলেও চলত। তাদেরও তো হক আছে, দাবি আছে। আমার কেবল মনে হচ্ছে। এ যেন অন্যের মুখের গ্রাস।
নয়নতারা বলে, ওগো, তারও তো আমাদের জন্য প্ৰাণটা পোড়ে। সে তো এতকাল কিছু করেনি। বউ ছেলেমেয়ের সেবাই করেছে। এখন একটু মায়া হয়েছে বলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হল!
কৃষ্ণটা হয়তো মনের কষ্টে আছে। বউমা হয়তো কথা শোনায়। আমাদের তিনকাল তো কেটেই গিয়েছিল। আর কয়েকটা দিন কি চলতো না?
আমাদের চলত, কিন্তু কৃষ্ণ যে প্রায়শ্চিত্ত করতে চেয়েছিল তা তো হত না।
বিষ্ণুপদ একটু ভেবে বলল, তা বটে!
নয়নতারা একটু বিষণ্ণ গলায় বলল, কৃষ্ণ এত করেও তোমাকে কিন্তু খুশি করতে পারল না। হ্যাঁ গো, তুমি কেন খুশি হলে না, বলো তো!
বিষ্ণুপদ একটু হেসে বলল, সুখটা যে কোথায় থাকে তাই তো বুঝতে পারি না নয়নতারা। রোজ ভাবি, এই যে সাতসকালে বাগানে এসে বসে আছি সে এমনি নয় গো, বসে বসে ভাবছি আর ভাবছি। তা আমার ভাবনা কেমন জানো? যেমন লম্বা দড়ি জট পাকিয়ে যায় তেমনি। মেলা গিট, মেলা ফাস। কিছুতেই সরল হতে চায় না।
তোমার সুখ না হলে আমার মনটা খারাপ হয়, জানো তো!
তা জানি। তবে ভেবো না, ধীরে ধীরে সব অভ্যাস হয়ে যাবে।
তোমার পুরনো বাড়ির জন্য মন কেমন করে বোধহয়।
তাও করে। সে বাড়ি নিজের রক্ত জল করে করা। অনেক পুরনো দিনের নানা কথা জড়িয়ে ছিল তার মধ্যে, তা বলে ভেবো না আমি স্মৃতি নিয়ে পড়ে আছি। আমি ভাবছি সুখ জিনিসটার কথা। মনটা কেমন ছাড়া হয়ে আছে।
চলো তো, ওপরের বারান্দায় গিয়ে আমার সামনে বসবে। আমি কুটনো কুটবো এখন। তুমি সামনে থাকলে আমার বুকটা ঠাণ্ডা থাকে।
চলো তাহলে। বলে উঠে পড়ল বিষ্ণুপদ।
কৃষ্ণজীবন এল দুদিন বাদে। রবিবার। দোতলা থেকে তাকে প্রথম দেখল বিষ্ণুপদ। সে নয়নতারাকে ডাকাডাকি করল না। ছানি পড়া চোখে কৃষ্ণজীবনের লম্বা শরীরটাকে সটান হেঁটে আসতে দেখল সামনের মাঠের পাশ দিয়ে; দোতলা থেকে অনেক দূর অবধি দেখা যায়। ছাদে উঠলে তো কথাই নেই।
কৃষ্ণ এল। বাড়িতে একটু তটস্থ ভাব হল। এলেমদার মানুষের কদরই আলাদা!
ওপরে এসে বাপের মুখোমুখি যখন বসিল কৃষ্ণজীবন, তখন বিষ্ণুপদ ভাল করে ছেলের মুখখানা লক্ষ করল। কেমন আছে তার এই আলাভোলা ছেলেটা? ভাবের জগতে থাকে, দুনিয়ার নানা উল্টোপাল্টা ব্যাপার ভাল বুঝতে পারে না। বউমার সঙ্গে পট খাচ্ছে তো! অপমান হতে হচ্ছে না তো!
মুখখানা খুব একটা হাসিখুশি নয়। কেমন যেন থম ধরা।
বাবা, কেমন আছেন?
দিব্যি আছি। বাবা। এর চেয়ে ভাল কখনও থাকিনি।
বলেই বিষ্ণুপদর মনে হল, মিথ্যে কথা বলা হল নাকি? দুনিয়ায় যত সাধুবাদ আছে তার মধ্যে একটু করে মিথ্যে ঢুকে থাকেই। যত প্রশংসাবাক্য আছে তার অধিকাংশই একটু বাড়তি কথা। কী আর করা যাবে!
একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, যখন যা দরকার হবে বলবেন বাবা। নিঃসঙ্কোচে বলবেন।
বিষ্ণুপদ খুব হাসল। একেবারে ছেলেমানুষের মতো। সারা জীবনে এরকম কথা কেউ তাকে বলেনি। এ যেন হঠাৎ স্বৰ্গ থেকে দেবতা নেমে এসে বললেন—কী বর চাও বলো, দেবো। কিন্তু বিষ্ণুপদ ভাবে, সারা জীবন খিদে নিয়ে, অপূরণ ইচ্ছে নিয়ে, নিদারুণ অভাব কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকার একটা যে সময় গেছে তখনও তার চাহিদা তো খুব বেশী ছিল না!! রাঙা চালের মোটা ভাত আর একটু ডাল হলেই হত। দুখানা মোটা ধুতি, দুখানা জামা হলেই হত। পায়ে এক জোড়া জুতো হলেই হত। তার বেশি আকাজক্ষাই তো তৈরি হত না মনে।
বিষ্ণুপদ হাসি থামিয়ে স্মিত মুখে বলল, কী আর লাগবে বাবা? কিছুই তো লাগে না এখন। যথেষ্ট আছে।
